বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০


কুমিল্লায় ডাম্পিং স্টেশনে নষ্ট হচ্ছে দুই হাজার পরিবহন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
25.10.2020

মামলা পরিচালনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন মালিক
গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ

 

তৈয়বুর রহমান সোহেল, কুমিল্লা।।
কুমিল্লায় হাইওয়ে পুলিশের পাঁচটি ডাম্পিং স্টেশনে নষ্ট হচ্ছে ৫০ কোটি টাকার গাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় গাড়িগুলোতে মরিচা ধরে গেছে। ঢাকা পড়েছে ঘাস ও আগাছায়। যত্নের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে যন্ত্রাংশ। বিভিন্ন ধরনের মোট দুই হাজার পরিবহন ডাম্পিং স্টেশনগুলোতে রাখা আছে। দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে গাড়ির মালিক মামলা পরিচালনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এছাড়া গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ।
সূত্রমতে,ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে রয়েছে চারটি হাইওয়ে থানা, ফাঁড়ি এবং তিনটি ডাম্পিং স্টেশন। এগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ চান্দিনা ডাম্পিং স্টেশন। যার নিয়ন্ত্রণ ময়নামতি হাইওয়ে ক্রসিং থানার হাতে। সাধারণত ময়নামতি থানা ও ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ি এলাকার গাড়িগুলো রাখা হয় চান্দিনা ডাম্পিং স্টেশনে। এছাড়া অন্যান্য ডাম্পিং স্টেশনগুলোতে জায়গার সংকীর্ণতা থাকলেও চান্দিনা ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়। এখানে আছে ১৩০০ পরিবহন। যার মধ্যে এক হাজার রিকশা এবং বাকিগুলো অন্য পরিবহন। মহাসড়কের আরও দুটি ডাম্পিং স্টেশন অবস্থিত দাউদকান্দি ও চৌদ্দগ্রামের মিয়া বাজারে। এগুলো তদারকি করে দাউদকান্দি থানা ও মিয়াবাজার হাইওয়ে ফাঁড়ির পুলিশ। এ দুই ডাম্পিং স্টেশনে গাড়ি আছে প্রায় ৫০০। এগুলোর অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের লাকসাম ও কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের মিরপুর অংশে রয়েছে দুটি ডাম্পিং স্টেশন। এসব স্টেশনের বেশিরভাগ মোটরসাইকেল।
কুমিল্লা হাইওয়ে রিজিয়নে মোট ২১টি ডাম্পিং স্টেশন আছে। এর মধ্যে পাঁচটি কুমিল্লা জেলায়। বাকি ১৬টি ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায়। মহাসড়ক ও নিকটবর্তী আঞ্চলিক মহাসড়কে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে ও মালিকবিহীন অবস্থায় আটক পরিবহনগুলো এসব ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়। অপরাধ বিবেচনায় এগুলোর কোনও কোনও পরিবহন মালিকের নিকট হস্তান্তর করা হয়। আবার কোনও কোনও পরিবহনের নামে দায়ের হয় মামলা। মামলাগুলো স্ব-স্ব জেলার আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়।
মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকায় অনেক পরিবহন মালিক মামলা চালানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আবার বিস্ফোরণের আশঙ্কায় ব্যাটারিচালিত পরিবহনসমূহের ব্যাটারি নিষ্ক্রিয় করেন পুলিশ সদস্যরা। এতে দাম কমে যাওয়ায় এসব পরিবহন নিয়ে বাড়তি ঝামেলায় যেতে চান না মালিকপক্ষ।
সরেজমিন চান্দিনা ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়,খোলা আকাশের নিচে পড়ে নষ্ট হচ্ছে দেশের কোটি টাকার সম্পদ। রিকশার উপর উঠে গেছে শূন্যলতা। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় গাড়িগুলোতে মরিচা ধরে গেছে। ঢাকা পড়েছে ঘাস ও আগাছায়। যত্নের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে যন্ত্রাংশ। কিছু গাড়ি মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে।

কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আটককৃত পরিবহনের কোনও মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় গাড়ির জট বাড়ছে। সর্বশেষ এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কুমিল্লা জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে আন্তরিকতা পোষণ করেছেন। অক্টোবরের শেষে এক হাজার রিকশা নিলামে তোলা হবে।
কুমিল্লার ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাফায়েত হোসেন জানান,‘ মামলার দীর্ঘসূত্রিতায় দিনের পর দিন গাড়িগুলো ডাম্পিং স্টেশনে রাখতে হচ্ছে। সমস্যার সমাধানের বিষয়ে পুলিশ সুপার মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করেছি। তিনি এটা নিয়ে কাজ করছেন।’
এদিকে দিনের পর দিন কোটি কোটি টাকার পরিবহন অযত্নে নষ্ট হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার সচেতন নাগরিকরা।
আল আমিন হোসেন নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান,‘ পুলিশ গাড়ি রিকুইজিশন করে। মামলা জটিলতা কাটলে গাড়িগুলো পুলিশ নিজেই ব্যবহার করতে পারে। এতে সরকারের বিপুল টাকা সাশ্রয় হয়, রিকুইজিশনেরও দরকার পড়ে না।’
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, ‘এভাবে হাজার হাজার গাড়ি অযত্নে নষ্ট হওয়া দু:খজনক। আমার প্রস্তাবনা হলো, পরিবহন মালিক ও চালকরা যদি অপরাধ করে, তবে গাড়িগুলো জব্দ না করে কোনও জনপ্রতিনিধির জিম্মায় মালিকপক্ষকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। মামলা চলুক সমস্যা নেই। মামলা নিষ্পত্তি হলে পরে ব্যবস্থা যা নেওয়ার তাই নেওয়া হোক। এধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে গাড়িগুলো অকেজো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।’
কুমিল্লা জেলা মোটরস মালিক সমিতির সভাপতি জামিল আহমেদ খন্দকার জানান,‘ গাড়িগুলো অকারণে নষ্ট হওয়াটা কষ্টদায়ক। আমরা জাতীয় কমিটির সাথে সমন্বয় করে এবিষয়ে কাজ করবো। যাতে বিজ্ঞ আদালত মামলা গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করেন।’
কুমিল্লা হাইওয়ে রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মোহাম্মদ শাহিন বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশনে জব্দকৃত গাড়িগুলোর মামলা সহজে নিষ্পত্তি হয় না। মামলা নিষ্পত্তি করে গাড়ি মাঝে মাঝে নিলামে তোলা হয়, তাও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অনেক সময় পাঁচ থেকে দশ বছর লেগে যায়। বাড়তি গাড়ি জমা হওয়া মানে আমাদের জন্য বাড়তি বোঝা। এগুলো পাহারা দিতেও অতিরিক্ত লোকবলের দরকার হয়। মামলা নিষ্পত্তির জন্য কুমিল্লা আদালতে যোগাযোগ করেছি। তারা সাড়া দিয়েছেন। আশা করি, এ মাসের শেষ দিকে এক হাজার রিকশা নিলামে তুলতে পারব।’
কুমিল্লা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন,‘ আমরাও চাই পরিবহন সংক্রান্ত মামলা গুলো যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এবিষয়ে বিজ্ঞ বিচারক মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো।’