শনিবার ৮ অগাস্ট ২০২০


দীর্ঘ সামাজিক বিরোধের জেরে লাশ নাঙ্গলকোটের রাবেয়া!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
02.07.2020

তৈয়বুর রহমান সোহেল।।
গ্রামের কাঁচা সরু রাস্তা। ভবানীপুর ও মান্দ্রা গ্রামের সীমানার তীরবর্তী কয়েকটি আবাদি জমির মাঝামাঝি একটি নির্জন বিচ্ছিন্ন বাড়ি। ওই বাড়িতেই গত রবিবার লাশ পাওয়া যায় রাবেয়া আক্তার বিভু (২০) নামে এক প্রবাসীর স্ত্রীর। রাবেয়ার মায়ের দাবি তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে ও আরো চারজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন রাবেয়ার বাবা আলী মিয়া।
সামাজিক বিরোধের সূত্রপাত:
মঙ্গলবার সকালে মান্দ্রা গ্রামের ওই বাড়িতে সরেজমিন গিয়ে কথা হয় রাবেয়ার বাবা-মাসহ বেশ কয়েকজন আত্মীয়স্বজনের সাথে। রাবেয়ার বাবা আলী মিয়া জানান, আমার আগেও একটি বিয়ে হয়েছিল মান্দ্রা গ্রামে। দুর্ঘটনাক্রমে ওই স্ত্রী মারা যায়। আত্মীয়তার খাতিরে ভবানীপুর থেকে গত পাঁচ বছর পূর্বে এখানে একটি বাড়ি তৈরি করি। আমার চার মেয়ে এক ছেলে। রাবেয়া সবার ছোট। বিয়ের পর থেকে সে গ্রামে বসবাস করছে। একমাত্র ছেলে ওমর ফারুক (২২) ওমান প্রবাসী। আমাদের বাড়ির লাগোয়া জমিগুলো আমার আপন চাচা শ্বশুর (আগের বিয়ের) ইউনুছ মিয়ার। এ গ্রামে আসার পর নিয়মিত তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের এ বাড়িতে যাতায়াত ছিল। জমিতে কাজ করতেও তাদের সাথে দেখা হতো। পানি পান করার জন্যও তারা এ বাড়িতে আসত। আমাদের সম্পর্কটা ছিল মধুর। ভালো সম্পর্কের কারণে গ্রামে রটে যায়, ইউনুছ মিয়ার নাতনি ইউছুফ মিয়ার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ের চুক্তি হয়েছে, তাই এত ভালো সম্পর্ক। এসব কথা রটে যাওয়ার পর আমরাও বিয়ের ব্যাপারে কথা বলে রাখি। ছেলে দেশে আসলে ওই পরিবারে আত্মীয়তা করার ইচ্ছা পোষণ করি। কিন্তু হঠাৎ মেয়ের বাবা ইউছুফ মিয়া উল্টে বসে। তার দাবি, মেয়ের দাদা বয়োবৃদ্ধ ইউনুছ মিয়ার সাথে রাবেয়ার সম্পর্ক আছে। ইউনুছ মিয়া রাবেয়াকে বিয়ে করতে চায়। এটা নিয়ে ঘোর বিরোধের সৃষ্টি হয়। আমার ওপর একাধিকবার হামলা করে ইউছুফ মিয়া ও তার স্বজনরা। এটা মামলা পর্যন্ত গড়ায়। এ ঘটনার পর জোড্ডা পূর্ব ও পশ্চিম ইউপি চেয়ারম্যানদের উপস্থিতিতে সালিশ হয়। সালিশে ইউছুফ মিয়াকে ৪০হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদিকে আরেক সমস্যা জেঁকে বসে। স্থানীয় রিপন নামের এক যুবক রাবেয়াকে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করতো। বাইরে থেকে পরিবারের বিষয়, এলাকার মেয়েদের সাথে রাবেয়ার উঠাবসাসহ নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে সে। আমি চট্টগ্রামে একটি মাদরাসায় দারোয়ানের চাকরি করি। বাড়িতে আমার স্ত্রী জাহানারা বেগম ও রাবেয়া ছাড়া কেউ থাকে না। ওই সুযোগে রিপনের বখাটেপনার সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু ভয়ে আমরা মুখ খুলতে পারিনি। রিপন পাড়ায় পাড়ায় রাবেয়ার নামে কুৎসা রটনা করে।
আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি রাবেয়ার:
রাবেয়ার মেজো বোন কুলছুম আক্তার জানান, আমার স্বামী ও রাবেয়ার স্বামী কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নূরপুর এলাকার মাসুদ মিয়ার ছেলে মেহেদী হাসান কুমিল্লা ইপিজেডে একসাথে কাজ করত। তারা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গত দুই বছর পূর্বে রাবেয়া আমাদের বাসায় (ইপিজেড পকেট গেট) বেড়াতে যায়। সেখানে মেহেদী রাবেয়াকে দেখে পছন্দ করে ফেলে। আমার হাতেপায়ে ধরে রাবেয়াকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। পরে পাঁচ লাখ টাকা কাবিনে তাদের কোর্ট ম্যারিজ হয়। বিয়ের পাঁচদিনের মাথায় বাহারাইন চলে যায় মেহেদী। পরিবারের অমতে বিয়ে করায় রাবেয়াকে তুলে নেওয়া হয়নি। করোনার কারণে মেহেদী দেশে আসার সুযোগ পাচ্ছিল না। সম্প্রতি তার দেশে ফেরার কথা ছিল। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে রাবেয়াকে ঘরে তোলার ইচ্ছা ছিল মেহেদীর।
অপর একটি সূত্রে জানা যায়, মেহেদীর সাথে বিয়ের আগেও রাবেয়ার আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়েতে রাবেয়ার মত ছিল না।
পড়াশোনা বেশিদূর হয়নি রাবেয়ার:
আরেক বোন আলেয়া আক্তার জানান, রাবেয়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। অন্যদের চেয়ে সে ছিল তুলনামূলক সুন্দরী। স্বামী তুলে না নেওয়ায় গ্রামে থাকতে হতো তাকে। তাই গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের সাথে অলস সময় কাটাত রাবেয়া। আর এর সুযোগ নিতে চেয়েছিল গ্রামের বখাটেরা।
কী হয়েছিল সেদিন:
রাবেয়ার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, রবিবার বেলা ১১টার পর স্থানীয় মান্দ্রা বাজারে যায় রাবেয়ার মা জাহানারা বেগম। বাড়িতে রেখে যান রাবেয়ার নানি জামিলা খাতুনকে। জাহানারা বেগম বাজারে যাওয়ার পরপর তিনজন ছেলে ঘরে প্রবেশ ঘরে। একজন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। দুজন থাকে রাবেয়ার কক্ষে। সেখানে তারা এক ঘণ্টার বেশি সময় কাটায়। নানি জামিলা তখন তরকারি কাটছিলেন। এরপর ওই তিনজন ছেলে বেরিয়ে যায়। একটু পর মা জাহানারা বেগম বাড়িতে এসে রাবেয়ার খোঁজ করলে নানি বলেন, সে ঘরে আছে। তিনজন ছেলে এসে চলে গেছে। রাবেয়ার মায়ের মতে, তিনি ঘরে প্রবেশ মেঝেতে রাবেয়ার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।
মা ও নানির বক্তব্যে অমিল:
বাড়িতে উপস্থিত থাকা জামিলা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান,‘ওইদিন তিনজন ছেলে আসে। দুইজন ঘরে ঢুকে, একজন বাইরে পাহারা দেয়।’ তাদেরকে আগে চিনতেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা আগেও আসত। আমি চিনতাম তাদেরকে। যা সত্য তাই বলব।’ একথা বলার সাথে সাথে স্থানীয় দুইজন আত্মীয়ের বাধার মুখে পড়েন তিনি।
রাবেয়ার মা জাহানারা বেগম জানান, তাদের সাথে ইউনুছ মিয়ার পরিবারের বিরোধ ছিল। রিপন তাকে এক বছর ধরে উত্যক্ত করে আসছিল। তবে ঘরে কারা এসেছে, তা তিনি জানেন না।
ভিডিও ফুটেজ, লাশের ছবি ও স্ক্রিনশটে যা ছিল:
রাবেয়ার মৃত্যুর আগেরদিন রাতে সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যা রাবেয়ার বলে কোনো কোনো আইডিতে প্রচার করা হয়। এর একটি স্ক্রিনশট এ প্রতিবেদকের কাছে আসলেও তা অস্পষ্ট। অপর একটি ভিডিও ফুটেছে দেখা যায়, মা জাহানারা বেগম বিলাপ করছেন। সিলিংয়ের ওপর একটি ওড়না ঝুলছিল। কেউ একজন তাকে (রাবেয়ার মাকে) ওড়নাটি নামানোর ইশারা করলে তিনি তা নামিয়ে ফেলেন। রাবেয়ার গলায় হালকা দাগ ছিল। একটি চেইন তখনও পর্যন্ত গলায় ঝুলছিল।
জানাযায় এসেছিল তিনজন, সাংবাদিক দেখতে দুই শতাধিক:
রাবেয়ার বাবা আলী মিয়া জানান, রাবেয়ার লাশ দেখে আমার স্ত্রী যখন চিৎকার শুরু করে, তখন কেউ ছুটে আসেনি। পোস্ট মর্টেমের পর লাশ দাফনের সময় মান্দ্রা গ্রাম থেকে মাত্র তিনজন মানুষ আসে।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ভবানীপুর, মান্দ্রা ও জোড্ডা গ্রামের দুই শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ভিড় করে। কয়েকজন যুবক সাংবাদিকদের একটি মোটর সাইকেল আটকানোর চেষ্টা করে। পরবর্তীতে স্থানীয় দুইজন যুবকের হস্তক্ষেপে তা মীমাংসা হয়।
আরেক অভিযুক্ত লিটনের মায়ের বক্তব্য:
লিটনের মা সেতারা বেগম জানান, ঘটনার দিন আমার ছেলে রেণু বিক্রি করার জন্য সারাদিন মাছের হ্যাচারিতে ছিল। রাবেয়ার কাকা দুলালের সাথে দুই মাস আগে লিটনের মাটি কাটা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। দুলাল প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমার ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
তবে মূল অভিযুক্ত ইউনুছ মিয়ার পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য:
মান্দ্রার স্থানীয় ইউপি সদস্য ছোয়াব মিয়া জানান, আমি ওদের খোঁজখবর নিয়মিত রাখতাম। রাবেয়ার বাবা নির্ভেজাল মানুষ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নাঙ্গলকোট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রথম দিন মনে হয়েছিল, এটা হত্যাকা-। এখন ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। আমাদের ডিআইজি স্যার এসেছেন। তিনিও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। তদন্তের স্বার্থে এখন বেশি কিছু বলা যাবে না। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে আমরা সংবাদ সম্মেলনে তা জানিয়ে দিবো।