সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০


মধ্যবিত্তের স্বপ্নের কাবা – শেষ পর্ব


আমাদের কুমিল্লা .কম :
08.07.2020

এ,বি,এম মোস্তাফিজুর রহমান।।

মদিনায় যাওয়ার বাসটি যথেষ্ট লাক্সারিয়াস, বড় এবং এসি বাস। বাস ছাড়তেই গাড়ীতে খটমট শুরু করলো এক মহিলা। উনি উনার স্বামীকে নিয়ে সামনের দিকে বসবেন। মহিলাদেরকে সামনে একপাশে দিয়েছে। আমি ডান পাশে তৃতীয় সারিতে, চিল্লাচিল্লি দেখে বললাম, “আমিই পেছনে যাচ্ছি, আপনারা দুজন একসাথে বসুন”। আমাদের ভ্রমনপাগল “খালু গ্রুপের” কেউ কখনো সামনে পিছনে বসা, বিছানায় বা ফ্লোরে শুয়া এগুলো নিয়ে কখনো হা হুতাস করেনা। এ ব্যাপারটা আমরা খুব দারুনভাবে রপ্ত করেছি। মোতোয়াল্লি বলল, না জুয়েল ভাই, আপনি সামনেই বসেন। আরে না উনারা বসতে চায় বসুক, পিছনে আমার কোন সমস্যা নাই। উনারা বসলেন, শান্ত হলেন।।

গাড়ি চলছে… পাথরের পাহাড়, মাঝেমধ্যে উট, কখনো গাধা দেখা যায়, ধূ ধূ মরুভুমির মাঝখানে সোজা রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে মক্কা থেকে উত্তরে প্রায় ৪২৫ কিঃমিঃ দুরের ইয়াছরিব বা আল মদিনা বা মদিনা মোনওয়ারা শহরের দিকে যেখানে চিরশায়িত আছেন দোজাহানের বাদশা, সাইয়েদুল মোরসালিন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। যার কারনে আজকের মদিনা সম্মানিত, অধিবাসিরা সম্মানিত, কোলাহলমুক্ত।আছে মসজিদে নববী, যেখানে এক রাকাত নামাযে হাজার রাকআত সওয়াব, আছে নবীর দুই কাছের মানুষের সমাধি, শত শত সাহাবী, তাবে তাবেঈন দের সমাধি আরো অনেক কিছুই।

মদিনায় যাওয়া যদিও হজ্ব বা ওমরার অংশ না (মত পার্থক্য আছে) হলেও ওখানে আপনি না গেলে নিজে এক অপরাধী হয়ে ফিরবেন। নবীকে ভাল না বাসলে আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার কোন সুযোগই নেই। মনের টানে, জীবনের ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে, নবীর রওযার সামনে দাড়িয়ে সালাম দেয়ার লোভ কোন মুমিনকে মদিনায় না নিয়ে ছাড়েনা। এ কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। সর্বোপরি মদিনা যিয়ারত কেয়ামতের কঠিন সময়ে হুজুর (সাঃ) এর শাফায়া’ত পাওয়ার একটি সহজ উপায়। অতএব উনার প্রতি আন্তরিক মহব্বত ভালোবাসা, ভক্তি শ্রদ্ধা অন্তরে পোষন করতে হবে। অন্যথায় ঈমানই পূর্ণ হয়না।

লাখ লাখ শোকরিয়া আজ সে পথেই যাচ্ছি আমরা। প্রায় ৬ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌছলাম নবীর শহরে।
হোটেলে ওঠে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে আসর পড়তে যাব মসজিদে নববী তে। হোটেল থেকে প্রায় দশ মিনিটের হাটা পথ কিনতু বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস মক্কার পুরোই বিপরীত আবহাওয়া। মক্কার তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রী আর এখানে মাত্র ১৯ডিগ্রী। কিছুটা অপ্রস্তুত এ পরিবেশে।

আসর পড়েই ছুটলাম নবীর রওযায় ছালাম দিব বলে। বাবুস সালাম গেট দিয়ে ঘুরে যেতে হয়। এত ভীড় এত ভীড় যে ভয়ই পেলাম কাছে যেতে পারব ত?

আলহামদুলিল্লাহ অবশেষে “আস্ সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া রাছুলউল্লাহ, আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ, আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া শাফিউল মোজনবী, আস সালাতু আস সালামু ইয়া রাহমাতুল্লিল আলা’মিন” বলার সুযোগ আল্লাহ দান করেছেন। তবে আস্তে আস্তে হাটার মধ্যেই থাকতে হয়, দাড়ানোর সুযোগ দেয়না পুলিশ।

তবে অনেকে ভুল করে প্রথম অংশকে নবীজির রওযা মনে করে, আসলে প্রথম ২টি অংশ খালি, তৃতীয় টি নবীজির, চতুূর্থটি হযরত আবু বকর (রাঃ), পন্চমটি হযরত ওমর (রাঃ) র। পরের দুটিও খালি। বাইরে এসে সবুজ গম্বুজের দিকে তাকিয়ে দোয়া করলাম। এই “সবুজ গম্বুজের” দিকে প্রথম নজর পড়া মাত্রই যা চাইবেন নিশ্চিত কবুল। যেটা আমি গাড়ী থেকেই দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। শোকরিয়া।

তারপরে আমরা জান্নাতুল বাকি তে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সাহাবী দের সমাধি দেখলাম, সবাই মিলে জিয়ারত করলাম। তবে একটা বিষয়ে খুবই খুশি ও আশ্চর্যন্বিত হলাম, জান্নাতুল বাকি র পাশে যে নিয়ম কানুনের সাইনবোর্ড দেয়া ছিল সেখানে আরবী, ইংরেজি এবং বাংলা ভাষায় লিখা ছিল। বুকটা গর্বে ভরে গেল। এটা মক্কাতেও লক্ষ্য করেছিলাম। মাগরিব পড়ে চা নাস্তা খেয়ে মসজিদে নববী র রাতের অসাধারন সৌন্দর্যময় রুপ দেখার জন্য ওখানে বসেই ইশার নামাযের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। নামায শেষে হোটেলে এসে খেয়ে জার্নির ক্লান্তিতে শরীর এলিয়ে দিয়েছি নতুন এক ভোরের আশায় যেখানে তাহাজ্জুদ আর ফযরেরর নামায হাতছানি দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।

এভাবেই রুটিন মাফিক চলছিল, সবাই মিলে মদিনার ঐতিহাসিক স্হানসমুহ দেখব বলে বেরিয়েছি। ঘুরে ঘুরে দেখলাম আসহাবে সুফফা, মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন, জাবালে উহুদ, জ্বীনের পাহাড় এবং খেজুর বাগান, খেজুর মার্কেট ইত্যাদি।

সবচেয়ে সেরা আকর্ষন হচ্ছে, মসজিদুন নববী। অসাধারন সব স্হাপত্য কারুশৈলীতে ভরপুর আর চোখ জুড়ানো সব সৌন্দর্যময় নকশায় মদিনা শরিফের প্রধান মসজিদ। নবী করিম (সাঃ) নিজে সাহাবী দের নিয়ে এ মসজিদ তৈরি করেছেন। এখানে নবীজির দেহ মোবারক কবরস্হ আছে। উনার পাশে হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) র কবর।এ মসজিদে বর্তমানে প্রায় দশ লক্ষ মুসল্লী একত্রে নামায পড়তে পারেন। এর অভ্যন্তরে ঐতিহাসিক ঘটনা সম্বলিত অনেকগুলো খাম্বা বা পিলার রয়েছে।

আরো আছে রিয়াদুল জান্নাহ। নবীজি (সাঃ) বলেছেন, “আমার ঘর ও আমার মিম্বারের মধ্যবর্তী স্হানটি জান্নাতের বাগান সমুহ থেকে একটি বাগান। আর কিয়ামতের দিন আমার মিম্বার আমার হাউজে কাওসারের উপর স্হাপিত হবে।” এখানে দু রাকাত নামায পড়া যেন জান্নাতে নামায পড়ার সমতুল্য। ইহার উত্তর পশ্চিম কোনে হযরত বেলাল (রাঃ) এর আযানের স্হান।

এরমধ্যে একরাতে আমাদের সাথে ১৪ জনের মধ্যে ৫ জন মহিলা ছিলেন, উনারা উনাদের মাহরামের সাথেই এসেছেন। কিনতু হোটেলে মহিলা পুরুষ আলাদা রুমে থাকতে হচ্ছে। মহিলারা একসাথে থাকবে আর ঝগড়া হবেনা, এটা কি চিন্তা করা যায়???(তবে সবার কথা বলছি না) ঠিকই এরকম জায়গায় এত ভাল কাজে গিয়েও নিজেদেরকে আলাদা করতে বা শুদ্ধি করতে পারেনি। তুমুল ঝগড়া!! মোতওয়াল্লি, স্বামীরাও মিলে থামানো যাচ্ছে না,পরে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে উনাদের উপস্হিতিতে আমার উপর দায়িত্বটা পড়ল। যাক, সেদিন আল্লাহ মান সম্মান রেখেছিল আমার।

প্রতিদিন আসরের নামায পরেই কেনাকাটা করতে বের হতাম, ফাকে এসে মগরিব, ইশা পড়তাম। এরপর টানা চলত কেনাকাটা। কেনাকাটা র প্রথমদিনেই বউয়ের জন্য ২টা চুড়ি নিলাম। এরপর আস্তে আস্তে মনের ইচ্ছামত খরচ করলাম, তবুও টাকা শেষ হয়না। আল্লাহ কি খেলাটা আমাকে দেখালো যে আমার টাকা ই শেষ হয়না। এজন্যই কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে নেই, হওয়া যাবেনা।

শেষদিনে লাগেজ গোছাতে গোছাতে ঘাম ছুটে গেল। সন্ধ্যায় মদিনা এয়ারপোর্টে পৌছলাম। মন খারাপ। চলে যাচ্ছি, আবার এ ভেবে শান্তি পাচ্ছিলাম, পরিবারের কাছে যাচ্ছি। সেদিন প্রবাসীদের মনের অবস্হা আঁচ করতে পেরেছিলাম।

দশ লিটার ওজনের একটি ক্যানে করে নিজের হাতে “জমজমের পানি” অনেক কষ্ট করে ভরে মক্কা থেকে বয়ে মদিনা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এনেছি কিনতু ঢুকতে বাধা দিল। এরকম ক্যান নিয়ে ঢুকা যাবেনা। তবে উনাদের প্যাকেজিং করা পানি কিনে নিতে পারব। এত কষ্ট পেয়েছিলাম আজো মনে পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়। পরে উনাদের পানি কিনে ইমিগ্রেশনে কঠিন কঠিন সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিমানে ওঠতে পেরেছিলাম।

এভাবেই একজন “মধ্যবিত্তের স্বপ্নের কাবা” দর্শন আল্লাহ তা’আলার অশেষ নেয়ামতপ্রাপ্ত হয়ে সম্পন্ন করতে সমর্থ্য হয়েছিল।

পুনশ্চঃ আপনি যদি মন থেকে বারবার আল্লাহর কাছে আবেদন করেন, আপনি যে ই হউন হতাশ হওয়ার কিছু নেই, আপনাকে সেই কাবা’র সামনে আল্লাহ নিয়ে যাবেন যাবেন এবং অবশ্যই নিয়ে যাবেন।
লেখক : যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা ও সেবা পরিচালক,এপেক্স ক্লাব অব কুমিল্লা। মোবাইল : ০১৯১৩-৫৭৮৪৯৪ ।