বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » হাজারেরও বেশি ছাত্রলীগ কর্মী তৈরি করেছি শুধু ব্যাডমিন্টন মাঠ থেকে


হাজারেরও বেশি ছাত্রলীগ কর্মী তৈরি করেছি শুধু ব্যাডমিন্টন মাঠ থেকে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.10.2020

নতুন প্লেয়ার তৈরির জন্য স্কুল পর্যায়ে ব্যাডমিন্টন ক্যাম্প করবো

কুমিল্লা নগরীর কৃতীসন্তান কবিরুল ইসলাম শিকদার। একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন। স্কুল জীবন থেকে ফুটবল ও ক্রিকেটের সাথে কাটিয়েছেন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে। অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু খেতাব। রাজনীতির মাঠেও নিয়মিত আছেন সেই আশির দশক থেকে। তার শিক্ষা, রাজনীতি, খেলাধুলা ও ব্যবসা নিয়ে কথা বলেছেন দৈনিক আমাদের কুমিল্লার সাথে। সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন দৈনিক আমাদের কুমিল্লার স্টাফ রিপোর্টার আবু সুফিয়ান রাসেল।

আমাদের কুমিল্লা: আপনি ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। শুরুতেই অভিনন্দন। কেমন আছেন?
কবিরুল ইসলাম শিকদার: আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে আমি সব সময় ভালো থাকি। ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের দায়িত্ব পেয়েছি, এটি কুমিল্লাবাসী তথা দেশের সকল ব্যাডমিন্টন প্রেমী বন্ধুদের উৎসর্গ করতে চাই। সবার দোয়া, আল্লাহর দয়া ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যদি কৃপাদৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকে বিশ্বের বুকে ব্যাডমিন্টনের মাধ্যমে লাল-সবুজের পতাকা উড্ডীন করতে পারবো।

আমাদের কুমিল্লা: অন্য খেলায় না গিয়ে ব্যাডমিন্টনকে জীবনের সাথে জড়লেন কেন?
কবিরুল ইসলাম শিকদার: প্রাইমারি স্কুল থেকেই খেলাধুলা করি। স্কুল জীবনে ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন সব খেলাই খেলেছি। তবে সত্যি বলতে ক্রিকেটে আমি তেমন ভালো না, খেলেছি তেমন কোন স্বীকৃতি নেই। সব থেকে ভালো লাগতো ফুটবল। ১৯৮৪ সালে মোগলটুলি হাইস্কুল আমার নেতৃত্বে জেলা চ্যাম্বিয়ন হয়েছে। একই সাথে ব্যাডমিন্টনেও ভালো করতে লাগলাম। সে সময় আমাদের পেশাদার ব্যাডমিন্টন কোচ ছিলেন মুজিবুর রহমান। আমরা একনামে মুজিব ভাই বলে ডাকতাম। মুজিব ভাই আমাকে একদিন বললেন, কবির তুমি ব্যাডমিন্টনে ভালো করবে। এটা নিয়মিত করো। একজনের পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। ব্যাডমিন্টন খেলো এটাতেই সারাদেশের মানুষ তোমাকে চিনবে। সে থেকে ব্যাডমিন্টনকে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আজও আছি, থাকবো যতদিন বাঁচি।

আমাদের কুমিল্লা: আপনার শৈশবে, ভরা যৌবনে কুমিল্লার ব্যাডমিন্টন অঙ্গনকে কেমন দেখেছেন।

কবিরুল ইসলাম শিকদার: এটা এক কথায় খুবই চাঙ্গা। রমরমা বা রঙ্গমঞ্চ বললেও ভুল হবে না। কলেজ লাইফে তো নিয়মিত খেলেছি। ঢাকা, খুলনা,রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বহু জায়জায় টিমের সাথে খেলেছি। আমাকে হায়ার করে তারা নিতো। কলেজ থেকেই খেপ খেলা শুরু। প্রতি খেলায় সে সময় দুই হাজার, পাঁচ হাজার টাকা করে পেতাম। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে ৩০-৫০ হাজার টাকা আমার একাউন্টে থাকতো। সে টাকা দিয়েই আমি ব্যবসা শুরু করি। ব্যবসার জন্য ঘর থেকে টাকা নিতে হয়নি।

আমাদের কুমিল্লা: তাহলে আপনাদের সময় ব্যাডমিন্টন কী এ অঞ্চলে সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কোন রূপ ছিলো?

কবিরুল ইসলাম শিকদার: ১৯৯০ সালের কথা। তখন আমরা নেশা-পেশা ব্যাডমিন্টন। বিভিন্ন জেলায় উপজেলায় খেপ খেলি। চিন্তা করলাম একটা সংগঠন দরকার। কুমিল্লা ব্যাডমিন্টন কল্যাণ সমিতি নামে ৯০ সালে একটা সংগঠন করলাম। রুবেল হোসেন নামে আমার একটা ছোট ভাইকে সাধারণ সম্পাদক, আমি সভাপতি । এভাবে কাজ করতে লাগলাম। ভালই আলোড়ন করেছি শহরটাকে। ৭০ জন ছেলে, প্রায় ৬০ জন মেয়ে প্রতি শুক্রবার নিয়মিত ব্যাডমিন্টন চর্চা করতো। রাতে আমরা বড়রা খেলতাম। এমপি সীমা (আঞ্জুম সুলতানা সীমা) তখন ব্যাডমিন্টন কল্যাণ সমিতির সদস্য ছিলো। তখন ছাত্রলীগও নিয়মিত করতাম। মাঠের তরুণ কর্মী, হাজার হাজার ছেলেকে নিয়ে এ শহরে মিছিল করেছি। আবার খেলাধুলাও করেছি। সেটা ছিলো খেলার সোনালী সময়।

আমাদের কুমিল্লা: ব্যাডমিন্টন থেকে আপনার বড় আর্জন কী?

কবিরুল ইসলাম শিকদার: আর্জন তো অনেক। এ মুহূর্তে সব মনেও নেই। আমরা নিকট সব চেয়ে বড় অর্জন হলো শুধু ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে গত ৪০ বছরে হাজারেরও বেশি ছাত্রলীগ কর্মী তৈরি করেছি। তাদের দিয়ে পার্টির মিছিল করিয়েছি। তারা আমার সাথে ঘুরতো, বিভিন্ন স্থানে খেলায় যেতো। আথবা যে ছেলেটাকে ভালো লাগতো, বলতাম তুই ছাত্রলীগ কর। সাথেসাথে যোগ দিয়েছে। তাকে মিছিলে নিয়ে যেতাম।

আমাদের কুমিল্লা: এটা কী করে সম্ভব? ক্রীড়ার মাঠ আর রাজনীতির মাঠ তো এক নয়।
কবিরুল ইসলাম শিকদার: আপনি তো আমার অতীত স্মরণ করিয়ে দিলেন। যখন কোথায়ও খেলতে যেতাম। ভালো খেলতাম, ছেলেরা কাছে এসে ভিড় করে থাকতো। টেলিফোন নম্বর নিতো। বাসার ঠিকানা নিতো। কাউকে র‌্যাকেট, কাউকে শাটল গিফট করতাম। তারা আমাকে মন থেকে খুব ভালোবাসত। দুই পকেটে টাকা থাকত। খেলতাম, আয় করতাম, ছেলেদের খাওয়াতাম। প্রচুর খাওয়াতাম। আমি দেখছি, মানুষকে খাওয়ালে আল্লাহ পাক কমায় না, আরও বাড়ায়। তারা মুগ্ধ হয়ে বলতো ভাই, আপনার সাথে আছি।
আমাদের কুমিল্লা: ব্যাডমিন্টন থেকে আপনার কৃতিত্ব ও সাফল্যের কথা জানতে চাই।
কবিরুল ইসলাম শিকদার: ৭৯-৮০ থেকে তো নিয়মিত খেলি। ১৯৮২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ২২ বছরে মোট ১৮ বার জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি । ১৯৮৭ সালে সেকেন্ডারি ওয়ার্ড লিগে ফার্স্ট হয়েছি। জাতীয় দলে খেলেছি পাঁচবার। তা হলো ১৯৮৫, ৮৭, ৮৯, ৯০ ও ২০০২ সালে। ২০১৭ সালে ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ড কাপ সেমি ফাইনালে বয়স ৪০ ঊর্ধ্বে দলে সেমি ফাইনাল খেলেছি। ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে রানার আপ হয়েছি।

আমাদের কুমিল্লা: বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাথে পথচলার ধারাবাহিকতা বলুন।

কবিরুল ইসলাম শিকদার: বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন তো ১৯৭২ সাল থেকেই যাত্রা শুরু। যেহেতু মাঠের খেলোয়াড় আমাকে এ দেশের ব্যাডমিন্টন জগতে চিনে না, এমন মানুষ কম। সেই আশিক দশক থেকে আজও খেলছি। ২০১০ সলে বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের আহবায়ক কমিটির সদস্য হই। ২০১২ সালে নির্বাচিত সদস্য হিসাবে পদ মর্যাদা লাভ করি। ২০১৬ সালে যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। ২০২০ সালে এসে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই।

আমাদের কুমিল্লা: আপনার অর্জন, খ্যাতি নেপথ্যে যারা রয়েছেন তাদের নাম জানতে চাই।

কবিরুল ইসলাম শিকদার: আসলে গুরু ছাড়া কোন কিছুই সাধনা করা যায় না। আজকের কবির শিকদারকে তৈরির পেছনে অনেকে শ্রম দিয়েছেন আমি কোনদিনও তাদের ভুলবো না। তাদের ভালোবাসা আমি শোধ করতে পারবো না। মুজিব ভাইয়ের কথা তো বললাম শুরুতে। তিনিই অনুপ্রাণিত করেছেন ব্যাডমিন্টনের প্রতি। এছাড়াও পুরাতন চৌধুরী পাড়ার নিলুদা। তিনি পাকিস্তান আমলে রানার আপ ছিলেন। কান্দিরপাড় রামঘাট এলাকার তপন দা, মুন্সেফ বাড়ির মাহমুদুর রহমান মনি ভাই,যিনি বাংলাদেশে তিনবার চ্যাম্বিয়ন হয়েছেন। তারা আমার শিক্ষক ছিলেন। তারাই আমার নেপথ্যে কাজ করেছে।

আমাদের কুমিল্লা: খেলার মাঠে বা বাস্তব জীবনে যখন বিপদে পড়েন কী করেন?
কবিরুল ইসলাম শিকদার: শুধু আল্লাহকে ডাকি। আল্লাহ আজ পর্যন্ত বহু বড় বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। নিয়মিত নামাজ পড়ি। গত ৪০ বছরে আমরা খতম তারাবি মিস হয়েছে দুই দিন। ঘরে হাফেজ সাহেব রেখে পরিবারের সবাই নামাজ পড়ি। মহিলাদের জন্য পৃথক নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করেছি। ২০১৩ সালে পবিত্র হজ করেছি, এরপর থেকে কোন দিন নামাজ কাযা নাই। মিছিলে আছি, আযান হয়েছে, একপাশ দিয়ে কেটে মসজিদে চলে গেছি। লকডাউনে মসজিদে যাওয়া নিষেধ, ঘরে ইমাম রেখে নামাজ আদায় করেছি সবাই। আমাদের তো যৌথ পরিবার, এক সাথেই সবাই নামাজ পড়ি। আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। বিপদে আল্লাই রক্ষা করেন।

আমাদের কুমিল্লা: সুস্থ থাকার জন্য কী করেন?
কবিরুল ইসলাম শিকদার: নিয়মিত খেলাধুলা করি। নামাজ পড়ি। নিয়ম মেনে খাবার খাই। ভাত খুবই কম খাই। প্রচুর দেশি ফল খাই। কারণ দেশি ফলে বিষ নেই। আর এ টাকাটা আমার দেশের কৃষক পায়। মূলত ফল খেয়েই টিকে আছি। ভাত খাই খুবই কম।

আমাদের কুমিল্লা: ব্যাডমিন্টনে কুমিল্লার জন্য কি করার ইচ্ছা আছে?

কবিরুল ইসলাম শিকদার: নতুন প্লেয়ার তৈরির জন্য স্কুল পর্যায়ে ব্যাডমিন্টন ক্যাম্প হবে। এটা সারাদেশেই হবে। সেখান থেকে উদীয়মান খেলোয়ার বের করে এনে, তাদের তৈরি করবো। জাতীয় দলে যেন খেলতে পারে। বহু ছেলে আছে যারা খেলার ইনস্ট্রুমেন্ট ক্রয় করতে পারে না। ভালো একটা র‌্যাকেট ১২-১৫ হাজার, বোড ২-৩ হাজার, টাউজার দুই থেকে আড়াই হাজার। অনুষাঙ্গিক খরচ তো আছেই। সবাই তা কিনতে পারবে না। তাদের ফেডারেশন থেকে এসবের ব্যবস্থা করে দেবো। ফেডারেশনের অর্থ সম্পাদক কল দিয়ে বলেছে, ফান্ডে টাকা আছে। আপনারা কাজ করেন, টাকার সংকট হবে না।

আমাদের কুমিল্লা: আপনার রাজনীতির পথচলা নিয়ে সংক্ষেপে বলুন।

কবিরুল ইসলাম শিকদার: জন্মগতভাবে রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠা। বড় ভাই ভিক্টোরিয়া কলেজের ভিপি ছিলেন। ১৯৮১ সাল থেকে মামাতো বোন জামাই আ. হাই সাহেবের সাথে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতাম। সে থেকে ভালো লাগা। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করেছি রাজপথে। ১৯৯৫ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি প্রার্থী হলাম। তখন নির্বাচন হয়নি। ২০০১ সালে আমাকে ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক-২ করলো। ২০০৩ সালে নির্বাচিত জেলা সভাপতি হয়েছি। সেন্ট্রাল অফিসে কাদের ভাইয়ের উপস্থিতিতে ভোট হয়। যুবলীগ করার জন্য নেতারা বলেছে, বয়স হয়েছে তাই এখন আওয়ামী লীগের সাথে আছি।

আমাদের কুমিল্লা: রাজনীতি নিয়ে ভব্যিষ্যত পরিকল্পনা কী?
কবিরুল ইসলাম শিকদার: আজ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাইনি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আস্থা ও বিশ্বাস আর্জন করতে পেরেছি। কোন খারাপ কাজ করিনি। আমার নামে জীবনে কোনদিন মামলা হয়নি। আশা করি আগামী কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে মেয়র পদ প্রার্থী। নৌকা প্রতীকে জয়ী হবো, ইনশা আল্লাহ।

আমাদের কুমিল্লা: দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কবিরুল ইসলাম শিকদার: দৈনিক আমাদের কুমিল্লার পাঠকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ। তোমাকে ও ধন্যবাদ। জয় বাংলা , জয়তু শেখ হাসিনা