বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে-৪৫, ‘শিশুকালে বাবা-মাসহ পরিবারের সবাইকে আর ৭১’এ সতীত্বের সাথে স্বামীকেও হারাই’


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.11.2020

শরণার্থী জয়গুন নেছার সাথে কথা বলছেন প্রতিবেদক                                                                                       ছবি: জাহেরা আক্তার

শাহাজাদা এমরান, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে।।
মাত্র নয় বছর বয়সে দূরারোগ্য কলেরায় মা-বাবা,ভাই-বোন,দাদা-দাদিসহ পরিবারের সকল সদস্যকে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে হারিয়ে আমি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এতিম হয়ে যাই। আমাদের বাড়িতে যারা আমাদের প্রজা ছিল (কাজের লোক) উল্টো তাদের আশ্রয়েই আমি বড় হতে থাকি। তারাই হয়ে ওঠে আমার জগত সংসারের অভিভাবক। আমার বাপ-দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তি একটা সময় আমার জীবনে চরম অভিশাপ হয়ে ওঠে। আমি মরে গেলেই সকল সম্পত্তির মালিক বনে যাবে প্রজা। এই লোভ তাদেরকে আমার প্রতি নির্মম করে তোলে। সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকার হয়ে একমুঠো খাবারের জন্য তাদের হাতের দিকে চেয়ে থাকতে হতো। স্বজন হারানোর মাত্র ২ বছরের মাথায় ১১ বছর বয়সে দুই সতীনের সংসারে একাধিক সন্তানের জনকের সাথে আমাকে আমাদেরই আশ্রিতরা বিয়ে দিয়ে দেয় গোপন চুক্তি করে। তৎকালীন সময়ের নিয়মানুযায়ী আমাদের মোট সম্পত্তির ষোলোআনা আমাদের, আর দেখাশোনা করার প্রজারা পাবে চার আনা। এই সম্পত্তি নিয়ে তাদের মধ্যে চুক্তি হয়। যেহেতু আমি স্বাভাবিক রোগশোকে মরছি না। তাই স্বামীর বাড়ি গিয়ে যখন দেখব দুই সতীন আর অনেকগুলো ছেলে মেয়ে আছে, তখন এসব দেখে আমি আত্মহত্যা করব অথবা পালিয়ে এলাকা ছেড়ে যাব। এর আাগে যেভাবেই হোক জোর করে স্বামীকে দিয়ে আমার সব সম্পত্তি লিখে নিবে। তখন আমার ষোলোআনা থেকে বিয়ে করার কারণে স্বামী পাবে ৮ আনা আর প্রজা পাবে ৮ আনা। আমার স্বামী নামের লোভী ওইব্যক্তিও তার ঘরে থাকা দুই বউকে একথা বলে রাজি করেছিল যে, বিয়ে করে সম্পতি লিখে তাকে ছেড়ে দেব। এক পর্যায়ে চেয়েছিলাম নিজে আত্মহত্যা করব, পারিনি। পরে ভাসুরকে হত্যা করে জেলে যাই। এক সময় হিন্দি সিনেমার মতো নাটকীয়ভাবে ছাড়া পাই। ভাগ্যের নির্মম গতিতে বাগেরহাট থেকে ঝিনাইদহ এসে আাবার আমাদের প্রজার মেয়ের জামাইর কাছে ধরা খাই। অনেক ঘটনার মধ্যে দিয়ে সে আমার স্বামী হয়। ১৯৭১ সাল আসে। দেশে যুদ্ধ লাগে। পাকিস্তানিরা আমাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। সতীত্ব¡ যায়। আসে বিজয়, কিন্তু ফিরে পাইনি স্বামী আর সংসার। সব হারিয়ে আজও স্বামীকে খুঁজে ফিরি। আর সংসার করিনি। স্বামী সংসার মনে হলে ঘরে থাকা লাল সবুজ পতাকাটা বুকে ধরি।বলি,তোর কারণে সব হারিয়েছি,তুই কিন্তু আমার কাছ থেকে হারাবি না। থেমে থেমে কেঁদে কেঁদে চোখের পানিকে নোনা জল বানিয়ে কথাগুলো বললেন বীরাঙ্গনা জয়গুন নেছা। গত ১৮ অক্টোবর ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদে বসে যখন জয়গুন নেছার সাক্ষাৎকার নিই তখন তার বেদনার কথাগুলো শুনে কেঁদেছেন উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারাও। ২৬ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে এই প্রতিবেদকও এমন নির্মম ঘটনার আর মুখোমুখি হননি। প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এই সাক্ষাৎকার পর্বের পুরোটাই ছিল এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্যে। এ সময় সাথে ছিলেন এপেক্স বাংলাদেশের সার্জেন্ট এট আর্মস এপে.রেজাউল ইসলাম।
বলছিলাম জয়গুন নেছা বীরাঙ্গনার কথা। যিনি ১৯৪০ সালে বাগেরহাট জেলার মোরলগঞ্জ উপজেলার ওগড়াপাশা ইউনিয়নের গোলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল গফুর শেখ আর মাতা বরু বিবি। পিতা মাতার এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। এক কৃষক পরিবারের মেয়ে জয়গুন নেছা। বাবা কৃষি কাজ করলেও অভাব অনটন ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। যার কারণে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডিও পেরোতে পারেননি তিনি। অনেক কষ্ট করে তাকে বেড়ে উঠতে হয়েছে। তাদের জমিতে কাজ করার জন্য বাবা একটি প্রজা পরিবার রেখেছে। তৎকালীন সময়ে প্রজারা যে বাড়িতে স্থায়ীভাবে কাজ করবে ওই বাড়ির সম্পত্তির একটি অংশও বাড়ির মালিক তাদেরকে দিতে হতো। যাতে প্রজার ভবিষ্যত প্রজন্ম মাথাগোঁজার জন্য কোথায়ও না যেতে হয়। প্রজার নাম মনে নেই তবে তার ছেলের নাম ছিল সামছুউদ্দিন।
কীভাবে বাগেরহাট থেকে ঝিনাইদহ স্থায়ী হলেন জানতে চাইলে বীরাঙ্গনা জয়গুন নেছা বলেন,আমার বয়স যখন ৯ বছর । তখন আমাদের এলাকায় কলেরা মহামারী পর্যায়ে চলে যায়। ঘর বাড়ি এমনকি গ্রামকে গ্রাম পুরো মানুষ কলেরায় মারা গেছে। এমনও দেখা গেছে একটি পাড়ায় আর একজনও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে দাফন কাফন করার জন্য। সব মারা গেছে। মাত্র এক বছরের মাথায় আমার বাবা,মা,ভাই,বোন,দাদা ও দাদিসহ পরিবারের সকল নিকটজনেরা কলেরায় মারা যায়। আল্লাহর লিলা বুঝা দায়। শুধু বেঁচে রইলাম আমি। আমার আপন বলতে বাড়িতে রইল আমাদের প্রজা (কাজের লোক) সামছুর বাবা ও তার পরিবার । স্বজন মারা যাওয়ার মাত্র ছয়মাসের মধ্যেই আমাদের প্রজার আচরণ মনিবের মতো হতে লাগল। বাড়ি,জায়গা-জমির মালিক সব আমি। অথচ আমার সাথে প্রজার মতো আচরণ করতে লাগল। দুই বছর পর আমার বয়স যখন ১১ বছর তখন দুই সতীনের সংসারে ষড়যন্ত্র করে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করার জন্য প্রজা পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক খারাপ লোকের সাথে ১০১ টাকার পণ নিয়ে বিয়ে দেয়। বিয়ে করে শ্ব্শুর বাড়ি পাড়া দিয়েই বুঝতে পারলাম আমার স্বামী নামের এই নরপশুর একাধিক সন্তানসহ দুইটা বউ আছে। প্রথম রাত থেকেই শুরু হয়েছে আমার ওপর অত্যাচার নির্যাতন। বিয়ের দিন যে শ্বশুর বাড়ি গেলাম দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল। আমার প্রজা এই এক বছরের মধ্যে এক দিনের জন্যও আমাকে দেখতে আসেনি। আমার শ্বশুর বাড়িতে দুই সতীন আমাকে কাজের লোক হিসেবে ব্যবহার করত। স্বামী থেকেও স্ত্রীর মর্যাদা পাইনি। হঠাৎ করে এক বছর পর আমার প্রজা সামছুর বাবা শ্বশুর বাড়ি এসে আমাকে বলে তোকে বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য আসছি, চল। তখন আমার, স্বামী,ভাসুর ও প্রজাসহ আমরা রওয়ানা হই। আমি মূর্খ মানুষ। তাদের ষড়যন্ত্র, ইশারা ইঙ্গীতের কথা বার্তা তখন বুঝতে পারিনি। বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বলে আমাকে মোরলগঞ্জে সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যায়। আমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে এই তিনজন মিলে কিছু কাগজ এনে বলে টিপসই দিতে। আমি পড়তে পারি না। এই সুযোগটাই তারা নিয়েছিল। আমাকে বিয়ের শর্ত হিসেবে প্রথমে আমার স্বামী আমার কাছ থেকে সব সম্পত্তি তার নামে লিখে নিবে । পরে প্রজা আর স্বামী ভাগ করে নিবে। সম্পত্তি নেয়ার পর স্বামী আমাকে তালাক দিবে আর তখন প্রজা আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিবে না এই ছিল স্বামী আর প্রজার মধ্যে চুক্তি। রেজিস্ট্রি অফিসারের সামনে যাওয়ার পর ঐ স্যার আমাকে বললেন,এই দলিলে কি আছে আপনি জানেন। আমি বললাম না স্যার জানি না।তখন তিনি বললেন,আপনার সকল সম্পত্তি আপনার টিপসইয়ের মাধ্যমে আপনার স্বামী ও ভাসুর লিখে নিচ্ছে। আপনি কি তাদের দিতে চান। তখন আমি চিৎকার দিয়ে বলি, স্যার তারা আমাকে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি আমার সম্পদ দিতে চাই না। তখন সাথে সাথে ঐ স্যার পুলিশ এনে তাদের গ্রেফতার করে একটি রুমে আটকে রাখে। এরপর আমি পড়েছি আরেক বিপদে। আমি তো কিছু চিনি না, জানি না। বিকাল হয়ে গেছে। মহিলা মানুষ কোথায় যাব। এরপর স্যারকে বললাম, স্যার, আমার স্বামী ভাসুরকে ছেড়ে দেন আর সম্পত্তির অর্ধেক লিখে দেন। আমার কথা মতো তাই করল। পরে প্রজা বলল, সবাই আমার বাড়িতে চল। বাড়ি আসার পথে আমার স্বামী আর ভাসুর আমাকে ইচ্ছেমতো মারে।গাছের লাঠি ভেঙে সারা পথে পথে মারে। আমার শরীরের এমন কোন জায়গায় নেই যেখানে ভাসুরের হাত পড়েনি। সারা শরীর ফুলে যায়। বাড়ি যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, না আর বাঁচব না। ফাঁসি দিয়ে মরব। এ পৃথিবীতে যেহেতু আমার কেউ নেই তাই আমিও আর থাকব না। রাতে গলায় ওড়না দিয়ে যখন ঘরের সিলিংয়ের কাঠের সাথে ঝুলতে লাগলাম, তখন আমার গোঙানি শুনে সবাই উঠে এসে আমাকে নামিয়ে ফেলে। আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই। এরপর সকালে সিদ্ধান্ত নিলাম, না, আর মরব না। এবার মারব। যেহেতু ভাসুর আমাকে বেশি মেরেছে, তাই আগে তাকে মারব। তাই পরদিন ভাসুরের জন্য খুব সুন্দর করে নারকেল দিয়ে পিঠা বানিয়ে বললাম, দাদা আমি এই পিঠা বানিয়েছি আপনার জন্য, খান। তিনি খাওয়ার জন্য পিঠা সবেমাত্র হাতে নিয়েছে তখন ধারালো দা’টি দেখিয়ে বললাম, দাদা এই দা দিয়ে যদি আমি নিজকে মেরে ফেলি।তখন তিনি বললেন, তুই মরবি কে ? তোকে না রাতে বাঁচালাম। এবার বললাম যদি আপনাকে মারি। তখন তিনি বললেন কি পাগলের মতো কথা বলছিস। এ কথা বলে তিনি মাথাটা নুয়ে যেই না প্লেট থেকে পিঠা নিচ্ছে এমন সময় তার ঘাড় বরাবর দিলাম এক কোপ। সাথে সাথে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। রক্তের জোয়ার বইছে।সবাই আমাকে ধরে ইচ্ছেমতো মারল। পরে পুলিশ এসে থানায় নিয়ে গেল।
এরপরের কাহিনি জানতে চাইলে জয়গুন নেছা বলেন, আমাকে বাগেরহাট জেল খানায় নেয়ার ছয় মাস পর আমার খালু আমাকে জামিনে বাইরে নিয়ে আসে। জামিন হওয়ার পর খালু বললেন,চল জজ সাহেবের বাড়ির পিয়ন আমার বন্ধু । তার সাথে দেখা করে যাই। খালু জজ সাহেবের বন্ধুর কাছে গিয়ে আমার সব ঘটনা খুলে বলে। সব শুনে তিনি বলেন, জজ স্যারের বাসায় আমি ১২ বছর ধরে আছি। সন্তানের মতো দেখে। বিভিন্ন রায় নিয়ে আলাপও শুনি। আপনার ভাগ্নির যে অবস্থা ফাঁসি থেকে তো আপনি তাকে বাঁচাতে পারবেন না। এ কথা বলার পর এই প্রথম আমার বাঁচার সাধ জাগল। খালু আমার জজের পিয়নের হাত ধরে বলল, একটা উপায় বের করেন বন্ধু। ঠিক যেন বাংলা বা হিন্দি সিনেমার মতো কাহিনি। পিয়ন খালু বললেন, উপায় একটা আছে। জজ সাহেবের চার বছরের ছেলেটা একটু পড়ে বাসার এই উঠানে আমার সাথে খেলতে পাঠাবে। আমি তাকে উঠানে রেখে বাথরুমে যাব। আার আপনার ভাগ্নি তাকে কোলে করে শহরের এক সাইডে চলে যাবে। মাইকের আওয়াজ শুনলে ছেলেকে নিয়ে বাসায় আসবে। একেবারেই ছায়াছবির মতো গল্প।যেই কথা সেই কাজ। পরে আমি জজের ছেলেকে নিয়ে পাশের একটি মহল্লায় লুকিয়ে থাকি। ২০ মিনিট পড়েই শুনি একটি হারানো বিজ্ঞপ্তির মাইকিং। মাইকিং শোনার কিছুক্ষণ পর আমি দ্রুত হেঁটে যেই না জজের বাসার সামনে এলাম তখন পিয়ন খালু চিৎকার দিয়ে বলল, স্যার বাবুরে পাইছি। দৌঁড় দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে জজ ছেলেকে আর বউ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। পরে বাসার ভিতরে নিয়ে আমার পরিচয় জেনে বলল, যেহেতু তোমার কেউ নেই এখন থেকে তুমি আমার বাসায় থাকবে,কাজ করবে আর ছেলেকে দেখে রাখবে।
খুনের মামলা থেকে কিভাবে মুক্তি পেলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জজ আর জজের বউ প্রতিদিন বাসায় জগড়া করত। জজ বলত,যেহেতু সে আদালতে নিজে স্বীকার করেছে খুন করার কথা তাই তাকে বাঁচানো আমার দ্বারা সম্ভব না। আর উনার বউয়ের কথা হচ্ছে যে মেয়ে আমার সন্তান বাঁচিয়েছে তাকে আমি মরতে দিতে পারি না। আবারো বলছি, ঠিক বাংলা সিনেমার মতো কাহিনি। মামলার দিন। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শেষ। জজ সাহেব রায় দিবেন। এমন সময় উনার বউ বোরকা পরে আদালতে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, স্যার আমার একটি কথা আছে। তখন তিনি বললেন যা বলার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন। তিনি বললেন, আচ্ছা স্যার,আপনার বউকে যদি আপনার বড় ভাই স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়ে লাঠি দিয়ে ঐ জায়গায় পেটায় তখন আপনি যদি স্বামী হয়েও কিছু না বলেন, তখন আপনার বউয়ের কি করা উচিত? হয় নিজে মরে যাওয়া নতুবা তাকে মারা। আপনি কোনটির পক্ষে? তখন জজ সাহেব বললেন আত্মরক্ষা করা সবারই অধিকার আছে। তাকে মেরেও নিজকে বাঁচানোই উত্তম। তখন জজের বউ বললেন, ঠিক আসামি জয়গুন নেছা নিজকে রক্ষা করার জন্যই ভাসুরকে মেরেছে। আমার আসামি নির্দোষ। এ কথা বলার সাথে সাথেই জজ চুপ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে রায় দিলেন, আমি খালাস। এরপর আদালতেই আমি স্বামীকে তালাক দেই। পরে খালুর সাথে গ্রামে যাই। কিন্তু আমার প্রজার ইন্ধনে গ্রামবাসী আমাকে গ্রামে ঢুকতে দেইনি। খুনি বলে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। পরে খুলনায় এক চাচার বাসায় যাই। চাচার ছিল এটি দ্বিতীয় স্ত্রী। তিনি খুব খারাপ ছিলেন। আমাকে ঠিকমতো খেতে দিতেন না। তখন আমি সারাদিন খুলনা শহরে কাগজ কুড়িয়ে এগুলো বিক্রি করে কিছু খেতাম আর রাতে চাচার বাসায় ঘুমাতাম। একদিন হঠাৎ করে খুলনায় আমার বাড়ির প্রজার মেয়ের জামাই হাবিবুর রহমানের সাথে দেখা হয়। আমি এখানে কীভাবে এলাম, কোথায় আছি বিস্তারিত জেনে বলে চল আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে বেড়ায়ে আসি। আমি আপত্তি করলাম না। বরং খুশি হলাম এ জন্য যে, হাবিব আমার পূর্ব পরিচিত আর কয়েকদিন আরামে তো পেট ভরে খেতে পারব। সে আমাকে ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। কয়েকদিন থাকার পর হাবিব বলে আমি তোমাকে বিয়ে করব। আমি মানা করে বললাম,একে তো আপনার বউ আছে আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, এই মেয়ের বাবাই আমাকে বাড়ি ছাড়া করে আজ এ অবস্থ্ াকরছে। সুতরাং আমি আপনাকে বিয়ে করব না। পরে আবার আমি পালিয়ে কালিগঞ্জ থেকে পালিয়ে খুলনা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসে উঠি। বাস আমাকে সন্ধ্যার দিকে ঝিনাইদহ শহরের থানার সামনে নামিয়ে দেই। আমি বললাম, ভাই আমি তো খুলনা যাব। তখন গাড়ির লোক বলে, এটা তো কালিগঞ্জ-ঝিনাইদহ গাড়ি। আপনি ভুল করছেন। এখন এখানেই নামতে হবে। রাত হয়ে গেলে উপযুক্ত মেয়ে। থানার সামনে বসে আছি দেখে এক পুলিশ আমাকে ভিতরে ডেকে নিয়ে বলল,আমি এখানে এতোক্ষণ বসে আছি কেন? উদ্দেশ্য কি ।পুলিশের কথাবার্তা ও চোখের চাহনি আমার সন্দেহ হয়। ফলে বাধ্য হয়ে বলি,আমার বিয়ে হয়েছে। স্বামীর নাম হাবিবুর রহমান,বাড়ি কালিগঞ্জ। আমি রাগ করে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। এ কথা বলার পর থানা থেকে আমার প্রজার মেয়ের স্বামী হাবিবুর রহমান হাবিবকে খবর দেয়া হয়। হাবিব থানায় এসে আমাকে নিয়ে যায়। থানার বাইরে এসে বলে, তুমি থানাকে বলেছ আমি তোমার স্বামী। এখন যদি বিয়ে না কর, তাহলে তোমার বিপদ হবে। এই ভয়ে পরদিন কাজী অফিসে গিয়ে হাবিব আমাকে বিয়ে করে। পরে ঝিনাইদহ একটি বাসা নিয়ে আমাকে এখানেই রাখে। আর আমার বড় সতীনকে রাখে বাড়িতে। যুদ্ধের আগে আমার পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে হয়। এর মধ্যে শাহিদা ছাড়া সবাই মারা যায়। ১৯৭১ সালে শাহিদার বয়স ছিল ছয় বছর। তখন আমি তিন মাসের অন্ত:সত্ত্বা ছিলাম। আমাদের সংসারে ছিল তীব্র অভাব। তাই আমি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে চাল ঝাড়ার চাকরি করতাম।
বীরাঙ্গনা ও শরণার্থী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়গুন নেছা বলেন, আমরা তখন ঝিনাইদহ শহরের আওয়ামী লীগ নেতা কেয়ামতের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই আমার সতীনের ১৪ বছর বয়সের মেয়েকে কালীগঞ্জ থেকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়, আর ফিরে আসেনি। এই খবরে আমরা আতংকিত হয়ে পড়ি। ইতিমধ্যে আমার স্বামীও যুদ্ধে চলে যায়। বাসায় আমি তখন একা। একদিন রাজাকার হাতেম বাসায় এসে বলে তোমাকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে যেতে হবে। এটা বড় স্যারের নির্দেশ। আমি তখন তিন মাসের অন্ত:সত্ত¦া। তার এই কথায় ভয়ে কাঁপতে থাকি। এর কিছুক্ষণ পরেই দেখি আমার ঘরের সামনে সেনাবাহিনীর গাড়ি। কুখ্যাত রাজাকার হাতেম যখন আমাকে হাতে ধরে জোর করে গাড়িতে উঠায়, তখন তাকে আমি বার বার বাবা বলি,বাবারে আমার গর্ভে সন্তান আছে। আমাকে নষ্ট করিছ না। এরপর আমাকে নিয়ে গেল। এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এর বেশি আমি আর কি বলতে পারি বাবা। বলেই ঢুকরে কেঁদে উঠল জয়গুন নেছা। কয়েকদিন পর আমাকে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে ফেলে যায়। যখন আমাকে ফেলে যায় তখন আমি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম। কারণ, তাদের নির্যাতন আর নিপিড়নে তখন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। খবর পেয়ে আমার স্বামী, এলাকার আজিজ,দুদু মিয়াসহ আরও অনেকেই আসে। কি মাস বলতে পারব না। তবে যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় হবে। ভারতে গিয়ে একটি শরণার্থী শিবিরে আমাকে রেখে স্বামী চলে যায়। শরণার্থী শিবিরেই আমার ছোট মেয়ে জাহিদা সুলতানা জন্ম নেয়। তখন স্বামী আমাকে বলে এই মেয়ে পাকিস্তানিদের, আমার না। এ কথা শুনার পর ইচ্ছে হয়েছিল শরণার্থী শিবিরেই মেয়েটিকে মেরে আমি নিজেও আত্মহত্যা করি। কারণ, মার্চ মাসে আমি তিন মাসের অন্ত:সত্ত্বা ছিলাম, আর যুদ্ধ শুরু হয় ২৬ মার্চ। তা কি আমার স্বামী জানে না! যাই হোক জীবনের প্রথম বিয়ের পরেও মরতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। পরে ভাসুরকে মেরেছিলাম। আজ আবার মরব ? না মরব না। নয় বছর বয়সে পরিবারের সবাই মারা যায়। ঘাত-প্রতিঘাতে বেড়ে উঠি। ভাসুরকে হত্যা করেও ভাগ্যগুণে আল্লাহ আমাকে ফাঁসি থেকে বাঁচিয়ে দেন। সতীনের ঘরে দ্বিতীয় বিয়ে করব না বলে পালিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। বিয়ে করতে হলো। বিয়ের পর এক এক করে চারটি মেয়ে ও এক ছেলে নানা রোগ শোকে অল্প বয়সেই মারা গেল। হাজারবার বাবা ডেকেও পাকিস্তানি জানোয়ার বাহিনীর হাত থেকে নিজকে রক্ষা করতে পারিনি। হানাদার বাহিনী অজ্ঞান অবস্থায় মেহেরপুরের পরিত্যক্ত জায়গায় ফেলে দেওয়ার পরেও প্রাণে বেঁচে যাই। এই সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা, আর আমার ভাগ্য। যতদিন বাঁচব,এই ভাগ্যকে মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। স্বামী থেকেও শরণার্থী শিবিরে এক দিনের জন্যও মেয়েটাকে দেখতে আসেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে আসি। দুই মেয়ে আর সতীনকে নিয়ে শুরু করি সংগ্রাম। মানুষের কাছে শুনি আপনার স্বামী এখানে-ওখানে আছে। কিন্তু কোথায়ও খুঁজে পাইনি। নষ্টা-ভ্রষ্টা অপবাদ দিয়ে এই যে চলে গেল আর আসল না। এখনো মনে মনে খুঁজি,এই বুঝি আমার স্বামী আসছে,আমাকে ডাকছে। কিন্তু না, দেশ স্বাধীনের পর ঝিনাইদহ আজিজ হাসপাতালে ধোয়ামোছার চাকরি নিয়ে জীবন সংগ্রাম আবার শুরু করি।
বীরাঙ্গনা জয়গুন নেছা দু:খ করে বলেন, বাবারে আমার এখানে অপরাধ কি ছিল জানি না। যখন শরণার্থী শিবিরে ছিলাম তখন থেকে আজও আমাকে মানুষ ৭১ সালের ঘটনা নিয়ে খারাপ বলে,সমালোচনা করে। এখনো আমার মেয়ে,মেয়ের জামাই ও নাতি-নাতনীদের আমার জন্য অপমান শুনতে হয়। বর্তমান সরকার আমাকে বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এই সম্মানের বিনিময়েও যদি সমাজের অপবাদ থেকে বাঁচতে পারতাম তাহলে মরে গিয়েও আমি শান্তি পেতাম।
বীরাঙ্গনার কাহিনি ঝিনাইদহে বিভিন্ন জায়গায় বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়ার পর বলেছি। কিন্তু আমার জীবন কাহিনি কাউকে বলা হয়নি। শেষ জীবনে এসে আপনাকে বললাম। কথাগুলো বলে মনটা অনেক হালকা লাগছে।
এই জীবনে আপনার আর চাওয়া কি জানতে চাইলে জয়গুন নেছা বলেন, চাওয়া আমার একটাই।মৃত্যুর আগে একবারের জন্যও যদি স্বামীকে দেখতে পেতাম। যদি বলতে পারতাম আমার জাহিদা সুলতানা তোমার মেয়ে। আমি কোন পাপ করিনি। পাপ করলে পাকিস্তানি আর্মি আর রাজাকার হাতেম করেছে। তুমি আমাকে ক্ষমা করো গো- এই কথা বলেই কান্না শুরু করল জয়গুন নেছা।
জয়গুন নেছার কান্নাকে অবলম্বন করেই ঝিনাইদহ ত্যাগ করতে হলো এই প্রতিবেদককে।