সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০


ডাকাতিয়া দখলে সংকটে দেড় হাজার জেলে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.11.2020

রুবেল মজুমদার।।
ডাকাতিয়া নদী। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও নাঙ্গলকোট উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে। নদীটিতে চিওড়া ও কনকাপৈত ইউনিয়নের চিলপাড়া,আগুনশাইল,বামপাড়া বৈলপুর, কনকাপৈত ইউনিয়েনের মরকটা, তারাশাইল, জাগজুর,বুদ্দিন, পান্নারা, আগুনশাল, চিওড়া ইউনিয়নের চিলপাড়া, মলিয়ারা, গুণবতী ইউনিয়েনরে পরিকোটসহ নাঙ্গলকোট উপজেলার উপজেলার বাঙ্গড্ডা, রায়কোট উত্তর, দক্ষিণ, মৌকরা, ঢালুয়া, বক্সগঞ্জ অতিক্রম করে। এর পাড়ে শত বছরে প্রাচীন জেলেপাড়া চান্দেরবাগ। এই অংশে অবৈধ বাঁধ আর স্থানীয় অসাধু চক্রের নদী শাসনে জীবন-জীবিকা হুমকি মুখে পড়েছে প্রায় দেড় হাজার পেশাদার জেলের জীবন। নদীতে বাঁধ দিয়ে মৎস্য প্রকল্প নামে একাধিক সাইনবোর্ড ঝুলছে প্রায় দুই- তিন কিলোমিটার অংশ জুড়ে। সৃষ্টি হয়েছে ১০- ১২টি অবৈধ বাঁধ। প্রভাবশালীদের ভয়ে বিষয়টি মুখ খুলতে পারছেন না স্থানীয় জেলারা ।

সূত্রমতে,নাঙ্গলকোট উপজেলার ডাকাতিয়া নদীর অংশে উত্তর রায়কোট ইউনিয়নের শত বছরের প্রাচীনতম জেলে পল্লি চান্দেরবাগ এলাকা। পেনকালচার পদ্ধতিতে মাছ চাষ করার অজুহাতে প্রভাবশালীরা বছর পর বছর ডাকাতিয়া নদী দখল করে রেখেছে। সারা বছর মাছ শিকারের উপযোগী ডাকাতিয়া নদীর মাত্র কয়েকটি জলমহালের ১০ -১৫ একর জলাশয়ে পেনকালচার গড়ার অনুমতি নিলেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রভাবশা

লীরা দখল করে রেখেছে প্রায় শত শত একর জলমহাল। এই ডাকাতিয়ার প্রতিটি জলমহাল বাঁশ ও জাল দিয়ে ঘিরে কিছু মাছ ছাড়ার প্রহসন চালিয়ে সারা বছর মাছ ধরে রমরমা মৎস্য-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্র বাঁশ-জাল দিয়ে ঘেরা ডাকাতিয়ার বিভিন্ন অংশে স্থানীয় জেলেদের নৌকা নিয়ে ঢুকতে দেন না । এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন চান্দেরবাগের জেলেপল্লি প্রায় পাঁচশ জেলে পরিবার। জীবন বাঁচতে এই পেশা ছেড়ে কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন ডাকাতিয়া পাড়ে প্রভাবশালীদের বালু ও মাটি উত্তোলনে দৈনিক শ্রমিক হিসাবে। এই পল্লির কানু মিয়া,প্রেম কুমার,জাকির হোসেনের মতো ষাট পেরনো বৃদ্ধ জেলেদের জীবনে নেমে এসে চরম বিপর্যয়। করোনাকালীন সময় কোন দিন একবেলা খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। এই পল্লি দুই উপজেলার থেকে বিচ্ছিন্ন বলে পান না তেমন কোনো সরকা

রি সুযোগ সুবিধা।
বাবার হাত ধরে মাত্র দশ বছর বয়সে মাছ ধরতে নদীতে যাওয়া শুরু করেন চান্দেরবাগের প্রেম কুমার । ৪০ বছর ধরেই ডাকাতিয়া বুকে মাছ ধরছেন তিনি। সংসারে সুখের আশায় এখনও বৃদ্ধ বয়সে অবিরত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রেম কুমারের মতো কত জেলেই নদীতে ভেসে কাটান অধিকাংশ সময়। জীবনের একটা সময় মনে করেন জেলে পরিবারে জন্মই যেন অভিশাপ! সম্প্রতি করোনা আর ডাকাতিয়ার বুকে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বের কারণে আবার দুর্যোগের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে পল্লিজুড়ে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,নাঙ্গলকোট ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ডাকাতিয়া মাঝবর্তী চর এলাকায় চান্দেরবাগ সেই জেলে পাড়ার তেমন একটা অস্তিত্ব নেই বললে চলে। তাই অনেক জেলে মাছ ধরার বাপ-দাদার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছে। তেমনি একজন হলেন চান্দেরবাগ বাস্তিন্দা স্বপন মিয়া। দুইযুগের বেশি সময় ধুরে ডাকাতিয়াতে নৌকা দিয়ে মাছ ধরতেন,নদীতে এখন প্রভাবশালীদের মৎস্য খামার আর অবৈধ বাঁধের কারণে নৌকা নিয়ে নদীতে নামতে পারেন না। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকে আমরা ডাকাতিয়াতে নৌকা দিয়ে মাছ ধরতাম, কিন্তু স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীরা নদীতে বাঁশ ও জাল দিয়ে অবৈধভাবে ছোট ছোট বাঁধ সৃষ্টি করে মাছ চাষ করছে। এতে নদীতে এখন আর নৌকা চলার অবস্থা নেই। দুই উপজেলার মাঝবর্তী হাওয়া আমাদের কেউ সহযোগিতা করে না।
নাঙ্গলকোট উপজেলার উত্তর রায়কোট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলেপল্লির জন্য সম্প্রতি মাননীয় অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। নাঙ্গলকোট সাথে সংযোগের জন্য প্রায় ৬ কোটি ব্যয়ে একটি ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে। এই পল্লিতে একটি স্কুল নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জাল ও নারীদের কর্মসংস্থান জন্য আমরা সেলাই মেশিন দিয়েছি।
এই বিষয় নাঙ্গলকোট উপজেলার সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন ,ডাকাতিয়া নদীতে মাছ চাষের কোনো অনুমিত দিইনি। যারা অবৈধভাবে নদীতে প্রকল্পের নামে মৎস্য খামারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের নির্বাহী অফিসের সহযোগিতায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নাঙ্গলকোট উপজেলার নির্বাহী অফিসার লামইয়া সাইফুল বলেন, আমাদের এখানে এই ব্যাপারে অভিযোগ আসলে আমরা সাথে সাথে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। নদী খালে বাঁধ সৃষ্টি করে সরকারিভাবে কোনো অনুমতি দেওয়া হয় না। জেলে পল্লিতে আমরা সবসময় বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করি ।