বুধবার ৩০ †m‡Þ¤^i ২০২০


করোনায় গভীর সংকটে কুমিল্লার স্টিল শিল্প


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.09.2020

 

স্টাফ রিপোর্টার।।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহত্তর স্টিল শিল্পের প্রতিষ্ঠান পিইবি স্টিল অ্যালায়েন্স লিমিটেড। বিদেশ থেকে র-মেটেরিয়ালস আমদানির পাশাপাশি নিজেদের তৈরি স্টিলের পণ্য বিদেশেও রপ্তানি করে তারা। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি। চলেছে গণহারে শ্রমিক ছাঁটাই। এদিকে কুমিল্লা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের বিসিক শিল্প এলাকায় করোনার পূর্বে ছয়টি স্টিল মিল চালু থাকলেও বর্তমানে চালু আছে তিনটি মিল। আবার চালু থাকা তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সবমিলিয়ে গভীর সংকটের মুখে পড়েছে কুমিল্লার স্টিল শিল্প।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিইবি স্টিল অ্যালায়েন্স লিমিটেডে করোনা মহামারী কুরুর হওয়ার পূর্বে প্রায় ৮০০ লোকবল ছিল। কিন্তু মার্চে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানে তিন দফায় ৬৭, ১০৫ ও ৪০ জন করে মোট ২১২জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় ওভার টাইম। বাৎসরিক বোনাস, বৈশাখী ভাতা ও দুই ঈদের বোনাস মিলিয়ে বছরে চারবার বোনাস দেওয়া হতো। করোনার অজুহাতে বাৎসরিক ও বৈশাখী ভাতা বাদ দিয়ে তা দুইবার করা হয়েছে। জানা যায়, কুমিল্লার একমাত্র স্টিল শিল্পের প্রতিষ্ঠান পিইবি স্টিল অ্যালায়েন্স লিমিটেড বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে থাকে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে দেশের পাওয়ার প্লান্ট, সেনাবাহিনীদের -এরপর ৩ এর পাতায়
জন্য তৈরি কটেজ, পাইপ, অ্যাঙ্গেল বার, বড় বড় গার্মেন্টস তৈরির মালামাল সরবরাহ করা হয় । হাউজ কন্সট্রাকশনের যাবতীয় মালামাল, গাড়ির পার্টস ও স্টিলের তৈরি ঢেউটিন রপ্তানি করে এ প্রতিষ্ঠান। পণ্য তৈরির প্লেট ও র-মেটেরিয়ালস আমদানি করে চীন ও জাপান থেকে। করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর গত পাঁচ মাসে বিদেশ থেকে একটি অর্ডারও আসেনি। সম্প্রতি মালিকানা নিয়ে দু’পক্ষের দ্ব›েদ্বর সৃষ্টি হয়, দেশেও অর্ডার কমতে থাকে। ফলে তিন দফায় শ্রমিক ছাঁটাই করে প্রতিষ্ঠানটি। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, আরও এক দফা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের চিন্তা করছে মালিক পক্ষ।
পিইবি স্টিলে কর্মরত দুইজন ব্যক্তি নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, বর্তমান প্রশাসন মোটেও কর্মিবান্ধব নয়। করোনার পূর্বে ব্যাপক লাভ করলেও করোনার অজুহাতে তারা শ্রমিক ছাঁটাই করছে। যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা (প্রশাসন) শহীদ উদ্দিন আহমেদ জানান, ‘এখানকার অভ্যন্তরীণ কর্মকাÐের বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আমি নিজেও এখানে চাকরি করি।’
কুমিল্লা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বর্তমানে শাহজাহান স্টিল, স্বপ্না স্টিল ও বিলাসী স্টিল মিল চালু আছে। করোনা সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান। মাঝারি ধরনের এ ছয়টি প্রতিষ্ঠানে টেবিল, চেয়ার, সোফা, আলমিরা, ড্রয়ার, ওয়ারড্রোভ, ড্রেসিং টেবিল, খাট, স্যুটকেস, ক্যাশ টেবিলসহ যাবতীয় ফার্নিচার তৈরি করা হতো। সরবরাহ করা হতো অফিস, বাড়ি, হাসপাতাল ও বড় ইন্ড্রাস্টিগুলোতে। করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর ইন্ড্রাস্টিগুলো অর্ডার বন্ধ করে দেয়। হাসপাতাল, অফিস ও বাসাবাড়িতে অর্ডার কমতে থাকে। বন্ধ হয়ে যায় ব্যাংক লোনও। টানা লোকসানের মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় তিনটি মিল। আর চালু থাকা একটি মিলে ১০জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। সবমিলিয়ে কুমিল্লা বিসিকের স্টিল মিলগুলোতে কর্মরত ১৯০জনের মধ্যে ১০০জন কর্মহীন হয়ে পড়ে।
কুমিল্লা বিসিকে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লায় স্টিল শিল্পের কোনো অ্যাসোসিয়েশন নেই। তাই নিয়মতান্ত্রিকতায় চলছে না এসব প্রতিষ্ঠান। দক্ষ শ্রমিক তৈরির কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ না করায় অনেকে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। আবার কম বেতন ও অধিক পরিশ্রমের কাজ হওয়ায় কাজ ছেড়ে দিয়ে সহজ পেশা বেছে নিচ্ছেন কেউ কেউ। রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে শিল্প মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে নতুন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেই বিসিক কর্তৃপক্ষের। করোনার সময়ে র-মেটেরিয়ালসের দামও বেড়ে যায় বহুলাংশে। এতে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। শাহাজাহান স্টিল মিলের ম্যানেজার শাহ আদনান সোহান জানান, ‘সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও সিন্ডিকেটের কারণে আমরা মার খেয়েছি। ধীরে ধীরে লোকবলও কমতে শুরু করে। সর্বশেষ করোনার সময়ে আমাদের লোকবলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫জনে।’
স্বপ্না স্টিল মিলের স্বত্বাধিকারী মো. মুজিবুর রহমান জানান, ‘বিসিক কর্তৃপক্ষের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দক্ষ শ্রমিক থাকলে কুমিল্লার মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ জেলায় বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালামাল সরবরাহ করা সম্ভব।’
বিলাসী স্টিলের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন বলেন,‘ দক্ষ শ্রমিকের সংকট, ব্যাংকগুলোর ঋণ দিতে না চাওয়া ও বিসিক কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার অভাবে ডুবতে বসেছে কুমিল্লার স্টিল শিল্প।’
বন্ধ হয়ে যাওয়া রূপসী স্টিল মিলের স্বত্বাধিকারী হুমায়ূন কবির জানান,‘ ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করতে পারার কারণে নয়; মূলত স্টিলের পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়া, করোনার কারণে ব্যাপকহারে অর্ডার কমে যাওয়া ও শ্রমিক না পাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হয়েছে।’
সাফা স্টিল প্রোডাক্টের স্বত্বাধিকারী ইমতিয়াজ আহমেদ জানান,‘ ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে মিল বন্ধ রেখেছি। সহসা আমরা উৎপাদনে যাব।’
জানতে চাইলে কুমিল্লার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উপ-মহাব্যবস্থাপক হাসান আসিফ চৌধুরী জানান, ‘আমাদের আন্তরিকতার কোনও ঘাটতি নেই। ওদের দক্ষ শ্রমিকের অভাব আছে। অনেকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারে না ঠিকঠাক মতো। তাই দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা শিল্প মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ করে এ বিষয়ে করণীয় কী, তা নির্ধারণ করব।’
উল্লেখ্য, কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের সূত্রমতে কুমিল্লায় ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্টিল মিলের সংখ্যা ৪৯৯টি। স্থানীয় সূত্রমতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার স্টিলের ফার্নিচারের দোকান আছে কুমিল্লা জেলায়।