বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০


আবু তাহেরঃ নিভৃতচারী একজন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
30.06.2020

আহসানুল কবীর।।
ভেবেছিলাম করোনাকালীন সময়ে মৃত্যু নিয়ে আর কিছু লিখবোনা।কারণ কাছের মানুষদের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে লিখতে লিখতে নিজেই মানসিক ভাবে অসুস্হ্য হয়ে যাচ্ছি।তবুও লিখতে বসলাম মূলত দুটি কারণে প্রথমত তাহের ভাই এর প্রতি ভালোবাসার দায় দ্বিতীয়ত বন্ধুসম বড় ভাই এড.সৈয়দ নুরুর রহমানের অনুরোধ।
তাহের ভাইকে আমরা বলতাম দোল্লাই নবাবপুরের তাহের ভাই।ছাত্রলীগের মিজান- পার্থ কমিটির সহসভাপতি তাহের ভাই।তখনো সাংগঠনিক কমিটি উত্তর জেলা দক্ষিণ জেলায় ভাগ হয়নি।পুরো কুমিল্লায় একটি কমিটি।চান্দিনা দাউদকান্দি এলাকা থেকে কমিটিতে আসলেন দোল্লাই নবাবপুর কলেজের ভিপি তাহের ভাই।আসলেন আশরাফ ভাই এর পছন্দে।কুমিল্লা এসে একসাথে পথ চলতে যেয়ে হয়ে গেলেন আমাদের লোক।তিনি ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেননা।কিন্তু কলেজে আমাদের চেয়ে আগে আসতেন।আমরা কলেজে যেয়ে দেখতাম জামতলায় দাড়িয়ে তাহের ভাই আসর জমিয়ে ফেলেছেন।কুমিল্লায় তার থাকার জায়গা ছিলোনা।লজিং থেকেছেন মেসে থেকেছেন। এ জাতীয় ছেলেরা সাধারণত আগে নিজের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে।তাহের ভাই এর এসব চিন্তা ছিলোনা।সবসময় দলের চিন্তা। দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ।অধিকাংশ সময় দুপুরবেলা জলযোগের একটা সিঙারা খেয়ে দিন কাটিয়ে দিতেন।আমরা তখোন মিছিল মিটিং শেষে দলবেঁধে জলযোগে চা সিঙারা খেতাম।এককাপ চা একটাকা একটা সিঙারার দামও একটাকা।এককাপ চা আর একটা সিঙারা দুইজনে ভাগ করে খেতাম।এ আসরে তাহের ভাই ছিলেন আমাদের নিত্যসাথী।আহা কিযে মধুর সময়!পেটে ক্ষুধা রক্তে আগুন।সে আগুন মুজিব প্রেমের সে আগুন দ্রোহের।জামতলার আড্ডায় পাঁচ টাকার বাদাম কিনলে দশ/পনেরোজন মিলে খেতাম।রাতের বেলা তাহের ভাই কি খেত কোথায় খেত তা কখনো জানার চেষ্টা করিনি আজ মনে হচ্ছে কেন জানার চেষ্টা করলামনা? করা উচিত ছিলো।
তার দুচোখ জুড়ে ছিলো স্বপ্ন। চান্দিনার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এলাকার উন্নয়নের স্বপ্ন ।নিজের পেটে ভাত নাই কিন্তু সার্বক্ষণিক চিন্তায় এলকার মানুষ।আমরা তখন সদ্য কৈশোর পেরিয়েছি আর আমাদের সাথে একেবারে প্রান্তিক জনপদ থেকে উঠে আসা দুই স্বপ্নবাজ তরুণ চান্দিনার আবু তাহের আর নাংগলকোটের এম এম আবদুল্লাহ।তারা পরিণত বয়সে তাদের এলাকায় জনপ্রতিনিধি হবার স্বপ্ন দেখতেন।কিন্তু রাজনীতির বাঁক ততদিনে বদলে গেছে।তারা সেটা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন।এখন জনপ্রতিনিধি হতে একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী হয়ে লাভ নেই হতে হবে বৈধ কিংবা অবৈধ পথে অগাধ টাকার মালিক।তাই তাদের স্বপ্ন আকাশকুসুমই থেকে গেছে।
মনে পড়ে ১৯৮৮ সনে আওয়ামীলীগ নেতারা বসে ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্রলীগের একটি প্যানেল করেছিলেন।সেটি ছিল জাকির -শ্যামল পরিষদ।ভিক্টোরিয়া কলেজে তখন বাহার ভাই এর আধিপত্য অনেক বেশী হওয়া সত্তেও তিনি এটি মেনে নিয়েছিলেন।পরদিন তাহের ভাই এর নেতৃত্বে জামতলায় শ্লোগান উঠলো এই প্যানেল ড্রইং রুমের এই প্যানেল মানিনা।ফলাফল অবধারিত।ঐক্য ভেংগে গেল।জাকির-শ্যামল প্যানেল হলোনা।ছাত্রলীগের তিনটি প্যানেল হলো।আমরা নির্বাচনে সামান্য কিছু ভোটে হেরে গেলাম।সেদিন তাহের ভাইরা কাজটি সঠিক কি বেঠিক করেছিলেন তা বিবেচ্য বিষয় নয় বিষয় হলো তারা প্রতিবাদী হবার পরেও পরবর্তীতে তাদের রাজনীতি করতে সমস্যা হয়নি।কারণ রাজনীতিতে তখন সহমর্মিতা ছিলো এতো নিষ্ঠুরতা ছিলোনা।
পরবর্তীতে দীর্ঘ বিরতির পর তাহের ভাই আইন পেশায় যোগদান করেন।আমিও আমার পেশাগত ব্যস্ততায় ডুবে যাই।রাস্তায় যখনই দেখা হতো আগের আন্তরিকতাটুকু ঠিকই টের পেতাম।শুনেছি চর্থায় উনার শ্বশুরবাড়ীতে যৌথ মালিকানায় তার যৎসামান্য জায়গা আছে।রাজগন্জে এক চিলতে জুতার দোকান আছে।সম্পদ বলতে এই।অথচ তার কর্মীরাও এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।তার স্ত্রী সন্তানদের সামনে অনিশ্চিত জীবন।আল্লাহ আপনি তাদের হেফাজত করুন।তাহের ভাইকে জান্নাত নসীব করুন।
লেখক : সাংস্কৃতিক সংগঠক,লেখক ও গবেষক । মোবাইল : ০১৭১১-৩৯৩৮৫৭