বুধবার ৮ জুলাই ২০২০


কুমিল্লা নগরীতে লকডাউন মানছেন না অনেকে, নানান অভিযোগ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
28.06.2020

মাসুদ আলম।।
কুমিল্লায় রেড জোন চিহ্নিত এলাকাগুলোতে শতভাগ লকডাউন মানা হচ্ছে না। বাসিন্দাদের নানা অজুহাত এবং অবাধ যাতায়াতে লডাউনের সেই পুরনো চিত্র রয়ে গেছে। প্রবেশপথে কিছুটা বিধি নিষেধ এবং বাধার সম্মুখিন হলেও ভিতরের পরিবেশ তার উল্টো। এদিকে অসচ্ছলদের মাঝে প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত সহায়তা, স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি বাসিন্দাদের অনাস্থা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, দিনে যেমন-তেমন রাত ৮টার পর লকডাউন এলাকাতে আসা-যাওয়ায় বাঁধা দেওয়ার মতো কেউ থাকেন না।
বৈশি^ক মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে গত ২০ জুন থেকে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৩, ১০, ১২, ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডকে রেড জোন চিহ্নিত করে লকডাউন ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। লকডাউন নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর প্রবেশপথ বাঁশের বেড়া দিয়ে বন্ধ করা দেয়া হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও থেমে নেই মানুষের অবাধ যাতায়াত। ফলে প্রশাসনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। চারটি ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে কড়াকড়িভাবে লকডাউন কার্যকর করা গেলে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় প্রশাসনের।
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৯ এপ্রিল কুমিল্লার বুড়িচংয়ে সর্বপ্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে আস্তে আস্তে কুমিল্লা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শুরু থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত ৫২ দিনে কুমিল্লায় করোনা রোগীর সংখ্যা ছিল ৯৭১ জন। কিšুÍ পবিত্র ঈদ-উল ফিতরের পর থেকে সংক্রমণের হার বাড়তে থাকে। গত ১ জুন থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মোট ২৬ দিনে করোনা রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়ালো। সবচেয়ে বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে কুমিল্লার সিটি কর্পোরেশন এলাকায়।
কুমিল্লা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে কুমিল্লা এই পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে দুই হাজার ৯৯৪জন। তার মধ্যে সুস্থ হয়েছে এক হাজার ১৯১জন। আর মৃত্যু হয়ে ৮৭ জনের।
অন্যদিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলো ১০৫ জন। তারমধ্যে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ৯০ জন।
রেড জোন চিহ্নিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের চারটি ওয়ার্ডের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কালিয়াজুরি, রেইসকোর্স, শাসনগাছা বাদশা মিয়ার বাজার। ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউতলা, পূর্ব বাগিচাগাঁও, পুলিশ লাইন, বাদুরতলা, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের নানুয়ার দিঘিরপাড়, নবাববাড়ি চৌমুহনী, দিগম্বরীতলা এবং ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের টমটম ব্রিজ, থিরাপুকুরপাড় ও দক্ষিণ চর্থা এলাকা।
সরেজমিনে এলাকাগুলোতে দেখা যায়, স্থানীয়রা লকডাউন মানছেন না। লকডাউন চলছে ঢিলেঢালাভাবে। নানা অজুহাতে লকডাউন ভেঙ্গে বের হচ্ছেন তারা। ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ঘুরাফেরা করছেন। বাসিন্দাদের জন্য প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা খুব কমই মানা হচ্ছে।
৩নং ওয়ার্ডের বাদশামিয়ার বাজার এলাকার প্রবেশপথগুলোতে পুলিশের অবস্থান থাকলেও মানুষের চলাচলে বাধা দিয়ে আটকাতে পারছেন না। লকডাউন করা ১০নং ওয়ার্ডের পূর্ব বাগিচাগাঁও তালপুকুর পাড়া সড়কটিতে কোন পুলিশ সদস্য পাওয়া যায়নি। একই চিত্র ছিল ১২ এবং ১৩ ওয়ার্ডগুলোর প্রবেশপথেও। এদিকে জেলা প্রশাসন ঘরে ঘরে ভ্যানে করে বাজার পৌঁছে দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিল সেটি কোথাও পালিত হচ্ছে না।
শুক্রবার পূর্ব বাগিচাগাঁও মসজিদের পাশে তালপুকুর পাড় সড়কের প্রবেশপথে কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার একজন এএসআইকে একা হাঁটাহাটি করতে দেখা যায়। তার সাথে কোন পুলিশ সদস্য ছিল না। দায়িত্ব থাকা কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক আশপাশে থাকলে প্রবেশপথে কাউকে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তালপুকুর পাড়ের পূর্ব পাশ দিয়ে লকডাউনের বাঁশের বেড়া থাকলেও কোন পুলিশ সদস্য বা স্বেচ্ছাসেবক কর্মীকেও দেখা যায়নি। এতে করে বেড়ার উপর এবং পাশ^বর্তী তিন ফুট উঁচু ওয়াল দিয়ে মানুষ অবাধে চলাচল করছে।
এএসআই জাহিদ জানান, লকডাউন ভেঙ্গে যেন কেউ বের হতে না পারে। সেই চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।
৩নং ওয়ার্ডের রেসকোর্স মফিজ উদ্দিন সড়কের মধ্যবিত্ত পরিবারের বাসিন্দা মহিউদ্দিন ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, সংক্রমণ রোধে লকডাউন একটি উপযুক্ত মাধ্যম। বাসার জন্য বাজার করতে বের হতে হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবক বা কাউকে পাচ্ছি না। ভ্যানে বাজার পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও সে সেবা পাচ্ছি না।
একই এলাকার আবদুল্লাহ আল মমিন নামে আরও এক বাসিন্দা ব্যাংক থেকে টাকা তুলবেন বলে বাসা থেকে বের হয়েছন। স্বেচ্ছাসেবকদের কথা বললে তিনি জানান তাদের প্রতি আস্থা নেই।
১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাগিচাগাঁও তালপুকুর পাড় সড়কের বাসিন্দা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালক আবুল হাসেম, ভুট্টো মিয়া জানান, আমরা দিনমজুর। দিনে আয় করে রাতে খাই। লকডাউন ঘোষণার ৭দিন পর আমাদেরকে পাঁচ কেজি চাল আর দুই প্যাকেট আটা সহায়তা দিয়েছে প্রশাসন। গত সাতদিন যাবত গাড়ি নিয়ে রাস্তার বের হতে পারছি না। আয় নেই। তারপরও নিজের পকেটের টাকা দিয়ে চলতে হয়েছে বহু কষ্টে। প্রশাসনের শুকনো চাল, আটা খাবো কিভাবে রান্নার অন্যান্য সামগ্রী ছাড়া।
হাসেম ও ভুট্টো মিয়াদের এই বাড়িতে ১৬টি পরিবার বসবাস করেন। সবাই তাদের মতো অসচ্ছল ও দিনমজুর।
হতদরিদ্র লাকি আক্তার জানান, তার স্বামী নেই। বাবা- মাও নেই। সন্তানদের নিয়ে এখানে বসবাস করেন আর মানুষের বাসা বাড়িতে কাজকর্ম করে খান। বাড়ির দুইপাশে বাঁশের বেড়া নিয়ে পথ বন্ধ করে দেয়ায় তিনি বের হতে পারছেন না। ঘরে চাল,ডালসহ কোন খাদ্য সামগ্রী নেই। লকডাউনের সাতদিন পর চাল আর আটা সহায়তা পেয়েছেন। ভাত রান্না করে খাওয়ার মত আরও কোন সামগ্রী তার ঘরে নেই। তাহলে তিনি কিভাবে প্রশাসনের দেয়া লকডাউন মানবেন?
করোনায় রেড জোন চিহ্নিত ১০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মঞ্জুর কাদের মনি জানান, বাসিন্দাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে লকডাউন মানার প্রবণতা কম। তারপরও সংক্রমণ রোধে মানুষের মাঝে লকডাউন নিশ্চিতে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন। লকডাউন ভেঙ্গে বাইরে যাওয়া জন্য বিভিন্ন অজুহাত দেখান। তারপর আবার গভীর রাতে ফোন করে অসম্ভব বিভিন্ন আবদার করে থাকেন।
তিনি আরও জানান, গত ২০ তারিখ থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের আওতাধীন এলাকাগুলোর অস্বচ্ছল, গরিবদের মাঝে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছি। শনিবারের মধ্যে চাল,ডালসহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হবে।
অন্যদিকে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সরকার মাহমুদ জাবেদ জানান, তার ওয়ার্ডে শতভাগ লকডাউন নিশ্চিত না হলেও করোনা সংক্রমণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। অন্যান্য পেশার চাকরিজীবীদের মতো চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুলিশ সদস্যদেরকেও যদি সাধারণ ছুটির আওতায় আনা হয় তাহলে শতভাগ না হলেও ৯০-৯৫ ভাগ লকডাউন সফল হবে।
তিনি আরও জানান, লকডাউন শুরুর আগের দিন ৪০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন। তারপর অসচ্ছল,গরিব,দিনমজুর এবং নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে ১২ টন চাল বিতরণ করেছেন। যারা চেয়েছেন তাদেরকেই দিয়েছেন।