বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে-৪৬, মুসলমানেরা সাহায্য না করলে ৭১ সালে সপরিবারে মারা যেতাম- অলক কুমার পোদ্দার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
02.11.2020

শরণার্থী অলক কুমার পোদ্দারের সাথে কথা বলছেন প্রতিবেদক                                                                                ছবি: জাহেরা আক্তার

শাহাজাদা এমরান, কুষ্টিয়া থেকে ফিরে।।
আমাদের পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া এলাকা যুদ্ধের সময় প্রধান রাজাকার ছিল আমিন উদ্দিন খান ওরফে টিক্কা খান। এই কুখ্যাত টিক্কাখানের অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা যে কত ভয়াবহ ছিল তা প্রকাশ করতে পারতাম না। নারী ধর্ষণ থেকে শুরু করে এমন কোন হেন অপরাধ নেই যে টিক্কা খান,তার ছেলেরা ও তার বাহিনী করেনি। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগিতায় সে সময়ে আমাদের এলাকায় টিক্কাখান বলা যায়, এক অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। সে সময় যদি আমাদের প্রতিবেশী মুসলমানরা আমাদের সহযোগিতা না করতো , ভারতে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে না দিত, তাহলে আমরা সপরিবারে রাজাকার টিক্কাখানের বলি হতাম। স্থানীয় মুসলমানরা সেদিন আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেনি। দেখেছে মানুষ হিসেবে। একথাগুলো বলেছেন শরণার্থী অলক কুমার পোদ্দার। গত ১৮ অক্টোবর কুষ্টিয়ার চৌড়হাঁসে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন তিনি। এ সময় সাথে ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো.আবদুস সেলিম রেজা।
অলক কুমার পোদ্দার। পিতা রঞ্জিত কুমার পোদ্দার ও মাতা আরতি পোদ্দার। ১৯৬৩ সালের ৫ এপ্রিল পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার সাত বাড়িয়া ইউনিয়নের আড়োয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাতার ছয় ছেলের মধ্যে তিনি চতুর্থ। বর্তমানে কুষ্টিয়া পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে আপনার এলাকার অবস্থা কেমন ছিল জানতে চাইলে শরণার্থী অলক কুমার পোদ্দার বলেন, আমাদের এলাকায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি ছিল খুব জমজমাট। তখন আমরা ছোট হলেও সব কিছু বুঝতাম। এলাকার ছেলেদের সাথে গ্রামে মিছিলও করেছি। আমাদের এলাকাটি একেবারে গ্রাম হলেও রাজনৈতিক সচেতন ছিল। পাবনা শহরের সব খবরাখবরই আমরা পেতাম। আমার মনে আছে ২০ থেকে ২৪ মার্চ হবে সম্ভবত সময়টা। আমাদের সাতবাড়িয়া হাই স্কুল মাঠে ছাত্রলীগের একটি বড় সভা হয়। সে সভায় সামছুল হক নামের এক ছাত্র নেতা খুব সুন্দর করে বক্তব্য রাখেন। সবাইকে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার আহ্বান জানান। এই সভার পর থেকেই এলাকার উঠতি বয়সের যুবকদের মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করেছি। ২৬ মার্চ সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি, দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। গত রাতে ঢাকায় গুলাগুলিতে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। যে যেভাবে পারছে, ঢাকা ছাড়ছে । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে গেছে ইত্যাদি নানা কথা মানুষের কাছে শুনছি। সবার মাঝেই এক ধরনের আতংক কাজ করছে। ২৭ তারিখের দিকে কে যেন এলাকায় ছড়িয়ে দিল, পাকিস্তান আর্মি হিন্দুদের পছন্দ করে না। তারা যেন সাবধান থাকে। এই প্রচারে হিন্দু সম্পদায়ের মধ্যে চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেল। হঠাৎ করে লক্ষ করলাম,আমাদের এলাকার আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা যেন কোথায় চলে গেল। এপ্রিলের শেষ দিকে একদিন ভোরে পাবনা শহর থেকে কয়েক গাড়ি সেনা সদস্য এসে আমাদের সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আক্রমণ করে। বিভিন্ন গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এ দিন এ গ্রামগুলোতে অনেক মানুষ হতাহত হয়। এত দিন এলাকার মানুষ আমিন উদ্দিন খান ওরফে টিক্কা খানের নাম না শুনলেও হঠাৎ করে তার নাম নাম ডাক এলাকায় বেড়ে গেল। তিনি যেভাবে বলেন যেখানে আক্রমণ করতে বলেন পাকিস্তান আর্মি নাকি তাই করে। গ্রামের সুন্দরী মেয়েদের পাকিস্তান আর্মির কাছে তিনি সাপ্লাই দেন। গৃহস্থের গোলার চাল আর হালের গরু তিনি লুট করে নিয়ে পাঞ্জাবিদের কাছে পৌঁছে দিতেন। আর এ সুযোগে তিনি এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজ করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বসেন। এই আক্রমনের পর আমরা স্থানীয় মুসলমানদের পরামর্শে আমাদের আড়োয়াপাড়া গ্রাম ছেড়ে পাশের গ্রাম সাহাপাড়া চলে যাই। আমরা বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে টিক্কা রাজাকারের পরামর্শে পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাড়িসহ আড়োয়াপাড়া গ্রামে হামলা চালান। এই হামলায় আমাদের ঘরের মাটি ছাড়া যা ছিল সব লুট করে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় আগুন দিয়ে বাাড়িটি পুড়ে দিয়ে যায়। সাহাপাড়া গ্রামে গিয়েও শুনি এখানে আক্রমণ হতে পারে। এখানকার মুসলমানরা বলা যায় আমাদের বুকে আগলে রাখেন। এভাবে অক্টাবর পর্যন্ত আমরা ২০/২৫ বার আজ এ বাড়ি তো কাল ঐ বাড়ি এমন করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াই। এক পর্যায়ে বাবা বললেন যে, না আর পারব না। বাঁচতে হলে ওপারেই যেতে হবে।
আমাদের এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়গুলোকে সে সময় যারা অকৃপণভাবে সাহায্য করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাতবাড়িয়া কলেজের অধ্যাপক ফজলুল হকসহ অন্যান্যরা।
সে সময় সীমান্ত পার করে দেওয়ার জন্য দালালদের এক মৌসুমি ব্যবসা শুরু হল। হিন্দু ও অসহায় মুসলমানদের রাজাকার ও পাকিস্তানিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পার করে দেওয়ার জন্য তারা টাকা নিত। আমাদের পরিবারের জন্যও এক মুসলিম পরিবার এক দালাল ঠিক করে দিল। বর্তমান সময়ের আদম ব্যবসায়ীদের মতন। দালালের কথা অনুযায়ী আমরা পাবনার নিশ্চিন্তপুর থেকে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার সেন গ্রামের দালালের বাড়িতে যাই। এই গ্রামে আসতে আমাদের উত্তাল পদ্মা নদী পার হতে হয়েছে। ঐ গ্রামে গিয়ে দেখি আমাদের মত আরো ৮০/৯০ জন অসহায় মানুষ আছেন, যারা এই দালালের মাধ্যমে ভারতে যাবেন। রাত ১০ টার পর আমরা দালালের নির্দেশিত পথ অনুযায়ী চলতে লাগলাম। দালাল আমাদের শিকারপুর সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে বললেন, এবার আপনারা বর্ডার পার হন কোন সমস্যা নেই।
শিকারপুর সীমান্ত পাড় হয়েই আমরা ভারতের আম বাগানে যাই। এখান থেকে আমরা শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্তি হয়ে রেশন কার্ড নিয়ে নদীয়া জেলার নবদীপ নামক গ্রামে আমাদের এক আত্মীয় আছে সেখানে যাই। এই আত্মীয়ের বাড়িতে এক মাস থাকার পর আমরা পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা এই ভাড়া বাসায় থাকি। মাঝে মাঝে আত্মীয়রাও আমাদের বাসা ভাড়া দিত।
শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে অলক কুমার পোদ্দার বলেন, শরণার্থী জীবনের অপর নাম কষ্ট। চোখের সামনে রোহিঙ্গাদের দিকে তাকান। তারা একটা নির্দিষ্ট সীমানায় বন্দী আছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন একজন আরেকজনকে রোহিঙ্গা বলে গালি দেয়। ঠিক ঐখানেও আমরা এমনটা লক্ষ্য করেছি। আমার বাবা ও ভাইয়েরা হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে ঐখানে টাকা রোজগার করেছে। কারণ,রেশম যা দিত তা আমাদের পরিবারের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই রেশমের মাল বাবা বাইরে স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে এই টাকাটা দিয়ে বাসা ভাড়া দিত আর তারা নানা রকম কাজ করে সংসাার চালাত।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের ১৫/২০ দিন পর দেশে আসি। দেশে এসে কোন কিছু না পেয়ে আমরা অবাক হইনি। কারণ,আমরা দেশে থাকতেই তো আমাদের বাড়ি লুট হয়ে গিয়েছিল। তবে বাড়ি এসে দেখলাম, পাশের বাড়ির এক লোক আমাদের ঘরের ভিটে ছাগল দিয়ে রাখছে ঘাস খাওয়ার জন্য। এই দৃশ্যটি দেখে চোখের পানি চলে এল। বাবা আবার সব কিছু নতুন করে শুরু করলেন।
সরকারের কাছে কোন চাওয়া আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন সরকার আমাদের বীর শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিক এটাই আমাদের চাওয়া। কারণ এই দেশের এই স্বাধীনতার জন্য আমাদেরও রয়েছে অনেক অবদান।