বুধবার ৫ অগাস্ট ২০২০
  • প্রচ্ছদ » » “সময় এসেছে হুজুগে সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে মানসিকতা পরিবর্তনের”


“সময় এসেছে হুজুগে সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে মানসিকতা পরিবর্তনের”


আমাদের কুমিল্লা .কম :
17.07.2020

এম. এ. মাহবুব।।

‘হুজুগে বাঙালী’ আমাদের সমাজের প্রচলিত একটি কথা। জাতি হিসেবে আমরা এখনও যে “হুজুগে বাঙালী” রয়েছি তা প্রকাশ করা দোষের কিছু নয় বলে আমি মনে করি। যাচাই-বাছাই না করে কারো কথার স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে দেয়া অর্থেই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়। কোন বিষয় নিয়ে না জেনে মন্তব্য করা কতটুকু ন্যায়সঙ্গত তা একটু ভাবা উচিৎ।

বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে মাননীয় উপাচার্য মহোদয়গণ একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আসেন। প্রত্যেক উপাচার্য মহোদয়ের কিছু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে। উপাচার্য মহোদয়গণ নিয়োগপ্রাপ্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য। তবে উপাচার্য আমার/আমাদের পক্ষে কাজ করেন না বলে আমি/আমরা তাঁর দোষ খুঁজে বেড়াব, তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করব, ব্যাঙ্গাত্বক ভাষা ব্যবহার করব, সবসময় তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেব, কারণে অকারণে তার শুধু দোষ খুঁজে বেড়াবো, এটা কতটুকু সঠিক/নৈতিক তা ভেবে দেখার বিষয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, সুবিধা ভোগ করার পর শেষমেশ ব্যাটে বলে না মেলায় অনেকে উপাচার্য বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়ে যান। যে কারো পক্ষে সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু কাজ করা কঠিন। তাই অযথা কাদা ছোড়াছুড়ি না করে এরুপ হুজুগে দোষারোপ করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

উপাচার্য হলেন বিশ্ববিদ্যালয় তথা হাজারো শিক্ষার্থী,শিক্ষক ও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের অভিভাবক। তিনি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা সকলকে অবহিত করবেন। সর্বোচ্চ মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন কিনা সেটা নিশ্চিত করবেন। আন্তর্জাতিক মানের সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিনা সেদিকে লক্ষ‍্য রাখবেন। দেশ-বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। শিক্ষকগণের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহনের জন্য ফান্ড বরাদ্দের ব্যবস্থা করবেন। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে গবেষণার অনুদান নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে গবেষণাপত্রের মান ও সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। গবেষণায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করবেন। আর এর প্রতিটি কাজই আমাদের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর মেজর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বিএনসিসিও স্যার যথাযথভাবে করে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীগণের পক্ষ থেকে উৎসাহমূলক বাণী কাম্য। তবেই উপাচার্য মহোদয়ের পক্ষে এসব কাজ করা আরো সহজ হবে। বেরোবি’র ক্রান্তিলগ্নে ২০১৭ সালের ১৪ জুন বেরোবি’ র চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের গ্রেড-১ প্রফেসর ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেসনালস এর সাবেক উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মেজর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, বিএনসিসিও স্যার।

উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি বেরোবিকে গতানুগতিক ধারা থেকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বদলে যাচ্ছে ক্যাম্পাসের দৃশ্যপট। গতি এসেছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে। এর আগের দ্বিতীয় ও তৃতীয় উপাচার্যের আমলে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তলানিতে গিয়েছিল। আমাদের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর মেজর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, বিএনসিসিও স্যার দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার দক্ষ নেতৃত্বের কারণে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজে গতি এসেছে। তিনি তদবির, দলবাজি ও স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন। তাছাড়া আমাদের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর মেজর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, বিএনসিসিও স্যার চাকুরী বিজ্ঞপ্তিতে নতুন ধারা যুক্ত করেন যে, কোনো মৌখিক ও লিখিত তদবির নিষিদ্ধ। তাছাড়া পরবর্তীতে কোনপ্রকার তদবির ও আর্থিক লেনদেন প্রমাণিত হলে, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হবে, এ শর্তে আবেদনের নজীর তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, আগের উপাচার্য স্যারদের আমলে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার রেকর্ড আছে, শিক্ষকদের বেতন বন্ধ থাকার রেকর্ড আছে, পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ দেয়ার রেকর্ড আছে। বর্তমানে এর কোনটিই পরিলক্ষিত হয় নি। মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর মেজর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, বিএনসিসিও স্যার শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সেশনজটের লাগাম টেনে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। তিনি ই-ফাইল ট্র্যাকারের প্রচলন করেন। ফলে কোন ফাইল কোন শাখার কোন টেবিলে আটকে পড়ে আছে, তা ভার্চুয়ালি এক ক্লিকের মাধ্যমেই জানা যাচ্ছে। শিক্ষকদের পারিতোষিক হালনাগাদ প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন। টেন্ডারবাজি রুখে দিয়েছেন ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় করার লক্ষ্যে পুরো ক্যাম্পাসকে ওয়াইফাই সুবিধার আওতায় নিয়ে এসেছেন। ভার্চুয়াল ক্লাসরুমসহ প্রতিটি বিভাগে স্মার্টবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করেছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টায় প্রথম ক্যাম্পাস রেডিও স্থাপন করেছেন।

এই করোনাকালেও থেমে নেই শিক্ষকদের পদোন্নতি। থেমে নেই বিভিন্ন বিভাগের ক্লাস ও ল্যাব-এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কার্যক্রম। চলছে বাসস্ট্যান্ড ও ক্যাম্পাসের রাস্তা উন্নয়নের কার্যক্রম। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যলয়ের পক্ষ থেকে এককালীন আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হলের সিট ভাড়া মওকুফের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ক্যাম্পাসে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তিনিই প্রথম আনসার বাহিনীর জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করেন। ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি শূণ্য করে দিয়েছেন। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য তিনিই প্রথম বুনিয়াদী প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেছেন। ২০১২ সালে ‘ড. ওয়াজেদ রিসার্চ এ্যান্ড ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট’ পরিচালনার জন্য একাডেমিক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এর সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান প্রশাসনের আমলে এটি আবার সচল হয়।

তিনি পিএইচডি, এমফিলসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করছেন। এতে দেশি-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাজকে এগিয়ে নিতে নিজস্ব জার্নাল প্রকাশনার ব্যবস্থা করেছেন। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন শৃঙ্খলার অনেকগুলো জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ক্যফেটেরিয়া পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের পরিবহন সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক নতুন বাস, মিনি বাস ও মাইক্রোবাস ক্রয় করেছেন। একাধিক নতুন রোডে বাস চালু করেছেন। সর্বশেষ ট্রিপ বিকেলের পরিবর্তে সন্ধ্যার পর করেছেন। তিনি বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠিত করেন উইমেন পিস ক্যাফে। তাছাড়া দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ স্যার এর অনুপ্রেরণায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথম বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল , বেরোবি, রংপুরে ‘সততা স্টোর’ এর সূচনা ঘটান যেখানে কোনো দোকানী ছাড়া মেয়েরা তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করে টাকা রেখে যেতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, শিক্ষা বিস্তারে এবং নান্দনিকতায় এই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক বিশ্বের সেরা সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতোই অন্যতম একটি। প্রতিষ্ঠার বারোতম বছরে এটিই প্রত্যাশা।

লেখক: সহকারী প্রক্টর ও সহকারী অধ্যাপক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।