শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২০


দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় ধর্ষণ বাড়ছে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
06.10.2020

সম্প্রতি দেশে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে তুমুল হইচই সৃষ্টি হয়েছে। সিলেটের এমসি কলেজ থেকে শুরু করে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত নারীর প্রতি যে সহিংসতা; তা নিয়ে ক্ষোভে উত্তাল কুমিল্লাসহ সারাদেশ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, প্রভাবশালীচক্রের হস্তক্ষেপ, মাদক ও পারিবারিক অসচেতনতার কারণে এ ধরনের সহিংসতা বাড়ছে বলে মনে করেন কুমিল্লার নারী নেত্রীরা। স্পর্শকাতর পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব, এসব বিষয় নিয়ে তারা কথা বলেছেন দৈনিক আমাদের কুমিল্লার সাথে। মতামতগুলো গ্রহণ করেছেন দৈনিক আমাদের কুমিল্লার স্টাফ রিপোর্টার তৈয়বুর রহমান সোহেল।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছু দেখছি না- দিলনাঁশি মোহসেন
রোটারিয়ান ও নারী নেত্রী দিলনাঁশি মোহসেন বলেন, একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, নারীর উলঙ্গ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া আপত্তিকর। বরং ধর্ষকদের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হোক। এ ধরনের ঘটনায় নারীর পাশাপাশি পুরুষদেরও প্রতিবাদ করা উচিত।
ন্যায় বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী-শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বিরাট ভূমিকা রাখতো, বিদেশ থেকে এগুলোর ফান্ডিং করা হতো। করোনার কারণে ফান্ডিং বন্ধ আছে। ফলে খুব সহজে সংগঠনগুলো মুভ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া সামনে কিছু দেখছি না।
এক-দুইটাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক-সাকিনা বেগম
একটা-দুইটা ধর্ষককে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হোক, না হয় ক্রসফায়ার দেওয়া হোক। তাহলে মানুষ ভয় পাবে। দেশ এখন দেশের জায়গায় নাই। দেশে আইনের শাসন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়াতে আজ এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা মহিলাদলের সভাপতি সাকিনা বেগম।
ধর্ষকদের আইনি সহায়তা বন্ধ করা হবে-ফাহমিদা জেবিন
নারী ও শিশু নিয়ে কাজ করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা জেবিন মনে করেন, এসিড নিক্ষেপে যেমন সর্বোচ্চ সাজার বিধান আছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রেও একইরকম সাজার বিধান করা হোক। যদি তা না হয়, তাহলে ধর্ষকদের পুরুষাঙ্গ কর্তন করা হোক। তাহলে অপরাধপ্রবণতা কমবে।
তিনি বলেন, ধর্ষকদের কোনো প্রকার আইনি সহায়তা যাতে না দেওয়া হয়, সে বিষয়টি নিয়ে আদালতে কথা বলবো। কুমিল্লায় কোনো ধর্ষককে আইনি সহায়তা দেওয়া হবে না। আজই (গতকাল) এ বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
চার থেকে পাঁচ শতাংশ ব্যক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে- পাপড়ী বসু
মানবাধিকারী কর্মী ও বেসরকারি সংস্থা দৃষ্টির নির্বাহী পরিচালক পাপড়ী বসু মনে করেন, দেশের চার থেকে পাঁচ শতাংশ ব্যক্তি খুন, ধর্ষণ, মাদকব্যবসা, ঘুষ ইত্যাদি বিষয়গুলোর সাথে জড়িত। তারাই দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে ধর্ষণবিরোধী কমিটি করতে হবে। আমরা দৃষ্টির পক্ষ থেকে নগরীর নয়টি ওয়ার্ডে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে কাজ করছি। আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারও বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ অ্যালার্ট। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিরা সোচ্চার হলেও ধর্ষণ কমে যায়, যার উদাহরণ সদরের এমপি।
একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে উসকে দিচ্ছে –ইয়াসমীন রীমা
যখন কোনো একটা অপরাধকাণ্ড ঘটে, তখন বারবার একই রকম ঘটনা ঘটতে থাকে। যখন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তখন সারাদেশে একইতালে ধর্ষণ চলতে থাকে। এটা অনেকটা সিরিজ বোমা হামলার মতো। একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে উসকে দিচ্ছে। এটা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সরকারকে সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। সারাদেশে কেন একই সময়ে একধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে তা নিয়ে কাজ করতে হবে। চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে উচ্চ পর্যায়ে এ নিয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করতে হবে।এসব মন্তব্য করেন সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লার সভাপতি ইয়াসমিন রীমা
আইনের প্রয়োগটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-আইরীন আহমেদ
কুমিল্লা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইরীন আহমেদ মনে করেন, দেশে আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগটা যথাযথ হচ্ছে না। সঠিক আইন প্রয়োগে ধর্ষণের মাত্রা কমবে। কেউ ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না। ধর্ষণ প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি যেমন জরুরি, আবার দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও রাজনীতিবিদদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা আবশ্যক। প্রতিটা নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হতে হবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
ডাক্তারি পরীক্ষার পর দ্রুত সাজা দেওয়া হোক- হোসনেয়ারা বকুল
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট হোসনেয়ারা বকুল বলেন, ধর্ষণের অভিযোগ ওঠামাত্র ভিকটিমের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হোক। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হলে খুব দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় সাক্ষীকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার ধর্ষকরা অনেক ক্ষমতাধর হয়ে থাকে। ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা সাক্ষীদের দমিয়ে রাখে। ফলে দীর্ঘসূত্রিতা যত বাড়ে বিচার ততটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ বিষয়টার সংস্কার জরুরি। পাঠ্য বইয়ে কিশোর অপরাধের মৃত্যুদণ্ডসহ বড় সাজা নেই, বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। এটা কিশোর গ্যাঙকে উৎসাহিত করছে। পাঠ্যবই থেকে এ অধ্যায়টি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। প্রতিটা পরিবারকে অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হবে।
সারাদেশে একযোগে আন্দোলন করা হবে- রোকেয়া বেগম শেফালী
এইড কুমিল্লার নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া বেগম শেফালী বলেন, ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলন চলছে। আগামীকাল (আজ) একযোগে সকল এনজিও মিলে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করবো। কুমিল্লায় আন্দোলন শেষে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে। ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে ধর্ষণ কমিয়ে আনতে।
দেশে আইনের প্রয়োগই নেই- মাহমুদা আক্তার
প্রত্যয়ের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা আক্তার মনে করেন, দেশে আইনের প্রয়োগ নেই বলে ধর্ষণ বাড়ছে। তাই ন্যাক্কারজনক সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। সঠিক পানিশমেন্ট থাকলে এমন ঘটনা কমবে। এ বিষয়ে আগামীকাল (আজ) নাগরিক সমাজের সাথে মিটিং করবো। এরপরদিন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবো। সারাদেশে যেন একটা প্রভাব পড়ে, সে লক্ষ্যে কাজ করা হবে।
এত চার্জশিট-সাক্ষীর কি দরকার?- শামীমা আক্তার জাহান
ব্লাস্টের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার জাহান বলেন, ডাক্তারি পরীক্ষার পর একটি মেয়ে ধর্ষিত প্রমাণিত হলে এত চার্জশিট, এত সাক্ষীর কি দরকার? একটি মেয়ে নিজের সম্ভ্রম নিয়ে তো মিথ্যে বলবে না। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনারও সাক্ষীর অভাবে শেষ পর্যন্ত বিচার হয় না। দেশে আইন আছে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় বিচারহীনতার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে ধর্ষণ কমিয়ে আনা সম্ভব।