বুধবার ৩০ †m‡Þ¤^i ২০২০


কুমিল্লা মহিলা কলেজে থেকেই প্রথম অনলাইন ক্লাস চালু হয়


আমাদের কুমিল্লা .কম :
21.08.2020

মাহফুজ নান্টু।।

চলতি বছর মার্চ থেকে করোনার সংক্রমণ ঘটে বাংলাদেশে। করোনায় বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে থেমে নেই পাঠদান। ২৩ এপ্রিল সরকার ঘোষণা করে অনলাইন ক্লাস নেয়ার। তবে তার আগে অর্থ্যাৎ ২২ এপ্রিল থেকেই অনলাইন ক্লাশ শুরু হয় কুমিল্লা মহিলা সরকারি কলেজে। শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। ১৩’শর অধিক ক্লাস নেয়া হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কলেজটিতে বন্ধ থাকা অবস্থাতেই পাঠদানসহ সামাজিক অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি চলছে অবকাঠামো উন্নয়ন। আর এসব কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর জামাল নাছের। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সেবা দিতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকেও সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভিডিও কনফারেন্সে সঠিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমন সব মহতি কাজে সর্বমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ।

কলেজসূত্রে জানা যায়, ১৭ মার্চ মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তবে করোনা শুরু হওয়ায় আড়ম্বরপূর্ণভাবে কার্যক্রম করা সম্ভব হয়নি। দেশে প্রথম করোনা সনাক্তের পরপরই কলেজের রসায়ন বিভাগ তৈরী করে ১ হাজারেরও বেশি হ্যান্ড সেনিটাইজার। যা বিতরণ হয় কলেজের শিক্ষার্থীসহ নিম্ন আয়ের মানুষজনের মাঝে।

সরকারি নির্দেশনায় কলেজ বন্ধ হয়ে গেলো। শুরু হয় টানা লকডাউন। ওই সময় মহিলা কলেজের ৪১ জন ঠিকা কর্মচারী আর দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়লেন। এ সময় প্রথমেই ৪১জন কর্মচারী (কাজের বিনিময়ে টাকা) ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার ২৪ জন দরিদ্র ছাত্রীর জন্য কলেজ তহবিল হতে দেড় লাখ টাকার নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। তারপর দূরদূরান্তের ছাত্রীদের সহায়তার জন্য শিক্ষকদের সহযোগিতায় একটি তহবিল গঠন করা হয়। তহবিলে জমা হয় দু’লাখ টাকা। কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি জনাব আবদুল খালেকও এ আহবানে সাড়া দিয়ে তহবিলে অর্থ সাহায্য প্রদান করেন।

এবার শুরু হলো প্রচারণা। কলেজ ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে পেইজে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। ছাত্রীদের আহবান জানানো হয়। যারা সমস্যাগ্রস্থ আছে তারা যেনো যোগাযোগ করেন। সেই তহবিল থেকে বিকাশের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১১৩ জন ছাত্রীকে ১৫ শত থেকে ২হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। সংকটকালীন এ সহযোগিতা অব্যহত থাকবে।

দীর্ঘ ছুটিতে শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ। ছাত্রীদের পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে। জুম এ্যাপ এর মাধ্যমে অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষকরা মিলে অন্তত ১৩শ টি ক্লাশ নেন অনলাইনে। এসব ক্লাশ লাইভ ও ভিডিও ক্লাশ আপলোড হয়েছে কলেজের ১টি অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল, ১টি ফেসবুক পেইজ, ২টি ফেসবুক গ্রুপ এবং শিক্ষকদের একাধিক ইউটিউব চ্যানেলে।

এছাড়া একাদশ শ্রেণীর ছাত্রীদের সাপ্তাহিক বাড়ির কাজও দেয়া হয়। একই পদ্ধতিতে এবং কলেজের ২টি ওয়েবসাইটে। প্রতি ৩০জন ছাত্রীর জন্য ১জন গ্রুপ শিক্ষক রয়েছেন। সাপ্তাহিক বাড়ির কাজটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তদারকি করেন গ্রুপের শিক্ষকরা।

শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এসব কাজ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তত্বাবধান করেন অধ্যক্ষ প্রফেসর জামাল নাছের। ফেসবুক গ্রুপে কখন কোন ক্লাশ লাইভ হবে, কোন ক্লাশের ভিডিও লেকচার কবে আপলোড হবে তিনি নিজে গ্রুপে এর নোটিশ দেন শিক্ষাথীদের উদ্দেশ্যে।

অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রি পাস ছাত্রীদের পাঠ নির্দেশনা প্রদানের জন্য তাঁর নির্দেশে ১৩টি বিভাগ আলাদা আলাদা ফেইসবুক পেইজ খুলে নিয়মিত নির্দেশনা ও এসাইনমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও মহিলা কলেজের সব শিক্ষক অনলাইন পাঠদান ও নির্দেশনা প্রদানে প্রতিদিনই ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এখন কলেজটিতে কলেজ ডেভেলপমেন্টের আওতায় চার কোটি টাকার কার্যক্রম চলমান। এর মধ্যে রয়েছে একটি দশতলা হোস্টেলের কাজ। এছাড়াও কলেজের অভ্যন্তরে উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ করা হয়।

কথা হয় কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জামাল নাছেরের সাথে। তিনি জানান, কুমিল্লা সদর আসনের সাংসদ বীরমুক্তিযোদ্ধা আ.ক.ম বাহাউদ্দিন বাহারের উৎসাহে তিনি এমন সব মহতি কাজ করছেন। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই সাংসদ হাজী আ.ক.ম বাহাউদ্দিন তার নেতাকর্মীদের সাথে ভিডিও কলে সব দিক নির্দেশনা দিতেন। মাঠে নেমে সবার ঘরে ঘরে খাবার পৌছে দিয়েছেন। আমাদের সাথেও সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রেখেছেন। আমাদেরকেও নির্দেশনা দিচ্ছেন। তার কর্মকান্ড আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। আমি আমার কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ শুরু করি। এভাবেই চলছে কলোনাকালীন কুমিল্লা সরকারী মহিলা কলেজের নানামূখী কার্যক্রম।

প্রফেসর জামাল নাছের ২বছর আগে কলেজটিতে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। তারপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির মান উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতি মনোযোগী হন। তিনি তাঁর দপ্তরটিতে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু থেকে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কলংকজনক হত্যাকান্ডের ধারাবাহিক তৈলচিত্র স্থাপন করেন। ইতিহাসের এমন ধারাবাহিক উপস্থাপন শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সর্বমহলে বেশ প্রসংশিত হয়েছে।

অধ্যক্ষ জামাল নাছের বলেন, দপ্তরে বসে শ্রেণী কার্যক্রম মনিটর করার জন্য প্রতিটি কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা এবং অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। ছাত্রী শিক্ষক কর্মচারী সকলের জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরা ও মোবাইল ম্যাসেজিং পদ্ধতি। এছাড়া ডিজিটাল ক্লাশ পদ্ধতি সহ পাঠদানের আধুনিক নানান কার্যক্রম।

করোনাকালীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য প্রফেসর জামাল নাছের বলেন, শিক্ষার্থীরা তোমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে। পাশাপাশি লেখাপড়াতেও মনোযোগী থাকবে। যখন করোনা সংক্রমন শেষ হবে আমরা তোমাদের ডাকবো। তোমারা কলেজে আসবে। লেখাপড়া সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে শ্রেণী ও গ্রুপ শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। নিশ্চয়ই আমরা সফল হবো।