মঙ্গল্বার ২৪ নভেম্বর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » কুবিতে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির তিন সপ্তাহের তদন্ত শেষ হয়নি ৩৭ সপ্তাহেও


কুবিতে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির তিন সপ্তাহের তদন্ত শেষ হয়নি ৩৭ সপ্তাহেও


আমাদের কুমিল্লা .কম :
21.10.2020

মহিউদ্দিন মাহি, কুবি ।।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ইংরেজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ আলী রেজওয়ান তালুকদারের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত নয় মাসেও শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি। তিন সপ্তাহের ভেতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও ‘অদৃশ্য’ কারণে ৩৭ সপ্তাহ পার হলেও প্রতিবেদন জমা হয়নি। এছাড়া এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অন্য দুই শিক্ষককে মানহানির অভিযোগ উঠলেও তার বিচারও করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভুক্তভোগী ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যৌন হয়রানির বিচার না করে প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানিকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জানা যায়, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি অভিযুক্ত ইংরেজি বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান আলী রেজওয়ান তালুকদারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও ইংরেজি বিভাগের সান্ধ্য কোর্সের প্রোগ্রাম পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন বিভাগটির সান্ধ্য কোর্সের ৮ম ব্যাচের এক ছাত্রী। অভিযোগে বলা হয়, এ ছাত্রীকে সরাসরি অনৈতিক প্রস্তাবের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভাগের নিজস্ব রুমে এমনকি শহরে তার নিজস্ব বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছেন ওই শিক্ষক। এছাড়া অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হলে শিক্ষার্থীকে সান্ধকালীন কোর্স নিয়ে ভাবতে হবে না এমনটিও বলেছেন তিনি। পরবর্তীতে পরীক্ষার হল থেকে ওই ছাত্রীর মোবাইল নিয়ে সকল প্রমাণাদি মুছে দেন বলে অভিযোগ উঠে।

এদিকে ১৯ জানুয়ারি কুমিল্লা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন অভিযুক্ত শিক্ষক আলী রেজওয়ান। সেখানে ছাত্রীকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে আখ্যা দেন এবং বিভিন্ন অশ্লীল ও আপত্তিকর শব্দচয়নের মাধ্যমে তার মানহানি করেন এ শিক্ষক।

এর প্রেক্ষিতে ২০ জানুয়ারি সান্ধ্য কোর্সের সকল কার্যক্রম থেকে আলী রেজওয়ানকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলকে। সেসময় তিন সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও নয় মাসেও সে প্রতিবেদনের উল্ল্যেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা।

ভুক্তভোগী ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, আমি ঘটনার পর থেকে বারবার রেজিস্ট্রার এবং তদন্ত কমিটি কে নক করেছি। ধীরগতি দেখে পুনরায় লিখিতও দিয়েছি। কিন্তু কেন যে বিচার হচ্ছে না বা তদন্ত হচ্ছে না বুঝতে পারছি না। আমি পরিবার এবং সমাজের কাছে অনেক ছোট হয়েছি। কেন মেয়েরা নির্যাতিত হয়েও কারও কাছে মুখ খোলে না তা এখন টের পাচ্ছি। শুধুমাত্র বিবেকের তাড়না থেকে লিখিত দিয়েছি যেন আর কোন মেয়ে নিপীড়নের শিকার না হয়। কিন্তু ফলাফল তো দেখতেই পাচ্ছেন। তখনও অনেকে নিষেধ করেছিলেন যেন অভিযোগ না দেই। কিন্তু আমার চিন্তা ছিল, আমার মেয়েও তো একদিন বড় হবে। তাকেও কি এমন নিপীড়নের শিকার হতে হবে? সেও কি চুপ করে থাকবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমাদের দেশের মানুষ এখন যৌন নিপীড়ন নিয়ে সোচ্চার। আমি আশা করবো আমার বিষয়ে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচারও আমি পাবো। এমন বিচার হোক যেন আর কোন মেয়েকে তার শিক্ষক দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার না হতে হয়।

তবে তদন্তের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা তদন্তের জন্য তিন সপ্তাহ যথেষ্ট নয় বলে জানান। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলের আহ্বায়ক কামরুন নাহার বলেন, ‘তদন্তের জন্য আসলে তিন সপ্তাহ যথেষ্ট নয়। আমরা বেশ কয়েকবার বসেছি। কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছে। এরপর আমি শিক্ষা ছুটিতে চলে যাই।’

সেলটির সদস্য সচিব মানতাশা তাবাসসুম বলেন, ‘ঘটনার পর সমাবর্তন, এরপর করোনা এ কারণে আমাদের দেরি হচ্ছে। এছাড়া করোনার কারণে তদন্ত কমিটির সবাই একসাথে বসতেও পারছি না। আশা করছি আমরা আবার শুরু করতে পারবো।’

এছাড়া ১৯ জানুয়ারির ওই সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজী বিভাগের ২ জন শিক্ষককে মানহানি করার অভিযোগ উঠে এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এরপর ২১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহেরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহা. হাবিবুর রহমান ও সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকবর হোসেন। এসব ঘটনায় ঘটনায় বিভাগটির সকল শিক্ষক অভিযুক্ত আলী রেজওয়ানের প্রতি অনাস্থা জানালে এবং শিক্ষকদের চাপের মুখে তিনি বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি চাইলে তাকে ১১ ফেব্রুয়ারি পদ থেকে অব্যাহতি দেয় বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নেতা বলেন, ‘একের পর এক যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় বিশ^বিদ্যালয়টিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তদন্ত কমিটির গাফিলতি অবশ্যই আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিৎ সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করা। অন্যথায় যৌন নিপীড়করা প্রশ্রয় পাবে। এবং একের পর এক এমন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েই চলবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, ‘যেহেতু তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছুটিতে আছেন আমরা তার স্থলাভিষিক্ত একজনকে দায়িত্ব দিব।’

যৌন নিপীড়নের বিচার না করে যৌন নিপীড়নকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন প্রশ্রয় দিচ্ছে না। দ্রুতই এর বিচার করা হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, ‘তদন্ত কমিটি করে দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবেদন না পেলে আমরা বিচার কিভাবে করবো? দেখি বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।’