বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০


মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পথে কাবা’-১


আমাদের কুমিল্লা .কম :
06.07.2020

এ,বি,এম মোস্তাফিজুর রহমান।।

সেই পনেরো সালে নিয়ত করেছি সতেরো সালে ওমরা করতে যাব। পকেট শূন্য নিয়েই পরিকল্পনা। সতের সালে এসে আল্লাহ তৌফিক দিলোনা। এবার আঠারো সালে যাবই যাব, সাথে সবসময়ের সঙী জসিম সহ। সতের সালের মাঝামাঝি কোম্পানির সাথে যোগাযোগ শুরু। এক লক্ষ টাকা লাগবে, একপথ ট্রানজিট থাকবে, (বিমান সরাসরি সৌদিআরব না গিয়ে মাঝপথে কয়েক ঘন্টার জন্য বিরতি দিবে) সাথে থাকা খাওয়া সবকিছু। বছরের শেষে এসে জসিম বলল, নারে আঠারোতে না উনিশে যাব। আমি বললাম, তুমি উনিশে যাও, আমি ঘুরে আসি। পকেট তখনো শূন্য।

আশায় আছি জানুয়ারি তে ইনসেনটিভ বোনাস পাব আর ডিপিএস পচিশ হাজার টাকা। আর হজ্ব ওমরা নিয়ে রাতদিন পড়াশুনা, আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি, কত স্বপ্ন, কত চিন্তা। “আল্লাহ একবার নিয়া তোমার ঘর আর নবীজি র রওযা দেখাও”। অবশেষে ঠিক ঠিক এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম, “আমি কাবা’র সামনে”। ফজরে ওঠেই বুঝে গেলাম, আল্লাহ ডাক শুনেছেন, কবুল করেছেন। পকেট কিনতু এখনো শূন্য।

মনে প্রচন্ড জোর নিয়ে পরিবারের সবাইকে বলেছি, ইনশাহল্লাহ ফেব্রুআরি তে ওমরা করতে যাব। বউ বলল, টাকা কই? আমি বলি, ব্যবস্হা হয়ে যাবে। এদিকে কোম্পানি তাড়া দিচ্ছে, ভাই গেলে বুকিং দিতে হবে। বললাম, জানুআরি তে দিব। অবশেষে জানুয়ারির ১ তারিখে বোনাস পেলাম ৮৭হাজার টাকা অথচ সম্ভাব্য ধরে নিয়েছিলাম ৭৮হাজার টাকা। সবি আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। তাড়াতাড়ি কোম্পানি কে চল্লিশ হাজার দিয়ে বুকিং দিলাম, ফেব্রুআরির ১ম সপ্তাহে যেন ফ্লাইট বুকিং দিয়ে দেয়। ওদিকে ডিপিএস ভেঙে পেলাম ছাব্বিশ হাজার। ব্যাংক কর্মকর্তা আক্রোশ নিয়ে বলে, আপনি কি জন্য ডিপিএস করেন? প্রতিবছর ই ভেঙে ফেলেন। আমি স্মিত হেসে জবাব দেই, কপালে সন্চয় নাই রে ভাই। উল্লেখ্য আমার লাইফে কোন ডিপিএস আমি ম্যাচিওর করতে পারিনি ভবিষ্যতেও পারব বলে মনে হয়না। সাথে জানুয়ারির বেতনের কিছু অংশ সহ এক লক্ষ বিশ হাজার হল। তারমানে পকেট মানি মাত্র বিশ হাজার (আমার জন্য বিশাল)। কেউ যদি তখন এ হিসাব শুনতো, আমাকে হয়ত যেতেই দিত না।

ছুটি নিতে গিয়ে হেড অফিস দারুনভাবে সাপোর্ট দিয়েছে, মেইল দেয়ার ১০মিনিটের মধ্যে এপ্রুভ করে দিয়েছে। ছুটি নেয়া শেষ, পোষাক বানানো সহ সবকিছুর প্রস্তুতি সম্পন্ন। ফেব্রুআরি র আট তারিখ রাতে ফ্লাইট, আগের রাতে বাড়ি এসে সব ঠিকঠাক করে গেছি, পরের দিন অফিস করে আবার এসেছি বিকেলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিব বলে। ঐদিন আবার খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়া হচ্ছে, তুমুল হট্টগোল আর উৎকন্ঠায় ঢাকায় পৌছেছি। এদিকে দুই সপ্তাহ আগে কিছু আতœীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশি মিলে একশ জনের মত দাওয়াত দিয়েছিলাম। সবাই দোয়া করে দিল যেন সবকিছু সহি সালামতে হয়। বাড়ী থেকে বের হওয়ার আগে বউ জানতে চাইল, টাকা পয়সা কি কিছু নিতে পারছো? আমি বললাম, সামান্য পকেট খরচ হাজার বিশেক হবে হয়ত, তারপর সে আমার হাতে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বলল, এটা রাখো। এতদুরে যাবে, হাতে টাকা না থাকলে কেমন লাগে ? আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, হায় আল্লাহ! তুমি কি না, পারো??চোখের কোণে পানি চলে আসলো।

যাক, রাতে শালিকার বাসায় বিশ্রাম নিয়ে এয়ারপোর্ট চলে গেলাম নির্দিষ্ট সময়ের ৩ ঘন্টা আগেই। খুব সহজেই ইমিগ্রেশন শেষ করে অপেক্ষায় থেকে বিমানে ওঠলাম। সত্যিই কি আমি কাবা’র সামনে দাড়াবো? হায় মাবুদ, তোমার কি দয়া। আমাদের ট্রানজিট বাহরাইনে ৬ঘন্টা। ওখানে আমরা ইহরেমের কাপড় পড়লাম, যা যা নিয়ম কানুন সব মেনে ২রাকাত নামাযে যখন দাড়িয়েছি, হায় চোখের পানি!! কেন আসলো, কোথা থেকে আসলো, আল্লাহ ই ভাল জানে। আমার মত মধ্যবিত্ত আল্লাহর মেহমান? অথচ কোটি কোটি টাকার মালিকও যেতে পারেনি, আর আমি যাচ্ছি? তখনো বিস্ময়ে হতবাক।

বাহরাইন এয়ারপোর্ট ঘুরে ঘুরে দেখে নিলাম খুবই পরিপাটি সাজানো গোছানো।এভাবে কখন যে ৬ঘন্টা প্রায় শেষ হয়ে গেল টের ই পেলামনা।ফর্মালিটি শেষ করে সৌদি এয়ার লাইন্সে ওঠে বসলাম। মাত্র ২ঘন্টার পথ কিনতু নীচের সাগর, পাহাড় সবি দেখা যায় আর চোখের পানি কেন যেন বন্ধ হয়না। জেদ্দা বিমান বন্দরে নেমে কঠিন কিছু ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করতে গিয়ে নতুন কিছু শিখলাম। সৌদি অফিসার আরবী ছাড়া ইংরেজি বুঝে না। উনি কি বলে আমি বুঝিনা, আমারটা উনি বুঝেনা, কিছুটা বোবাদের মত আকার ইংগিতে কাজ শেষ করলাম।এর আগের বছর নেপাল গিয়েছিলাম,( তাও ধার দেনা আর ডিপিএস ভেঙে) এরকম সমস্যা হয়নি, ওরা ভাল ইংরেজী বলে এবং বুঝেও ভাল। সবার সবকিছু শেষ করে মক্কার উদ্দেশ্যে বাসে ওঠলাম আমাদের টীমের ১৪জন সদস্য। বাস ষ্টেশনে ভাষা নিয়া আরো সমস্যা, ওখানেও যে প্রতারক আছে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। এবার মিনি ট্যুরিস্ট বাস চলতে শুরু করলো মক্কার পথে….. একজন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পথে……।
লেখক : যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা ও সেবা পরিচালক,এপেক্স ক্লাব অব কুমিল্লা। মোবাইল :০১৯১৩-৫৭৮৪৯৪।