শনিবার ৮ অগাস্ট ২০২০


লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার যত অনিয়ম


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.07.2020

নাসির উদ্দিন চৌধুরী,লাকসাম।।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা সাধারণ রোগীদের নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিকে সরিয়ে নেয়া, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বাণিজ্য, করোনা রোগী পরিবহন ভাড়ার নামে দুর্নীতি এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সময় না দিয়ে পাশর্^বর্তী বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ডা. আবদুল আলীর বিরুদ্ধে।
তারমধ্যে গত ১১ জুলাই লাকসাম আকবর সামছুন হাসপাতালে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল আলীকে দিয়ে একটি সিজার অপারেশন না করায় ক্ষিপ্ত তিনি ওই হাসপাতালে যান। ঘুমন্ত ডিউটি ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের অশালীন ভাষায় গালমন্দসহ মারধর করেন। শুধু তাই নয় হাসপাতালকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানির হুমকিও দিয়ে আসেন।
হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার মশিউর রহমান জানান, খুব ভোরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসপাতালে আসেন। আমি শুয়ে আছি। শুনছি নার্স এবং কর্মচারীদেরকে যেন গালমন্দ করছেন। পরে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে আমাকেও গালমন্দ করেন। উত্তেজিত হয়ে মারধরের পরিবেশ তৈরি করেন।
স্বাস্থ্য কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল আলীর ব্যক্তিগত একটি প্রাইভেট ক্লিনিক রয়েছে। যেটির নাম লাকসাম মেটারনিকি ক্লিনিক। কাগজপত্রে ওই ক্লিনিকের কোন লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই। নেই কোন ডিগ্রিধারী চিকিৎসক এবং নার্স। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মীদের ব্যবহার করে সেবা নিতে আসা রোগীদের সরিয়ে আনছেন নিজের ব্যক্তিগত ক্লিনিকে। প্রতিদিনই এভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কমপ্লেক্সে সেবা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও তার স্বজনরা। বিনাপয়সায় সেবা প্রত্যাশী রোগিরা জিম্মি হয়ে তার ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষা ও গুণগতমানের সেবা না পেয়ে রীতিমত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এতে করে লাকসামের সাধারণ জনগণ সরকারি স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি ভেঙ্গে পড়েছে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা।
জানা যায়, গেল বছরের (৩০ জুলাই) লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ডা. আবদুল আলী। আর আগে লাকসাম শহরের বাইপাসে পৌরসভা কর্তৃক ঘোষিত একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে লাকসাম মেটারনিটি ক্লিনিক নামে ওই প্রতিষ্ঠান চালু করেন তিনি। অন্য এক বেসরকারি ক্লিনিকের দুই ওয়ার্ডবয়কে নাম মাত্র চেয়ারম্যান ও এমডি দেখিয়ে ক্লিনিকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদনে নিজেকে ক্লিনিকের খন্ডকালীন গাইনি চিকিৎসক হিসেবে দেখালেও কর্তৃপক্ষের কোন অনুমতিপত্র জমা দেননি তিনি।
এছাড়াও আবেদনে ডা. আবু মো: হাসান, ডাক্তার নাজনিন অনন্যা ও ডাক্তার জেসমিন খাতুন নামে তিনজনের নাম উল্লেখ করলেও ওই ক্লিনিকে কারও উপস্থিতি কখনও পাওয়া যায়নি। ৬ জন ডিপ্লোমাধারী নার্সের নাম উল্লেখ করা হলেও একইভাবে তাদের কারও উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল আলীর আপন ভাগিনা কাইয়্যুম সৈকত ক্লিনিকের হিসাব শাখার মূল দায়িত্বে, আরেক ভাগিনা শাকিল মার্কেটিং কর্মকর্তা এবং বড় ভাই নজরুল ইসলাম ক্লিনিকের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার অনুসারী কর্মচারীদের দিয়ে মেটারনিটি ক্লিনিকে জরুরি অপারেশনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন। পাশাপাশি লাকসামের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর কর্মচারীদেরকে দিয়ে তার ক্লিনিকে পালাকরে কাজ করাচ্ছেন।
নাম না প্রকাশের স্বার্থে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন কর্মীর অভিযোগ, লাকসাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোন কর্মচারী তার ক্লিনিকে কাজ না করলে ডা. আবদুল আলী তাদের নানাভাবে হয়রানি করেন। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারীরা তার ক্লিনিকে না আসলে ওইসব ক্লিনিক ও হাসপাতালে পরিদর্শনের নামে হয়রানি করেন।
এছাড়া তিনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকেন না। বেশির ভাগ সময় তার মালিকানাধীন মেটারনিটি ক্লিনিকে অবস্থান করেন। তিনি লাকসামের পাশর্^বর্তী উপজেলা বরুড়া, চৌদ্দগ্রাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোটে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সিজার অপারেশন করতে ছুটে যান প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করে।
অপরদিকে করোনা আক্রান্তদের পরিবহনে বিভিন্ন ক্লিনিক থেকে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার নামে হাজার হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
গত ২ জুলাই মনোহরগঞ্জের দেবপুর থেকে দরিদ্র মমিনুল হকের স্ত্রী জেসমিন আক্তার লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি সমস্যা নিয়ে আসেন। জেসমিন আক্তার জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল আলীর শরনাপন্ন হলে তিনি তাকে লাকসাম মেটারনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর তিনি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ক্লিনিকে অপারেশনসহ চিকিৎসা নেন। চিকিৎসা শেষে তার কাছ থেকে প্রায় ২১ হাজার টাকা আদায় করেন ডা. আবদুল আলী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লাকসামের এক বেসরকারি হাসপাতালের মালিকের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল আলীর কাছে রোগীরা জিম্মি। প্রসূতিদের জোর পূর্বক সিজার অপারেশন করান। সিজার অপারেশন পাশাপাশি অজ্ঞান বিশেষজ্ঞ না হয়েও তিনি নিজেই অজ্ঞান ইনজেকশন পুশ করে থাকেন। এতে রোগী ধনী হোক গরীব হোক তাকে ৩ হাজার ৭ শত টাকা বিল পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আমরা কুমিল্লা কিংবা ঢাকা থেকে ভালো চিকিৎসক এনে এসব অপারেশন করালে তিনি ক্লিনিক ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে আবদুল আলী জানান, মেটারনিটি ক্লিনিকের মালিক আমি না। আমার কোন প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই। তাহলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগী আমি কোথায় সরবরাহ করবো। আমার বিরুদ্ধে করা সকল অভিযোগ পরিকল্পিত এবং ব্যক্তি স্বার্থে।
এবিষয়ে কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. মো. নিয়াতুজ্জামান জানান, ডা. আবদুল আলীর বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে।