শুক্রবার ২৭ নভেম্বর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » শরণার্থীদের খোঁজে-৪৪ : ‘কমান্ডার বললেন হাতিয়ার নিয়ে বের হও’ -আবুল হোসেন


শরণার্থীদের খোঁজে-৪৪ : ‘কমান্ডার বললেন হাতিয়ার নিয়ে বের হও’ -আবুল হোসেন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.11.2020

শাহাজাদা এমরান, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে।। ১৯৭১ সালে আমি ঝিনাইদহ জেলার চানমারি আনসার ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করি। মার্চের শুরুতেই আমাদের আনসারদের মধ্যে কানাঘুঁষা চলতে লাগল। দেশে যে কোন সময় যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। আমাদের ক্যাম্পের বেশিরভাগ অফিসার ছিল বাঙালি। তাই ক্যাম্পে আমরা এ সব নিয়ে আলাপ আলোচনা করলেও কোন সমস্যা হয়নি। অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের ন্যায় ২৫ মার্চ রাতেও আমরা ঘুমাতে যাই। কিন্তু ঘুম আসছিল না। অফিসারদের মধ্যে কেমন যেন এক অস্থিরতা লক্ষ করেছি বিকালের দিকে। সেই নিয়ে আলাপ করছিলাম আমরা। রাত দুইটা কি তিনটার পর ঘুম আসে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। গেল রাতে ঢাকা চট্রগ্রামে বিশাল হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়েছে। মুখ ধুয়ে নাস্তা খাব এমন সময় আমাদের ক্যাম্প কমান্ডার জোড়ে চিৎকার দিয়ে বললেন, তোমরা হাতিয়ার নিয়ে পালাও। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করো।এরপর আর আমরা কেউ নাস্তা খেলাম না।এমনকি কাপড় চোপড়ও নিলাম না। রুমে ঢুকে শুধু হাতিয়ার নিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।কথা গুলো বললেন আনসার সদস্য মো. আবুল হোসেন। গত ১৮ অক্টোবর ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিল অফিসে আমরা তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এপেক্স বাংলাদেশের সার্জেন্ট এট আর্মস এপে.রেজাউল ইসলাম।
মো.আবুল হোসেন। পিতা বাহাদুর বিশ্বাস আর মাতা জামিলা খাতুন। পিতা মাতার তিন ছেলে আর তিন মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। ১৯৪৭ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের ছোট কামার কুঞ্জে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
স্বাধীনতা পূর্ব ঝিনাইদহের রাজনীতিক অবস্থা কেমন ছিল জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, তখন ঝিনাইদহ শহরে আওয়ামী লীগের চাইতে মুসলিমলীগ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সংগঠিত ছিল। এখানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিতেন এবিএম গোলাম মজিদ। এখানে আবার ছাত্রলীগ খুব সক্রিয় ছিল। ৭মার্চের পর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে জন্য মিছিল মিটিং করলেও মুসলিম লীগ কখনো বাধা দিত না। এখানে রাজনীতির একটি সংস্কৃতি ছিল।
শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ঝিনাইদহের অবস্থা কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২৫ মার্চ বিকালেও ছাত্রলীগ শহরে মিছিল করেছে। আমাদের ক্যাম্প কমান্ডার মোকসেদ আলী বিশ্বাস। যার দেশ প্রেম ছিল অসীম।তিনি ৭ মার্চের পরই বলতেন, দেশে যুদ্ধ লাগলে দেশের জন্য যুদ্ধ করব।পশ্চিমাদের বৈষম্য আর ভাল লাগে না। ২৬ মার্চ সকালে আমরা যখন ডাইনিং রুমে আসলাম তখন কমান্ডার এসে জানাল,দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তোমাদের যার কাছে যে হাতিয়ার আছে তা নিয়ে দ্রæত ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাও। যে কোন সময় পাকিস্তানিরা এসে ক্যাম্প দখলে নিতে পারে। তখন আমরা হাতিয়ার নিয়ে না খেয়েই ক্যাম্প থেকে বের হয়ে যাই। আমরা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে একটি গাছের নিচে বসে সিদ্ধান্ত নিই যে, যশোর থেকে ঝিনাইদহ আসার প্রধান সড়কের বিশাইখালী ব্রিজটি ভেঙে দেব। এরপর আমরা বিশাইখালী যাই। ওইখানে গিয়ে দেখি কয়েকজন ইপিআর সদস্যও আছেন। সাথে রয়েছে অসংখ্য স্থানীয় মুক্তিকামী জনতা। ইপিআরকে আমরা কথাটি বলতেই সাড়া দিয়ে জানাল,আমরা তো এজন্যই এখানে এসেছি। আমাদের এসডিপিও মাহবুবু আলম স্যার ও ঝিনাইদহ থানার ওসি কাঞ্চন বাবু এটি ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তারা কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পরবেন। এরপর ইপিআর,আমরা আনসার ও জনতা মিলে যৌথভাবে যশোর ঝিনাইদহ রোডের বিশাইখালী এই ব্রিজটির অর্ধেকটা ভেঙে দেই। সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটাই ছিল হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম সফল অপারেশন।
এ দিকে পরে শুনেছি, ২৬ মার্চ খুব সকালেই যশোর সেনানিবাস থেকে তিন গাড়ি সেনা সদস্য বিশাইখালি ব্রিজ দিয়ে ঝিনাইদহে ঢুকে পড়ে। পরে গঙ্গা ব্রিজের কাছে আসলে এখানে সশস্ত্র ইপিআর সদস্যদের বাধার মুখে পড়ে। প্রস্তুতি নেয়ার আগেই হঠাৎ এই আক্রমণের মধ্যে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে কয়েক দিনের ব্যবধানে এই তিন গাড়ি সেনা সদস্য একজনও আর জীবিত ফিরে যেতে পারেননি। কারণ,তারা যেখানেই পালাতে গিয়েছে সেখানেই স্থানীয় জনগণ তাদের গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে। এই খবর যশোর সেনানিবাসে পৌঁছলে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিপুল সংখ্যক সেনা পাল্টা আক্রমণ করতে এসে দেখে বিশাইখালী ব্রিজ ভাঙা। তাই তারা সেই দিনের মতো সেনানিবাসে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। ২৬ মার্চ থেকে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ঝিনাইদহে হানাদার বাহিনী খুব বেশি আক্রমণ করতে পারেননি। বরং এ সময়ে স্থানীয় জনতা,বিভিন্ন বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা হানাদার বাহিনীর শহরে প্রবেশের বিভিন্ন পথ বন্ধ করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ সময়ে বিহারী ও মুসলিমলীগদেরও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেয়নি। কিন্তু বিশাইখালী ব্রিজ মেরামত করার পর যশোর সেনানিবাস থেকে ঝিনাইদহে মরনকামড় দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। আর এ সময়েই তাদের সাথে যোগ দেয় বিহারি ও রাজাকাররা। ফলে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত ঝিনাইদহ হিন্দু পরিবার ও আওয়ামী লীগ পরিবার শূন্য হয়ে যায় ঝিনাইদহে। মে মাসের দিকে নির্যাতনের মাত্রা আরো তীব্র হলে একই সাথে মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে ভয়ে সাধারণ পরিবারও ঝিনাইদহ ছাড়তে শুরু করে।
সে সময়ে ঝিনাইদহে রাজাকার আল বদর আল শামস বাহিনীর প্রধান ছিল মাওলানা সামদানী। এই মাওলানা সামদানীর নেতৃত্বেই চলে হত্যা,খুন , রাহাজানী,ধর্ষণ,লুটপাট ও বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ। এমন কোন হেন কাজ নেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাওলানা সামদানীর বাহিনী ঝিনাইদহে করেনি। মাওলানা সামদানী বাহিনীর হাতেই ঝিনাইদহে প্রথম শহীদ হন আবদুল আজিজ রাজ্জাক। আমরা আসার কয়েক দিন পর চানমারী আনসার ক্যাম্পে শহীদ হয় ঝিনাইদহের এক আনসার সদস্য। এরপর এখানে পাকিস্তানি আর্মি ও আনসার সদস্যদের মধ্যে এক মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। এতে দুই আনসার সদস্য শহীদ হন। এরপরই মে মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে বাধ্য হয়ে আমি ,মো.আলী,আসলাম,আইন উদ্দিন,আবদুর রশীদসহ ১৪ জন আনসার এক সাথে ভারতে যাই। যুদ্ধ শুরুর পর এই দুই মাস আমরা ঝিনাইদহের বিভিন্ন স্থানে স্থানে পালিয়ে পালিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। যাওয়ার পথে রাত হলে মহেশপুর উপজেলার খরহুদা আনসার বাড়িতে আমরা চৌদ্দজন রাত্রিযাপন করি। ভোর চারটার সময় সকালের সূর্য উঠার আগেই ভারতের হিলিং সীমান্ত দিয়ে মাইজদিয়া ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছি। মাইজদিয়া ক্যাম্পে যাওয়ার পরদিন ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন আমাদের অস্থায়ী সরকারের প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে কামরুজ্জামান ও আমাদের এমপি আজিজ আহমেদ। আমরা আমাদের এমপি আজিজ সাহেবকে জানাই,গত দুই মাস আমরা খেয়ে না খেয়ে যুদ্ধ করে এখানে এসেছি। কিন্তু এই ক্যাম্পে থাকা- খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে। এ কথা শুনে তিনি ওইদিনই আমাদের কৃঞ্চনগর ক্যাম্পে নিয়ে যান এবং খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে বললেন, আপাতত এখানে থাক। আমি দেখছি। পরে আমরা আবার মাইজদী ক্যাম্পে চলে আসি। কয়েক দিন পর মাইজদী ক্যাম্প থেকে আমাদের বিহারের চারুলিয়া ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ মার্চ থেকে মে মাসে ভারতে শরণার্থী হিসেবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যে কষ্ট করেছি তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কষ্ট হয়েছে ভারতের ক্যাম্পগুলোতে থাকার সময়। এখানকার প্রতিটি ক্যাম্পেই ছিল নানা সমস্যা। সমাধানের জন্য পাওয়া যেত না স্থানীয় কোন পর্যায়ের নেতাদের। কখনো শরণার্থী ক্যাম্পে কখনো রেগুলার বাহিনী হিসেবে বাহিনীর ক্যাম্পে থেকেছি। প্রয়োজনে আবার যুদ্ধ করতে দেশেও গিয়েছি। সবস্থানেই কষ্ট কষ্ট আর কষ্ট ছিল। সারা দিন কষ্ট করে ক্যাম্প গুলোতে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারতাম না মশার কামড়ে। পানির অভাবে গোসল তো দূরের কথা অনেক সময় বাথরুম করতেও কষ্ট হতো। খাবার কষ্ট চিকিৎসার কষ্টের কথা নাই বা বললাম।
দেশে কবে আসেন জানতে চাইলে মো. আবুল হাসেম বলেন, ৬ ডিসেম্বর রাতেই খবর আসে আগামীকাল ৭ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ মুক্ত ঘোষণা করা হবে। তাই আমরা ভারতের বানপুর ক্যাম্প থেকে রাত তিনটার দিকে চলে আসি ঝিনাইদহ কেসি কলেজে। ফজরের আজান দেওয়ার সাথে সাথে কেসি কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র পায়রা চত্বরে আসি। জয় বাংলা, জয় ঝিনাইদহ,মুক্ত ঝিনাইদহ এই ¯েøাগান শোনার সাথে সাথে শত শত সাধান মানুষ সেদিন ঘর থেকে বের হয়ে আসে। ¯েøাগানে ¯েøাগানে মুখরিত হয়ে উঠে মুক্ত ঝিনাইদহ।