বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০


করোনাকালে বিক্ষিপ্ত ভাবনা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.07.2020

এড. তানজিনা আক্তার।।
করোনা আসার পর থেকে আমি প্রয়োজনে, যখনি বাসা থেকে বের হই ডেটল, স্যাভলোন স্প্রে এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার সাথে রাখি। রিকশায় উঠার সময়, পুরো রিকশা স্প্রে করি এবং রিকশা ওয়ালার হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর সারা শরীরে ডেটল স্প্রে করে দেই। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রিকশাওয়ালার বয়স আনুমানিক ৬০ বছর হবে। আমি তার শরীরে এগুলো ছিটাতে যেতেই, তিনি ধমকের সুরে এমন আচরণ শুরু করলেন, আমি প্রথমেই ভয় পেয়ে গেলাম, ভাবলাম পাগল কি না? রিকশা থেকে নামতেও পারছি না। সারাটা পথ সে বলে যেতেই লাগলো, আমাগো এসবের দরকার নাই, এগুলি আমনেরা মাখেন, সারাদিনে দুই বেলা ভাতের যোগাড় করতে পারি না, আর আমনে আইছেন আমার শইলে আতর মাখতেন, আমনেরা আতর মাখেন, চাল চোরদেরকে আতর মাখান, আমরা যে বস্তিতে থাকি, একজনের জায়গায় তিনজন থাকি, করোনা কারে কয় আমরা চিনি না, মরণ আইলে মরি যাইয়ুম, আমাগো কোন কষ্ট নাই, দেশের ধনী লোকগুলারে এসব মাখেন, তাদের বাঁচনের দরকার, তারা বাঁচি না থাকলে শেখ হাসিনার এত টেহা খাইবো কে? বক বক করতে করতে বাজার পর্যন্ত গেলো। আমি কখন এই রিকশা থেকে নামবো, মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকলাম। পাগল ভেবে যে ভয় আমি পেয়েছিলাম, ভাড়া দিতেই সব ভয় এক নিমিষেই কেটে গেলো। ১০০ টাকা দিতেই বললো, এত টাকার ভাঙতি কই পামু, ৩০ টাকা দেন। বললাম, ভাঙতি নাই, পুরোটাই আপনারে দিলাম। লোকটা বললো, আমার কথা গুলি আপনার কাছে খুব খারাপ লাগছে, আমি বুঝছি কিন্তু কি করুম কন, এই বয়সে রিকশা চালাই খাই, আর আমাগো লাইগ্যা শেখ হাসিনা যে টাকা দেয়, ঐ দেহেন হেই টেয়া দিয়া, কত বড় বড় দালান কোটা উঠে, আর রিকশা না চালাইলে আমাগো খাওন জোটে না। আমনে আইছেন, আমার শইলে আতর মাখতেন। আপা আমনে আমারে মাফ কইরা দিয়েন, আমি আমনেরে অনেক কথা কইছি। ভাবলাম, পাগলতো সে নয়, পাগল আমরা। একচেটিয়া টাকায় ধনী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে দিনের পর দিন। এ প্রবণতা আমরা ভাঙতে পারবোতো? তা নাহলে, “আমরা সবাই রাজা, আমাদেরই রাজার রাজত্বে, নইলে মোরা রাজার সঙ্গে মিলবো কি শর্তে, আমরা সবাই রাজা।” -এই গানটির মূল্য আদৌ আছে কিনা, আমি জানি না। তবে, অন্তর উজাড় করা এই গানটি, কত দরদ দিয়েই না গাওয়া হয়।
২.
করোনার কারণে আমার ড্রাইভার ছুটিতে। কুমিল্লা জেলা পরিষদের কাজ শেষ করে, একটি রিকশায় উঠে বসলাম এবং আমার বাসার সামনে আসলাম। বললাম, এই প্যকেটগুলো দোতালায় তুলে দিতে পারবা? সে বললো পারবো। সে তোলা শুরু করলো এবং তার সাথে হাত লাগালো আমাদের বিল্ডিংয়ের দারোয়ানও। তোলা শেষের পর, আমি একটি সরকারি ত্রাণের প্যাকেট তাকে দিলাম। যার ভিতরে ছিল ১০ কেজি চাল, ১কেজি ডাল, ১কেজি তেল, ২কেজি আলু, দুইটা মাস্ক ও ২টা সাবান। রিকশাওয়ালা কি যে খুশি হলো, আমি লিখে বুঝাতে পারবো না। বললাম, আমি একটু স্বপ্নতে যাবো। সে আমাকে স্বপ্নের সামনে নামিয়ে দিতেই, আমি তাকে ১০০ টাকা দিলাম। সে তো নিবেই না। বললো, আপনি আমাকে এত কিছু দিয়েছেন, আবার টাকা দিবেন কেন? বললাম, আরে বোকা, এটাতো সরকার গরিব মানুষকে দিয়েছে, তোমরা যারা লকডাউনে কাজ করে খেতে পারছো না, তাদের জন্য। আর আমি যেটা দিচ্ছি, সেটা হলো তোমার ভাড়া আর পারিশ্রমিক। কিন্তু না, সে নিবেই না। শুধু কেবল কাচুমাচু করছে। জোর করে আমি তাকে টাকাটা দিলাম। সে বললো, আপা আপনি আবার সেখানে যাবেন না? বললাম, যাবো, তবে দেরি হবে, তুমি চলে যাও। ঈদের দুদিন আগে, আমার স্বপ্নতে বাজার করতে প্রায় আধা ঘন্টা লাগলো। আমি রাস্তায় এসে দেখলাম, রিকশাওয়ালাটা দাঁড়িয়ে আছে। বললাম যাও নি? সে বললো, না। আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি আজ আর রিকশা চালাবো না। যে খাবারগুলো আপনি আমাকে দিয়েছেন, এতে আমাদের ১৫দিন চলে যাবে। জানেন আপা, খুব ডরে ডরে রিকশাটা নিয়া বাহির হইছি, দুইদিন পরে ঈদ, ঘরে এক কেজি চাল নাই। পুলিশ রিকশা বারি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে, তবুও ছোট ছোট দুটো বাচ্চার কথা চিন্তা করে ঘর থেকে বাইর হইছি । দেশের বাড়ি রংপুর, সেখানেও যেতে পারিনা। আমি এহনি বাসায় চইলা যামু, আমার ১৫ দিনের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। রিকশা ওয়ালার আচরণ দেখে আমার মনে হলো, গরিব মানুষদের খুশি করতে খুব বেশি কিছু লাগে না, তবে লোভী ধনী মানুষকে খুশি করা কঠিন। রিকশাওয়ালাকে আমি ভুলতে পারছিনা। আমার মনে হলো, মানবিক মানুষ তাহলে পৃথিবীতে এখনো আছে। মানবতা মরে যায়নি। করোনা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে, জীবন চলার পথে, যদি বেঁচে থাকি এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।

লেখক-এড. তানজিনা আক্তার, সদস্য, কুমিল্লা জেলা পরিষদ ও আইনজীবী,কুমিল্লা জজ কোর্ট।
মোবাইল-০১৭৮৩ ৪৯২৭৪৯