বুধবার ১২ অগাস্ট ২০২০


সোয়েমই শারমিনকে হত্যা করেছে দাবি নিহতের বাবার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.07.2020

ব্রাহ্মণপাড়া প্রতিনিধি।।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮নং মালাপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম চন্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম (বাহারম ভুইয়া’র) ছেলে সোয়েম ভুইয়া (৩৫)। নিজেকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে পরিচয় দিলেও দীর্ঘ দিন যাবত মাদক, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও বিভিন্ন প্রকারের অপকর্মসহ নানান অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে স্থানীদের অভিযোগ। স্থানীয়রা আরও জানায় একের পর এক বিয়ে করে স্ত্রী হত্যা করা তার পেশা। এ পর্যন্ত তিন স্ত্রীকে হত্যা ও কয়েকটি ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ১০ জুলাই শুক্রবার রাতের কোন এক সময় পশ্চিম চন্ডিপুর গ্রামের হত দরিদ্র রিকশা চালক আব্দুল মান্নান সরকারের মেয়ে শারমিন আক্তারের লাশ তার সাবেক স্বামী সোয়েম ভুঁইয়ার ঘরের পাশের কাঠাল গাছের নীচ থেকে উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ।
এলাকাবাসী অভিযোগ করে জানায়, শারমিনকে তার সাবেক স্বামী সোয়েম ও তার পরিবারের লোকজন হত্যা করে আত্মহত্যার অপবাদ দিয়ে এলাকা থেকে উধাও হয়েছে। এ নিয়ে রবিবার জাতীয় ও স্থানীয় বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। রবিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় এম এ চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার হারুনুর রশীদ ভুঁইয়াসহ বেশ কয়েকজন এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানাযায়, চাঞ্চল্যকর হত্যাকা-ের স্বীকার পশ্চিম চন্ডিপুর গ্রামের হত দরিদ্র রিকশা চালক আব্দুল মান্নান সকোরের মেয়ে শারমিন আক্তার এম এ চন্ডিপুর রেজাউল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে অষ্টম শ্রেণীতে জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরম পূরণ করে। শারমিনের বয়স তখন মাত্র ১৩ বছর। শারমিন দেখতে খুবই সুন্দরী ও মেধাবী প্রকৃতির বটে। তারই সুবাদে ওই সময় একদিন বিদ্যালয়ে আসার সময় শারমিনকে পথরোধ করে তার ঘরে নিয়ে দুই বন্ধু মিলে জোরপূর্বক গণধর্ষণ করে লম্পট ও বখাটে সোয়েম ভুঁইয়া। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় ৮নং মালাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান একেএম আজাদ ভূঁইয়া’র তত্বাবধানে কাবিন বিহীন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ৮ম শ্রেণীতে পড়–য়া শারমিন আক্তারের সাথে সোয়েমের সামাজিক ভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে ধর্ষণের ঘটনা মিমাংসা করে।
স্থানীয় লোকজন জানায়, বিয়ের ৩/৪ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর কারণে অকারণে সায়েম শারমিনের প্রতি শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন করতে থাকে। এভাবে প্রায় ৮/৯ মাস সংসার করার পর সোয়েম তার স্ত্রী শারমিনকে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে পরিকল্পিত ভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে সোয়েম নিজে তার স্ত্রীর কিডনিতে ইনজেকশন দিলে শারমিন সজোরে কান্নাকাটি করে এক পর্যায়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। এ নিয়ে সামাজিক ভাবে সালিশ দরবার বসে। শারমিনের পরিবারের লোকজন জানায়, স্বামীর নির্যাতনের কারণে ব্রাহ্মণপাড়া থানায় অভিযোগ করে মেয়ের পক্ষ। কিন্তু উপরের মহলের তদবীরের কারণে থানা প্রশাসন অভিযোগ গ্রহণ করলেও মামলা এফআইআর করতে রাজি হয়নি। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান একেএম আজাদ ভুঁইয়ার উপস্থিতিতে শারমিনকে চিকিৎসা খরচ বাবত ৭০ হাজার টাকা দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করা হয়।
এদিকে শারমিনের বিয়ের জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে পাত্র এলে বখাটে সোয়েম বাঁধার সৃষ্টি করে এবং শারমিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে বেড়ায়। শারমিনের পরিবারের লোকজন আরো জানায়, গত ৬ জুলাই সোমবার রাত ৮টার পর থেকে শারমিন তার নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। শারমিনের পিতা আব্দুল মান্নান সরকার ও তার পরিবারের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে স্থানীয় মেম্বার জামাল হোসেন সরকার ও ইউপি চেয়ারম্যান একেএম আজাদ ভুঁইয়াকে বিষয়টি অবগত করলে তাৎক্ষণিক চেয়ারম্যান শারমিনের বাবা আব্দুল মান্নান সরকারকে বলেন, গত ৩/৪ দিন থেকে বাহারম মিয়ার ছেলে সোয়েম ও তার বন্ধু হৃদয়কেও পাওয়া যাচ্ছেনা তারা আমাকে জানিয়েছে।
শারমিনের পরিবারের লোকজন আরো জানায়, গত শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেল ৩টায় হঠাৎ করে শারমিন তার বড় ভাইয়ের দেবপুরের বাসায় উঠে। এর কিছুক্ষণ পর অপর প্রান্ত থেকে একটি ফোন আসে। শারমিনের কাছে জানতে চাইলে সে তার ভাইকে বলে যে, সোয়েম শারমিনের জন্য অপেক্ষা করছে রাস্তায়। সে সোয়েমের সাথে কুমিল্লা শহরে যাবে। এ কথা বলে বিলম্ব না করে শারমিন তার বড় ভাইয়ে দেবপুরস্থ বাসা থেকে কিছুক্ষণ অবস্থান করে বের হয়ে যায়।
স্থানীয় জামাল সরকার মেম্বার ও স্থানীয়রা জানায় ওই দিন শুক্রবার বিকেলে চন্ডিপুর ও আশপাশের এলাকায় মোটর সাইকেল নিয়ে বোরকা পড়ে শারমিন ও সোয়েমকে ঘুরতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে ওই রাতের কোন এক সময় সোয়েম তার সাবেক স্ত্রী শারমিনকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে কাঠাল গাছের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার অপবাদ তুলে দেয় বলে দাবী শারমিনের পরিবার ও এলাকাবাসীর।
১১ জুলাই শনিবার ভোরে পশ্চিম চন্ডিপুর সোয়েম ভুঁইয়ার বাড়ির তার নিজ ঘরের পাশেই একটি কাঠাল গাছের ডালায় শারমিনের ওড়না এবং গাছের নীচে শারমিনের লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি আজম উদ্দিন মাহমুদ, দেবিদ্বার সার্কেল অফিসার আমিরুল ইসলাম সহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে লাশের সুরত হাল রিপোর্ট করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে পাঠায়।
স্থানীয় লোকজন আরো জানায়, সোয়েম ভুঁইয়া ইতিপূর্বে আরো দুইটি বিয়ে করে এবং সে ওই দুই স্ত্রীকে একইভাবে নির্যাতনে পর সুকৌশলে হত্যা করে।
শারমিনের বাবা আব্দুল মান্নান সরকার বলেন, গত ৬ জুলাই সোয়েম আমার মেয়ে শারমিনকে সন্ধ্যার পরে আমার বাড়ি থেকে সবার অজান্তে কৌশলে ভাগিয়ে নিয়ে আত্মগোপন করে এবং গত ১০ জুলাই শুক্রবার রাতে আমার মেয়েকে হত্যা করে তাদের ঘরের পাশে কাঠাল গাছের নীচে লাশ ফেলে রাখে। শনিবার সকালে এলাকার লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার মেয়ে শারমিনের মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখে। তখন তার কানে রক্ত ঝরার দাগ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। সোয়েম আমার মেয়েকে অমানষিক নির্যাতন করে হত্যা করে। আমি এর উপযুক্ত বিচার চাই। সে এভাবে আগের দুই স্ত্রীকেও কৌশলে নির্যাতন ও শরীরে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করেছে। এছাড়াও সোয়েম এলাকায় আরো বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। এসমস্থ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হলেও সোয়েমের কোন প্রকার সাজা হয়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান একেএম আজাদ ভুঁইয়ার নিকট থেকে জানতে চাইলে তিনি মুঠো ফোনে জানান- আমি ঘটনার দিন কুমিল্লা শহরে ছিলাম। শনিবার সকালে ঘটনা বিষয়ে জামাল হোসেন সরকার মেম্বার প্রথমে আমাকে ফোনে জানান রিকশা চালক আব্দুল মান্নান সরকারের মেয়ে শারমিন আত্মহত্যা করেছে। কাঠাল গাছের সাথে ওড়না পেছানো লাশ গাছের নীচে। সাথে সাথে আমি গ্রাম চৌকিদার পাঠাই এবং বিপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জকে অবগত করলে তিনি এবং দেবিদ্বার সার্কেল ঘটনারস্থলে পরিদর্শনে আসেন। আমিও তখন তাদের সাথে ঘটনাস্থলে যাই। যদি এটি কোন পরিকল্পিত হত্যাকা- হয়ে থাকে তাহলে আমিও এর সুষ্ঠ তদন্তপূর্বক জড়িত ব্যক্তির বিচার দাবি করি। এ নিয়ে কেউ যেন ঘোলা পানিতে মাছ স্বীকার না করার সুযোগ না পায় সেটাও নজরে রাখতে হবে বলেন।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ আজম উদ্দিন মাহমুদ জানান, ১০ জুলাই খবর পেয়ে পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। লাশ উদ্ধার করে কুমেক হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করি। এ বিষয়ে থানায় শনিবার একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রাপ্তির পর বলা যাবে হত্যা না অন্য কিছু। পরবর্তীতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার পরেও এ ঘটনায় পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।