শুক্রবার ২৭ নভেম্বর ২০২০


‘অনিরাপদ’ হয়ে উঠছে নিরাপদ রেলযাত্রা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
06.11.2020

আবদুর রহমান।।
দিন দিন ‘অনিরাপদ’ হয়ে উঠেছে নিরাপদ রেলযাত্রা। দুর্বৃত্তরা প্রায় সময় চলন্ত ট্রেনে পাথর মেরে নিরাপদ রেলযাত্রাকে অনিরাপদ করে তুলছে। এসব ঘটনায় ট্রেনের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনও বিপন্ন হচ্ছে। এসব ঘটনা বন্ধে রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। দেশের অন্যান্য রুটের তুলনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটছে। এতে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে চলাচলকারী যাত্রীরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন।
সর্বশেষ কুমিল্লাতে গত ২৯ অক্টোবর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথের বিরতিহীন আন্ত:নগর ট্রেন সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ট্রেনটির একটি জানালার কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
লাকসাম রেলওয়ে জংশন সূত্র জানায়, ওইদিন রাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রেনটি লাকসাম রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করার তিন-চার মিনিট পর চলন্ত ট্রেনটিতে পাথর ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এতে ট্রেনের ‘জ’ বগির মাঝামাঝি একটি জানলার কাচ ভেঙে যায়। পরে আখাউড়ায় অনির্ধারিত যাত্রাবিরতি দিয়ে কাচের বদলে হার্ডবোর্ড লাগানো হয় জানালায়। তবে সৌভাগ্যবশত এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কুমিল¬ায় চলন্ত অবস্থায় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন যাত্রী গুরুত্বর আহত হন। ওইদিন বিকেল ৩টায় সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ট্রেনটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে দিকে কুমিল¬ার আদর্শ সদর উপজেলার গোমতি নদীর ব্রিজ এলাকা পার হওয়ার আগ মূহুর্তে হঠাৎ দুর্বৃত্তরা ট্রেনের জানালা লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি পাথর নিক্ষেপ করে। এতে দু’টি জানালার কাঁচ ভেঙে চারজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে যাত্রী আবদুর রহিম ও নাহিদ হোসাইনের মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। সে সময় ওই বগিতেই ছিলেন কয়েকজন চিকিৎসক। পরে তারা দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে আহতদের রক্তপাত বন্ধ করেন। এছাড়া চলতি বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লা অংশে আরো কয়েকটি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে সূত্র জানায়, যুগ যুগ ধরেই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। তবে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চলন্ত ট্রেনে পাথরের আঘাতে প্রীতি দাশ নামে এক নারী প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়। এরপর থেকে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। গত কয়েক বছরে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে বেশ কয়েকটি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে ট্রেনের দরজা-জানালা ভেঙেছে, আহত হয়েছেন বিপুসংখ্যক রেলযাত্রী। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনায় জড়িত দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বখাটে ও কিশোর বয়সী ছেলেরাই এই পাথর নিক্ষেপে জড়িত বলে রেলওয়ে পুলিশ বলছে। আর বেশিরভাগ ঘটনাগুলো ঘটছে রাতের বেলায়। যার কারণে সঠিক ঘটনাস্থলও সনাক্ত করা যায় না। কারণ চলন্ত ট্রেন থামলেও এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে থামে। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনায় রেলওয়ে থানায় মামলা হয় না। এতে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা।
আলী আকবর নামে কুমিল্লার এক রেলযাত্রী বলেন, রেল সকলের কাছে নিরাপদ বাহন হিসেবে পরিচিত। তবে বর্তমানে রাতের বেলায় রেলপথে চলাচলও অনিরাপদ মনে হয়। প্রায় সময় চলন্ত ট্রেনে পাথর মারছে দুর্বৃত্তরা। বিশেষ করে জানালার পাশে বসতে বেশি ভয় লাগে।
আবুল কালাম আজাদ নামে আরেকজন রেলযাত্রী বলেন, প্রায় সময় শুনি চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের খবর। তবে যখন ঘটনা ঘটে তখনই বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও বিষয়টি ভুলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনায় মামলা হয় না। মামলা হলে পুলিশ তদন্তের স্বার্থে হলেও বিষয়টি নিয়ে তৎপর থাকতো।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.নাজিম উদ্দিন বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে আমরা ব্যাপক কর্মসূচী পালন করেছি। গত কয়েকদিন আগেও কসবা থেকে লাকসাম পর্যন্ত পিকআপযোগে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়েছি। এছাড়া প্রায় সভা-সমাবেশ ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করছি এবং এর ভয়াবহতা বুঝাচ্ছি। এরপরও চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। আমরা এসব ঘটনা বন্ধে কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক ঘটনাস্থল নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই সঠিকভাবে বব্যস্থাও নেওয়া সম্ভব হয় না।
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, পাথর নিক্ষেপ বন্ধে আমাদের জিআরপি পুলিশের পাশাপাশি রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (এনআরবি) সদস্যরাও দিনরাত কাজ করছে। কিন্তু যারা এগুলো করছেন, তারা এর ভয়াবহতা বুজতে পারছেন না অথবা নাশকতার জন্য এগুলো করছেন।
তিনি আরও বলেন, পাথর নিক্ষেপ বন্ধে গত বেশ কয়েক বছর ধরেই জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছি আমরা। যেসব এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে, সেসব এলাকার জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষকসহ সকল শ্রণির মানুষকে নিয়ে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। এমনকি মসজিদেও এনিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং প্রতিটি এলাকায় লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। তবে অতীতের তুলনায় কিছুটা কমলেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বন্ধ হয়নি। এজন্য সকলকে সচেতন হবার আহবান জানান তিনি।