বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০


কুমিল্লা নগরীতে ভরাট হচ্ছে ২০০ বছরের প্রাচীন কাজী পুকুর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
11.10.2020

আবদুর রহমান।।
এক সময় কুমিল্লার খ্যাতি ছিলো ব্যাংক ও ট্যাঙ্কের শহর হিসেবে। কিন্তু কুমিল্লার সেই জৌলুস হারিয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে কুমিল্লায় একের পর এক ভরাট হয়ে গেছে বেশিরভাগ পুকুর ও ডোবা। এবার পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণ আইনের কোন তোয়াক্কা না করেই কুমিল্লা নগরীতে ভরাট হচ্ছে প্রায় ২শ বছরের প্রাচীন একটি পুকুর। স্থানীয়দের কাছে পুকুরটি কাজী বাড়ির পুকুর বা কাজী পুকুর নামেই পরিচিত। পুকুরটির অবস্থান নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাজীপাড়া এলাকার পশ্চিম পাড়ায়। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ শতকের পুকুরটি অর্ধেক ভরাট হয়ে গেছে।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাজীপাড়া এলাকার পশ্চিম পাড়ায় সড়কের উত্তর পাশের পুকুরটি ভরাটের কাজ করছেন অন্তত ১০ জন শ্রমিক। পুকুরের দক্ষিণ পাশে রয়েছে সড়ক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর বাকি তিন দিকে মানুষের বসতি। কাজীপাড়া এলাকার কাজী বাড়ির মৃত কাজী আবদুল হাকিমের ছেলে কাজী আবদুল খালেক পুকুরটি ভরাট করছেন। তিনি পাশের সদর দক্ষিণ উপজেলার পিপুলিয়া স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পুকুরটির অর্ধেক মালিকানা আবদুল খালেকদের। আর বাকি অর্ধেক তার চাচা কাজী আব্বাস আলীর ছেলেদের। বর্তমানে খালেক বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকযোগে আনা মাটি-বালু ফেলে পুকুরটির প্রায় অর্ধেক ভরাট করে ফেলেছেন। ভরাটের পর পুকুরের উপর তিনি বাড়ি ও সামনের অংশে দোকান নির্মাণ করবেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ সামছুল হক বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকেই পুকুরটি দেখে আসছি। আমার বাবা-দাদারাও পুকুরটি এমনই দেখেছেন। এই পুকুরটি প্রায় ২শ বছরের পুরোনো হবে। পুকুরের সম্পত্তি নিয়ে তাদের দুই পরিবারের সঙ্গে বিরোধ ছিল। এখন বিরোধ মিটিয়ে এক পক্ষ পুকুরটির অর্ধেক ভরাট করছে। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।
নাম প্রকাশ না শর্তে স্থানীয় অন্তত ৫ জন ব্যক্তি বলেন, এই পুকুরটি এলাকার প্রাচীন পুকুর। আগে এই পুকুরে মাছ চাষ হতো। বর্ষা মৌসুমে পুকুরটি এলাকার জলাবন্ধতা নিরসনে ভূমিকা রাখে। স্থানীয়রা পুকুরটি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতো। এছাড়া এলাকায় আগুন লাগলেও এই পুকুরের পানি কাজে লাগতো। এখন হঠাৎ করেই পুকুরটি ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সূত্র জানায়, ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা এক আদেশে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জনগণের আশ্রয়স্থল রক্ষা ও অগ্নিনির্বাপণে সহায়তা করতে কোনো অবস্থায় খাল-বিল, পুকুর-নালাসহ প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করা যাবে না এবং এর গতিপথ পরিবর্তন করা যাবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের জলাধার বা পুকুর ভরাট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভরাটকারীর বিরুদ্ধে আইনের ৭ ধারায় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে পরিবেশগত ক্ষতি ও বিধ্বংসী কর্মকাÐের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। এছাড়া জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, কোনো পুকুর-জলাশয়, নদী-খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। ওই আইনের ৫ ধারামতে, জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণিও পরিবর্তন করা যাবে না। তবে এসব আইনের কোন তোয়াক্কাই করছেন না পুকুর ভরাটকারীরা।
পুকুরটি ভরাটকারী কাজী আবদুল খালেক বলেন, পুকুরটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাচাতো ভাইদের সঙ্গে আমাদের বিরোধ চলছিলো। পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দখলে ছিলো না। সম্প্রতি স্থানীয় সালিশদাররা বিষয়টির সমাধান করে দিয়েছেন। আর আমাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বসত ঘরের জায়গা প্রয়োজন। অন্য কোথাও সম্পত্তি না থাকায় পুকুরটির অর্ধেক ভরাট করছি নিজেরা বসবাসের জন্য। আর সামনের অংশে দোকান করবো। তিনি দাবি করেন, পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যাক্ত। এটি কেউ ব্যবহার করে না এবং মাছ চাষও হয় না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি ডা.মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, পুকুর ভরাট করা সম্পূর্ণ বেআইনি। নিজের পুকুর হলেও কোন ব্যক্তি তা ভরাট করতে পারবেন না। দ্রæত এই ভরাট বন্ধ করা উচিত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।
পরিবেশ অধিদপ্তর, কুমিল্লার উপ-পরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, পুকুরটি ভরাট করা দিয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। এরপর ভরাটকারীদের ফোন করে বলেছি ভরাটের কাজ বন্ধ করতে। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মো.মনিরুল হক সাক্কু বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই বা কেউ আমাদের কাছে অভিযোগও করেনি। তবে এভাবে পুকুর ভরাট করার কোন সুযোগ নেই, এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমি এখনই কাউন্সিলরকে বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিচ্ছি।