সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০


সর্বস্ব হারিয়ে কাঁদছেন কোরবানপুরের মানুষ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
02.11.2020

হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আগুনের ঘটনায় তিনটি মামলা,আসামি সহস্রাধিক

মাহফুজ নান্টু,তৈয়বুর রহমান সোহেল,এন এ মুরাদ।।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কোরবানপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আগুন ও হামলার ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় এক হাজার ১৩জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় নামোল্লেখ করা হয়েছে ৩৬২ জনের। অজ্ঞাত আসামি ৬৫০জন। হামলার ঘটনায় কোরবানপুর গ্রামে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান তালুকদার।
সোমবার এ মামলাগুলো করেন স্থানীয় কোরবানপুর গ্রামের সন্দীপ, লিটন ও পূর্ব ধইর ইউপি চেয়ারম্যান বন কুমার শিব। রবিবার অগ্নিসংযোগের ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ। এদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়,‘সর্বস্ব হারিয়ে মানুষ আহাজারি করছেন। চারপাশে পোড়া ও ভাঙ্গা ঘরের আসবাব। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে থালা-বাসন। অনেকে চোখের পানি ফেলে স্বজনদের ফোনে ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্থ ঝর্না শিব বলেন,‘রোববার বিকালে হঠাৎ করে একদল মানুষ বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারা অগ্নিসংযোগ করে। ঘর ভাংচুর এবং মালামাল লুট করে। এসময় আমরা প্রাণভয়ে পালিয়ে যাই। পরে বাড়ি ফিরে এসে দেখি আমাদের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।’
পূর্ব ধইর পূর্ব ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বন কুমার শিব বলেন, ‘শনিবার বিকেলে ফেসবুকে পোস্ট নিয়ে একটি সালিশ হয়। এসময় হঠাৎ করেই এমন হামলা চালানো হয়। আমার বাড়িসহ আশেপাশের বাড়ি ও মন্দিরে হামলা,অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ’
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন,‘১৪৪ধারা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। তিন প্লাটুন বিজিবি,দুই প্লাটুন র‌্যাব ও বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষতি নিরুপণ করে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা করা হবে।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশসহ গোটা দুনিয়া বিক্ষুব্ধ অবস্থায় রয়েছে। আর এ ঘটনার সুযোগ নিয়েছে কিছু ব্যক্তি। আমরা ধারণা করছি, স্থানীয় দ্বন্দ্বের জেরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা দায়ীদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ কাজ করবো।’
সংসদ সদস্য ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন বলেন, ‘এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনা। মুরাদনগরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সবসময় ছিল। সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা যারা করেছে, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পুলিশ তদন্ত করছে, আমরাও রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’
উল্লেখ্য-শনিবার মহানবীকে (সা.) ব্যঙ্গ করে কোরবানপুর ও আন্দিকুটের দুইজন ব্যক্তি স্ট্যাটাস দিয়েছেন-এমন ঘটনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে কোরবানপুরে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওইদিন বিকেলে বাঙ্গরা বাজার থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন কোরবানপুরের ধনমিয়া নামে এক ইউপি সদস্য। এ ঘটনায় রাতেই দুই অভিযুক্ত কোরবানপুর গ্রামের রায় মোহন দেবনাথের ছেলে স্থানীয় ব্লু বার্ড কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক শংকর দেবনাথ ও আন্দিকুট গ্রামের জীবন ভৌমিকের ছেলে অনিক ভৌমিককে আটক করে। রবিবার সকালে তাদের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। রবিবার বিকেল ৩টায় কোরবানপুর বাজারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মসজিদের ইমামদের নিয়ে এ ঘটনার সুষ্ঠু সমাধানে মিটিং শুরু হয়। মিটিং চলাকালীন সময়েই শিক্ষক শংকর দেবনাথের বাড়িতে আগুন দেয় একদল লোক। এসময় তার বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। পুড়ে ছাই হয়ে যায় বাড়ির সমস্ত মালামাল। এরপর কোরবানপুরের সাবেক চেয়ারম্যান বেণু ভূষণ শিবের স্মরণে তৈরি ভোজনালয়, বেণু ভূষণের ভাস্কর্য, মনসা মন্দির,মণিলালের বাড়ি, সূধন শিবের বাড়ি ও চেয়ারম্যান বন কুমার শিবের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে তারা। এসময় বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা লুট করা হয় বলে দাবি করেছে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।