বুধবার ১২ অগাস্ট ২০২০


আমার করোনা জয়ের গল্প


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.07.2020

এ,বি,এম মোস্তাফিজুর রহমান।।
আমার বাচ্চাদের সাথে দাবা খেলতেছি, হঠাৎ করে শরীরটা কেমন যেন মেজ মেজ করছে, বউকে ডেকে বললাম, “শরীরটা যেন কেমন কেমন লাগছে, দেখতো গা টা গরম কি না”? ও কপালে গলায় হাত দিল, “হুম গরম তো”। থার্মোমিটার টা এনে মাপলাম, দেখি তাপমাত্রা ১০০+, সাথে সাথে খেলাটা শেষ করে বাচ্চাদের ভিতরের রুমে পাঠিয়ে বললাম, আমি এই মুহুর্ত থেকে ড্রইং রুমে থাকলাম।
আমার কিছু কাপড়, জায়নামাজ, টুপি, কোরআন শরীফ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ইত্যাদি ইত্যাদি এনে সবাইকে বললাম, আমার জ্বর, তোমরা কেউই এ রুমে আসবেনা, আমাকে শুধু তোমাদের আম্মু দরজায় এসে খাবার দিয়ে যাবে। পাশাপাশি ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করলাম। উনি শুধুই ঘধঢ়ধ বীঃবহফ খেতে বললেন।
দুপুরে নামায পড়ে আলাদা ভাত খাচ্ছি, মনে হয় কলিজাটা ছিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে শুধু ভয়ে। আমি কি তাহলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গেলাম? অন্যদিন দুপুরে খাওয়ার পরেই ঘুম চলে আসে কিন্তু আজকে আর ঘুম আসেনা। বাচ্চারা এদিক দিয়ে ওদিক দিয়ে চলে আসবে আসবে করছে, এগুলো দেখে মনটা আরো খারাপ হয়। যাক, রাতে ওঠে তাহাজ্জুদ পড়ছি চোখে শুধু পানি আর পানি, মনকে কিছুতেই মানাতে পারছিনা। হায় একি হল?
সকালে নাস্তা খাওয়ার পর থেকে জ্বর সেরে গেল। খুব ভাল বোধ করছিলাম সারাটা দিন। পরের দিন অফিস থেকে জানালো, আপনি নেগেটিভ রিপোট নিয়ে জয়েন করতে হবে। আমি পুরাই সুস্হ। কিন্তু টেস্ট করতে হবে জেনে মাথাটা আরো নষ্ট হল, টেষ্টের কি ঝামেলা! এটা যারা করেছে শুধু তারাই জানে। বন্ধু ডাঃ শাহিনের বউ রিফাত ভাবী হেলথে চাকুরী করে আমাদের সদর হসপিটালে, তিনিই ব্যবস্হা করে দিলেন। মোটামুটি সহজভাবেই স্যাম্পল দিতে পেরেছি।
মানুষ যে কত অসচেতন এটা হসপিটালে গেলে আপনি বুঝতে পারবেন। করোনার মত ভয়ংকর রোগের স্যাম্পল দিতে গিয়েও সামাজিক দুরত্ব মানেনা, মানতে চায় না। আমি বললাম, ভাই, একটু ওপাশে দাড়ান। তার উত্তরে আমি হতবাক! বলল, আরে ভাই, চা দোকানে একসাথে বসেন, কিছু হয়না, হাসপাতাল আসলেই নাটক? এবার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নি, বললাম, যান মিয়া ঐদিকে যান, ভদ্রভাবে বলছি দেখে ভাল লাগেনা? চোখ গরম করার পরে কিছুটা দুরে গিয়েছিল। হায়রে বাঙালী, হায়রে করোনা।
পুরোপুরি সুস্হ অবস্হায় স্যাম্পল দিয়ে এসেও শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আইসোলেশনে ছিলাম। জুমার নামায পড়ে এসে সবার সাথে একসাথে খেলাম, বাচ্চারা খুবই খুশি, আমারও খুব ভাল লাগছে।
রোববার নাস্তা খেয়ে সবাই মিলে লুডু খেলছি, হঠাৎ হাসপাতাল থেকে ডাঃ মিঠু সাহেবের ফোন, আপনি কি এ,বি,এম মোস্তাফিজুর রহমান ? জি বলছি। আপনার রিপোর্ট টা পজিটিভ এসেছে, আপনি আইসোলেশনে থাকতে হবে আর আগামিকাল কাউকে পাঠালে ওষুধগুলো দিয়ে দিব। তারপরের প্রশ্ন, আপনি কি সত্যিই মোস্তাফিজুর রহমান? হুম, কিন্তু সন্দেহ করছেন কেন? না মানে, আপনার কন্ঠ শুনে অসুস্হ মনে হচ্ছেনা। বললাম, ভাই পজিটিভ শুনে আমিও আশ্চর্য হয়েছি। আরো বলে দিল, থানা থেকে কল দিবে, যেন রেসপন্স করি।
খেলাটা এখানেই বন্ধ। সবাইকে সরিয়ে দিলাম আরো কঠোরভাবে, মনের ভিতরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, ওদেরকে বুঝতে দিচ্ছি না। আব্বা শুনেই স্ট্রোক করার মত অবস্হা, না ওনাকে সামলাতে পারছি, না বউকে। বউও কান্না শুরু করে দিল, সাথে বড় মেয়েও, কি যে পরিস্হিতি!!
ভুক্তভোগীরাই ফীল করতে পারবে। কোথায় আমাকে শান্তনা দিবে, সেখানে আমি সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। হাতে পায়ে অস্হিরতা, মনে হচ্ছে পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, কান গরম হয়ে ওঠছে, গলাটাও ধরে আসছে, কি করব বুঝে ওঠতে পারছিনা। চুপচাপ বসে মাথাটা ঠান্ডা করার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছি, পারছিনা।
কিছুক্ষণ পর স্হির হয়ে মামাতো ভাই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মেহেদী কে কল দিলাম। মেহেদী, ভাইয়ার তো রিপোট পজিটিভ আসছে, কি করব? ও বলল, “আলাদা থাকেন, লেবুর গরম পানি খান, গরম পানি সবসময় খাবেন,ভাপ নিবেন, সেই সাথে পুষ্টিকর খাবার খান আর বিশ্রাম করেন। আপাতত কোন ওষুধের প্রয়োজন নাই। আপনি সুস্হ আছেন”। ওর এই সাজেশনে আমি ৮০% সুস্হ হয়ে গেলাম। একজন ডাক্তারের ভাল ব্যবহারেই রোগী দারুনভাবে রিকোভার করে থাকে।
তো সারাদিন বাচ্চাদের সাথে দুর থেকে হাই হেলো করে করে, লেখালেখি করে, গল্পের বই পড়ে, ফেসবুক চালিয়ে, কখনো ইবাদত করে সময়টা ভালই কাটে, সমস্যাটা শুরু হয় রাতে, ভয় লাগে শুধুই ভয়। এই বুঝি গলাটা ধরে এল, নিঃশ্বাসটাও ভারী ভারী লাগছে এভাবেই আতংক নিয়ে প্রতিটা রাতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি, ফযরে যখন টের পাই তখন মনে হয় আরেকটা দিন বেঁচে গেলাম, আহহ!!
পরবর্তীতে ২য় বার স্যাম্পল দিয়ে জুলাই র দুই তারিখে নেগেটিভ রিপোট পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।।
এতো গেল নিজের অবস্হা। এবার #সামাজিকতারথকথাথবলি। আমাদের কাজের লোককে এক প্রতিবেশি আসতে বাধা দিচ্ছে, শুনে খালাকে বললাম, থাক, আপনি আইসেন না।
তারপর একজন শুভাকাংখী(!) পুলিশকে জানালো, আমি করোনা নিয়ে রাস্তায় ঘুরাঘুরি করি, প্যানেল চেয়ারম্যান জহির ভাই প্রচন্ড প্রতিবাদ করল পুলিশের সাথে। যে জুয়েল রুম থেকেই বের হয় না,আর ও যাবে রাস্তায়?
এবার আরেক গল্প, আমাকে নাকি প্রতিদিন এম্বুলেন্স এসে হসপিটালে নিয়ে যায়, আবার দিয়ে যায়।
সর্বশেষ পেরেকটা মারলো আরেক শুভাকাংখী(!!), পাপ করেছি বলেই করোনা রোগ হয়েছে।
আর কিছু কাছের লোক যারা বিভিন্ন সময়ে আমার ও আমার পরিবারের কাছ থেকে #সুবিধাপ্রাপ্ত, একবার ফোন করে খবর নেয়ার ভদ্রতাটুকুও দেখান নি।
সে এক দারুন অভিজ্ঞতা আর তথাকথিত শুভাকাংখী চেনার এক মোক্ষম সুযোগ।
এতকিছুর পরেও আমার মামা, বড়বোন, ভাগ্নে, ভাগ্নি, ছোটবোন, কয়েকজন বন্ধু আমার বাড়ীতে এসে দেখে গিয়েছে। সর্বোপরি প্যানেল চেয়ারম্যান জহির ভাই ও তার পুরো ফ্যামিলি আমাকে ও আমার পরিবারকে দেখাশুনা ও মানসিকভাবে চমৎকার সহযোগীতা করেছেন। এক ছোট ভাইয়ের বউ ভোরবেলা গোপনে এসে গাছের লেবু দিয়ে গেছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
আরো কিছু আতœীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব আমার জন্য তাহাজ্জুদ নামায পড়েছে, রোযা রেখেছে, প্রতিনিয়ত দোয়া করে গেছেন। আর সাংগঠনিক কাছের মানুষগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে, বারবার কল দিয়ে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন, সম্মানিত করেছেন, তাদের প্রতি ভালবাসা।

লেখক : যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা ও সেবা পরিচালক,এপেক্স ক্লাব অব কুমিল্লা। মোবাইল : ০১৯১৩-৫৭৮৪৯৪ ।