শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০


সন্তানকেও সত্য বলতে পারিনি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.07.2020

নাসির উদ্দিন।।

ঔচিত্যবোধ নিয়ে আমি অসহায় এবং বিব্রত। যদিও তাতে কারো কিছু যায় আসেনা। কিন্তু সন্তানকে সত্য বলতে না পারার অপরাধের দায় তো আমাকেই নিতে হচ্ছে। অথচ অপরাধের এই দায় আমার নয়, রাষ্ট্রের। সন্তানকে সত্য বললে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতে পারে। আর সত্য না বললে সন্তানকে শঠতা নিচুতা মিথ্যা আর প্রতারণা শিক্ষা দেয়া হবে। আমার কি করা উচিত?

সন্তানের প্রশ্ন নুরুল ইসলাম বাবুল কি লতিফুর রহমানের চেয়ে অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন? কি জবাব দেবো ভাবতে গিয়ে, তাকে জিজ্ঞেস করি, কেন এই প্রশ্ন? সে বললো নুরুল ইসলাম বাবুল মারা যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি শোক জানিয়েছেন। কিন্তু লতিফুর রহমানের বেলায় তো জানাননি। এছাড়া নুরুল ইসলাম বাবুলের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মন্ত্রী এমপি প্রায় সকল রাজনৈতিক দল শোক জানিয়েছে। আর লতিফুর রহমানের বেলায় কয়েকজন মন্ত্রী ও কিছু সংগঠন শোক জানিয়েছে। আমি তাকে বললাম, রাষ্ট্রপতি শোক জানালেই কি একজন অপরজন থেকে বড় ছোট হয়ে যায়? সে দৃঢ়তার সাথে বললো নিশ্চয়ই। রাষ্ট্রপতি কি যারতার উদ্দেশ্যে শোক জানাবেন? এরপর তার প্রশ্ন এই দুজন এতো বড় ব্যবসায়ী হলেন কি করে? তাদের সম্পর্কে তুমি কি সবকিছু জান? তাদের কি অনেক টাকা? লতিফুর রহমান গ্রামে থাকতেন কেন?

সন্তানের এতো প্রশ্নের জবাব কি করে দেই? এছাড়া অনেক সত্য আছে যা বলা অনুচিত। দ্বিধা নিয়েই তাকে বললাম অবশ্যই জানি। কিন্তু এতে তোমার বিশ্বাসের সাথে সংঘাত হবে। তুমি উল্টো আমাকেই ভুল বুঝতে পারো। তবুও সে শুনবেই। অগত্যা তাকে বললাম, আমি কি পিতা হিসেবে বলবো না সমাজের দৃষ্টিতে বলবো?

সে পিতার কাছ থেকেই শুনবে। বললাম মানুষ হিসেবে আমার দৃষ্টিতে দুজনই ছিলেন অত্যন্ত সাহসি। দুজনেই ছিলেন দেশের সবচেয়ে বড়ো উদ্যোক্তা। এ দুজনের বড়ো সততা হচ্ছে এরা কেউ দেশ থেকে অর্থ পাচার করেন নি। এজন্য দুজনকেই স্যালুট। প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিক থেকে নুরুল ইসলাম বাবুল অবশ্যই এগিয়ে থাকবেন। তবে সাহসের সাথে সৌন্দর্য এবং বিশ্বস্ততার মিশ্রণ বেশী ছিল লতিফুর রহমানের। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল প্রচারবিমুখ এবং গভীর মননের অধিকারী ছিলেন। ব্যাংক ঋণের দিক থেকেও লতিফুর রহমানের রয়েছে পরিচ্ছন্ন ইমেজ। তাঁর ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ হাজার থেকে ১২ শ কোটি টাকার মধ্যে। আর যমুনা গ্রুপের ব্যংক ঋণ ২০ থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকায় উঠানামা করে।

তাকে বললাম লতিফুর রহমান পারিবারিক ভাবেই বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর ৭২ সালে সরকারের সিদ্ধান্তে তাদের সকল সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত হয়ে যায়। এরপর আবার শূন্য অবস্থা থেকে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করে ধীরে ধীরে তিনি এ পর্যায়ে এসেছেন। আর নুরুল ইসলাম বাবুল ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অভাব অনটনের কারণে পড়াশোনা হয়নি। যৌবনে টানাপোড়েনের সময় কিছু অসামাজিক অভিযোগ নিয়ে তাকে এলাকা থেকে ঢাকায় চলে আসতে হয়। এরপর ঢাকার সদরঘাটে এসে থিতু হয়েছিলেন জীবনযুদ্ধে। এখানেও অনেক অভিযোগ তার পিছু লেগে ছিলো। এখানেই একটি টং দোকানে ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে জীবন শুরু করেন। সেই থেকে ক্রমান্বয়ে তিনি সিড়ি ভেঙ্গেছেন। ব্যবসায়ী হিসেবে তার বিরুদ্ধে জমি দখল, প্রভাব খাটানো, সরকার প্রধান, মন্ত্রী, এমপি এবং উর্ধতন কর্মকর্তাদেরও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা ছিলো তার স্বভাব। ব্যাংক কর্মকর্তারা তার ভয়ে তটস্থ থাকতেন। যেমনটি হয় শিকদার এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বেলায়ও।
আমার এসব শুনে সে বলে তাহলে তো লতিফুর রহমানই ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি কেন তাঁকে শোক জানাননি? আর নুরুল ইসলাম বাবুলকে কেন জানালেন? এটাতো সুবিচার হলোনা। আমি অসহায় হয়ে বললাম এই প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। সম্ভবত রাষ্ট্র এর জবাব ভালো দিতে পারবে।

লতিফুর রহমানের গ্রামে থাকা প্রসঙ্গে বললাম, তাঁর চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি দূষণমুক্ত পরিবেশে থাকার জন্যই গ্রামে থাকতেন। জটিল এজমা রোগ ছিলো তাঁর। নিজের প্রতিষ্ঠান এসকেএফ এর চিকিৎসকদের অধীনেই তিনি চিকিৎসা নিতেন। ঢাকায় থাকলে তাঁর এজমার প্রবণতা প্রচন্ড বেড়ে যেত। চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি গ্রামে বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নেন ২০১০ সালে। এরপর ১৬ কক্ষ বিশিষ্ট এই ডুপ্লেক্স বাড়িটি নির্মাণ করেন। এরপর গত ৬ বছর আগে থেকে এই বাড়িতে মাঝেমধ্যে গিয়ে দুই-একদিন করে থাকা শুরু করেন। গত আগস্ট ২০১৯ থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত একটানা ১১ মাস তিনি সপরিবার গ্রামেই বসবাস করেছেন। তবে গত জানুয়ারী মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহ এই ১৫ দিন তিনি সর্বশেষ ঢাকার বাসায় ছিলেন।
লেখক : সাবেক সহ সভাপতি,কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও সমাজ বিশ্লেষক । মোবাইল :০১৭১১-৩২৭৪৯৮ ।