শনিবার ১৫ অগাস্ট ২০২০


মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পথে কাবা – ২


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.07.2020

এ,বি,এম মোস্তাফিজুর রহমান।।

বাসটি ধূ ধূ মরুভুমির বুক চিড়ে রাস্তায় চলছে আর লু হাওয়া এসে শরীর তাতিয়ে দিচ্ছে মাঝেমাঝে। আমি উদাস নয়নে তাকিয়ে আছি মরুর দিকে, হঠাৎ করেই আমার চাকুরীর প্রথম কর্মস্থল, কলেজের ২০০৫ সালের এক কলিগের কথা মনে পড়ল। বলেছিলাম স্যার, “আমি ত কোনদিন মনে হয় আল্লাহর ঘর দেখতে যেতে পারব না?” উনি পয়সাওয়ালা মানুষ এবং তখনো উনার হজ্ব ফরজ হয়ে আছে, উনি একটু তাচ্ছিল্য সুরে বললেন, “আপনারে আল্লাহ ফরয করলে ত আপনি যাবেন, নইলে যাওয়ার দরকার কি?” আমি চুপসে গেলাম। কথা ত ১০০% সত্য। আল্লাহর খেলা বুঝা অনেক কঠিন, ঐ স্যার ত এখনো আসতে পারেনি আর আমি মক্বার পথে। আবার চোখের কোনে পানি জমে ওঠল……।

গাড়ী প্রায় তিনঘণ্টায় পৌছল হোটেলের সামনে তখন আসরের সময়, হোটেলের সকল ফর্মালিটি শেষ করতে করতে মাগরিব ছুই ছুই। আমাদের হোটেলটি কবুতরের মাঠের পাশেই। প্রত্যেক এজেন্সীই আপনাকে কথা দিবে,” কবুতরের মাঠের পাশে” হোটেল কারন এটি হেরেম শরীফ থেকে ৫০০গজের মধ্যেই। কিনতু সবাই দিতে না পারলেও আমার এজেন্সী ঠিক ঠিক ওখানে দিয়েছিল।

আমি অস্হির কখন গিয়ে কাবা’র সামনে দাড়াবো। মোয়াল্লেমকে বললাম, ভাই চলেন ত, উনিসহ আমরা ৫জন গেলাম হেরেম শরীফের ভিতরে। শরীর কেপে কেপে ওঠছে, মন উতলা হয়ে যাচ্ছে, পায়ের তলার মাটি সরে সরে যাচ্ছে, কোন শক্তি পাচ্ছি না শরীরে, এ যেন এক প্রেমময় সাক্ষাৎ। ‘কাবা ঘর’ দেখামাত্র আপনি যে দোয়া করবেন সেটাই কবুল। কতকিছু মনে করে যে গেলাম কিনতু কাবা দেখে সব শেষ। মনে একটা কথা আসছিল। কবুল হয়েছে নিশ্চিত।আলহামদুলিল্লাহ।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাগরিবের আযান হল, নামাযে দাড়িয়ে গেলাম। নামায শেষে কাবা’র যে সৌন্দর্য সেটা অনেকক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে উপভোগ করেছি। যতই দেখি মন ভরেনা, আহহহ কি যে শান্তি পাচ্ছিলাম। বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে।

সারাদিনে কিছুই খাইনি, চা খেয়ে গিয়ে ভাত খেলাম। আমাকে দুজন মুরব্বী র দায়িত্ব দিয়ে আমাকে এশার নামায ও ওমরা শেষ করার অনুমতি দিল মোয়াল্লেম। এশার পড়েই ওমরার কাজ শুরু করলাম।

“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা- শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারীকা লাক্।” অর্থাৎ
“আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, আমি হাজির, কোন অংশীদার নাই তোমার, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই। আর সকল সাম্রাজ্য ও তোমার, কোন অংশীদার নাই তোমার।” এই তালবিয়াহ পাঠ করতে হয় একটু পর পর।।

ওমরার ২টি ফরযের মধ্যে একটি হল ইহরাম বাধা, সেটা বাহরাইনেই করে ফেলেছি আরেকটি হল আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করা(৭ চক্কর দেয়া), সেটা শুরু করলাম মুরব্বী দুজনকে দুহাতে ধরে ধরে। ওখানে কেউ হারালে তাকে ফেরত পাওয়া অনেক কঠিন।উনাদেরকে বলেছি, যদি হাত ছুটে যায় টেনশন না করে সাতবার ঘুরা শেষ হলে একটা জায়গা দেখিয়ে বলেছি ওখানে দাড়িয়ে অপেক্ষায় থাকবেন। পাশাপাশি তাওয়াফের সাথে সুন্নতগুলো আদায়ের চেষ্টা করেছি সাধ্যমত।

তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে বসে কাবা’কে সামনে রেখে দুই রাকাত “ওয়াজিবুত তাওয়াফ” নামায আদায় করতে হয়। এটি ওয়াজিব আমল। নামায শেষে জমজমের পানি পান করা সুন্নাত আমল। তারপরে গুরুত্বপূর্ণ ২টি ওয়াজিব আমল সাফা মারওয়ায় সাতবার সায়ী করা এবং মাথা মুন্ডন করা। এ কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে শেষ করেই একটি ওমরা সম্পুর্ণ করে ফেলি। এই কাজগুলো করতেই প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লেগেছে, অনেক কষ্টের, অনেক সাধনার, অনেক ভালবাসার কাজ এটি। রাত বারোটায় হোটেলে ফিরেছি দুজনকে নিয়ে।

একটু ঘুমিয়ে আবার তিনটায় তাহাজ্জুদ পড়তে ওঠব, ভাবলাম একা একা গিয়ে হেরেম শরিফে চুপি চুপি নামায আদায় করব। হোটেল থেকে রাত তিনটায় বেড়িয়ে দেখি, হায়রে মানুষ আর মানুষ এত মানুষ ত দিনেও দেখিনি। হুম সবাই চুপিচুপি তাহাজ্জুদ পড়তে যায়। আল্লাহু আকবর।। একেবারে ফজর শেষ করে নাস্তা খেয়ে হোটেলে এসে ঘুম। এভাবেই রুটিন চলছিল।
আজ ২য় রাত। আমার আম্মা ২০১৪ সালে গত হয়েছেন, উনার জন্য ওমরা করব। রাত প্রায় ১১টায় ওমরা শেষ করে হোটেলে ফিরেই ইহরাম পড়া অবস্হায় বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি, চোখ বন্ধ করতেই ঘুমে তলিয়ে গেছি আর আম্মা এসে হাজির। আমাকে জড়িয়ে ধরেছে আর কি যে খুশি, কত যে খুশি আমি লিখে বর্ণনা করতে পারব না। আলহামদুলিল্লাহ মনটা ভরে গেল, তৃপ্তি নিয়েই সজাগ হলাম।।
তৃতীয় রাতের মিশন “হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া” যদিও এটি সুন্নত আমল এবং দুর থেকে ইশারা করলেও হয়ে যায় কিনতু এই বাঙালী কাঙাল মন কি আর মানে?? এখন আমার সবসময়ের সাথী একজন মুরব্বী। দুজন মিলে রাত ১১টায় গেলাম কাবা শরিফ তাওয়াফ করব এরপর লোক কমে যাবে চুমো খাব। রাত ২টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও হাজরে আসওয়াদের পাশ থেকে কমপক্ষে ৫০০জন লোকের সমাবেশ কখনোই শেষ হয় না দেখে হতাশ মনে দুজনে ফিরে এলাম।
চতুর্থ রাতে মিশন সাকসেস করবই করব, না করে ফেরত আসব না। দুইজনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।আলহামদুলিল্লাহ ২/১ বার ব্যর্থ হলেও আল্লাহ সুযোগ করে দিয়েছেন। অবশেষে হাজরে আসওয়াদে চুমো দিতে পেরেছি।।
৫ম দিনে জিয়ারতে সবাই বেরিয়েছি নবীজির বাড়ী বা মাওলিদুন্নবী, হেরা পর্বতের গুহা, নবীজি যে গুহায় লুকিয়েছেন সেটা, আরাফাতের ময়দান, বিদায় হজ্ব ভাষনের স্হান জাবালে রহমত, মীনা, মুযদালিফা, জান্নাতুল মা’লা, জান্নাতুল বাকি, জাবালে সাওর, মসজিদে খাইফ, মসজিদে নামিরাহ, মসজিদে জ্বীন, জামারাহ যেখানে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করা হয় আর আবু জাহেলের বাড়ী (মক্কার প্রধান হাম্মামখানা)তে সুযোগ পেলেই সবাই গিয়েছে এবং আরো অনেক কিছু। কিন্তু খুব আশ্চর্য হলাম, জাবালে নুর বা হেরা পর্বতের গুহা দেখে, এত উচুতে প্রতিদিন দু বেলা করে ওঠা নামা করেছেন বিবি খাদিজা (রাঃ) নবীজী কে খাবার দিতে গিয়ে, সুবহানআল্লাহ। আল্লাহ চেয়েছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
আজ ষষ্ঠ দিনে এক ছোটভাই বাহরাইন থেকে আসবে আমার সাথে ওমরা করতে, এটা তার আগেরই ঘোষনা ছিল, সে বিকেল নাগাদ পৌছল সাথে বিশাল একটা কম্বল সাথে প্রচুর গিফট ও সাথে তার একজন কলিগ। রাতে খাসির মাংস দিয়ে তিনজনে খেয়ে আয়েশা মসজিদে গিয়ে ইহরাম বেধে ওমরা করলাম। সারারাত একসাথে হেরেমে কাটালাম, চমৎকার কিছু মুহুর্ত কাটিয়ে দুজনের বিদায়ের ঘন্টা বেজে ওঠল। আর চমকটা তখনি, যাবার আগে সে আমাকে (২৫০০রিয়েল*২২) বাংলা টাকায় প্রায় ৫৮হাজার টাকা দিয়ে বলল, ভাই মন খুলে খরচ করুন, বললাম আরে আমার কাছে অনেক টাকা আছে। টাকা লাগবে না। ও বলল, আল্লাহ আবার কবে আনে, না আনে, মন খুলে খরচাপাতি করে যান। মদিনা গিয়ে যদি আরো টাকা লাগে আমাকে কল দিবেন, ওখানে টাকা পৌছে যাবে। কিনতু আফসোস নিয়ে এদেশ থেকে যেন যেতে না হয়। আবারো চোখের কোনে পানি জমে ওঠল, আল্লাহ আমাকে এভাবে আয়োজন করে দিবে… চিন্তা করা যায়?? পরে শর্ত দিয়ে টাকাটা নিয়েছিলাম, তুমি দেশে গিয়ে টাকাটা ফেরত নিতে হবে।শোকরিয়া।
এছাড়া আমার বড় বোনের ছোট ছেলে সোহাগ, সে প্রতিদিন দেখা করত, প্রতিদিন ই এটা সেটা সব নতুন নতুন খাবারে আপ্যায়িত করেছিল। আল্লাহ চাইলেই অনেক কিছু হতে পারে যা আমাদের কল্পনাতেও নাই। আল্লাহ মহান।
আরো দুদিন কাটিয়ে মক্কা বিদায়ের পালা। সবকিছু গোছানোর পালা। ৮দিনের মাথায় আমরা মদিনা মোনওয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই এক বুক বেদনা নিয়ে। কাবা’কে ছেড়ে যাওয়ার যে কি কষ্ট তা বলে বুঝানো যাবেনা। তা শুধু অনুভব করা যায়।
“পকেট শূন্য মধ্যবিত্তের” “লক্ষাধিক” টাকা নিয়ে স্বপ্ন এবার ছুটে চলেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির শহর সোনার মদিনার পথে……।
লেখক : যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা ও সেবা পরিচালক,এপেক্স ক্লাব অব কুমিল্লা। মোবাইল :০১৯১৩-৫৭৮৪৯৪।