শুক্রবার ২৭ নভেম্বর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » লালমাই পাহাড়ের বুকে বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহশালা


লালমাই পাহাড়ের বুকে বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহশালা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
18.11.2020

আবদুর রহমান ।।
উঁচু-নিচু পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় ইট বিছানো পথ। পথের দুই পাশে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সংগ্রহশালা। ইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটতেই একটু পরপরই দেখা মিলে, উদ্ভিদের পরিচিতি বোর্ডের। সেখানে রয়েছে উদ্ভিদের বিস্তারিত বর্ণনা। এখানে আছে বিলুপ্ত প্রায় বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ ঝাড়ও। কুমিল্লার পর্যটন নগরী খ্যাত কোটবাড়ি এলাকার লালমাই উদ্ভিদ উদ্যানে গেলে এমন নান্দনিক দৃশ্যই এখন চখে পড়ে ।
এই উদ্ভিদ উদ্যানের ইটের রাস্তায় সবুজের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে শরীরের সব ক্লান্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। আর পাখির কিচিরমিচির শব্দতো রয়েছেই। সবুজ প্রকৃতি আর পাখির শব্দ শুনে বাড়ি ফিরতে মন চায় না ভ্রমণপিপাসুর।
কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগ সূত্র জানায়, কুমিল্লা নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি ময়নামতি জাদুঘরের কাছে সালমানপুর নামক স্থানে প্রায় ১৭ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে উদ্যানটি। এখানে রয়েছে কয়েক শ’ প্রজাতির উদ্ভিদ। যার অন্তত ৯০ শতাংশ বিপন্ন ও দ্রুষ্প্রাপ্য প্রজাতির উদ্ভিদ। ভবিষ্যতে এ উদ্যানটির বিস্তৃতি আরও বাড়ানো হবে। বর্তমান উদ্যানের নিকটবর্তী বনবিভাগের ৩০ একরের মতো প্রাকৃতিক শালবাগান রয়েছে। মাঝে আরও প্রায় ৩০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হলে লালমাই উদ্ভিদ উদ্যানটি অনেক সমৃদ্ধ হবে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বর্তমান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে এমন বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সামাজিক বন বিভাগ। ঢাকার মিরপুর ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পর লালমাই উদ্ভিদ উদ্যানটি দেশের তৃতীয় বিরল উদ্ভিদ উদ্যান। ২০১৫ সালে এটির কাজ শুরু হয়ে চলতি বছরের শুরুতে শেষ হয়। এ উদ্যানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ সংরক্ষণ, বন্য প্রাণীর নির্ভয় আবাসস্থল তৈরি, শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়া বিনোদনের ব্যবস্থা ও স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বর্তমানে উদ্যানটিতে বিলুপ্তপ্রায় বিরল উদ্ভিদ রাধাচূড়া, নাগেশ্বর, আগার, নাগলিঙ্গম, কাঞ্চন, অশ্বথ, চন্দন, রক্তচন্দন, চালমুগরা, লোহাকাঠ, চাপালিশ, ধূপ, বাবলা, হরিতকি, বহেরা, হিজল, কনক, তমাল, অশোক, সিভিট, উড়ি আম, বন পেয়ারা, অর্জুন, মহুয়া, তেলশুর, পুঁটিজাম, বাঁশপাতা, কুম্ভি, পিতরাজ, পারুল, জারুল, চম্পা, টগর, বেলি, চিকরাশি, হরিয়ান, লটকন, ফেন্স, বোটলব্রাশ, বাসক, রঙ্গন, করমচা, সোনালু, বট ও কৃষ্ণচূড়ার সমাহার রয়েছে। এ উদ্ভিদ উদ্যানে আরও রয়েছে ক্যাকটাস হাউস, অর্কিড হাউস, বিভিন্ন ফুলের বাগান, বিরল উদ্ভিদ বাগান, বন্যপ্রাণীর জন্য জলাশয়, বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস। এখানে দর্শনার্থীদের বসার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কিছু আরসিসি বেঞ্চ, ব্যাঙের ছাতা সদৃশ্য বিশ্রামাগার। নির্মাণ করা হয়েছে পৃথক শৌচাগার।
এদিকে, গত ৭ নভেম্বর দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় বিরল উদ্ভিদের এই উদ্যানটি। ওইদিন উদ্যানটির উদ্বোধন করেন বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক মো.আমীর হোসেন চৌধুরী। ওই সময়ে তিনি বলেন, এখানে দেশের প্রথম ফরেস্ট মিউজিয়াম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এটিকে জাতীয় মানের একটি উদ্যান হিসেবে গড়ে তুলতে মন্ত্রণালয় একটি মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করেছে। এ উদ্যান সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে পুরো দেশবাসী বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করতে পারবেন এখানে। এই উদ্যানের ৯০ ভাগ উদ্ভিদই বিরল এবং বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির। এসব উদ্ভিদ আগামী প্রজন্মের জন্য কাজে আসবে। আর কুমিল্লাবাসীর ফুসফুস হিসেবে কাজ করবে এই উদ্যানটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন প্রহরী হারুন অর রশিদ উদ্যানটির মূল ফটকের একটি কক্ষে বসে প্রবেশের টিকিট বিক্রি করছেন। আর বাগান মালি মানিক মিয়া উদ্যানের পরিচর্যা করছেন। তবে এখনো দর্শনার্থীদের পদচারণা বাড়েনি উদ্যানটিতে।
টিকেট বিক্রেতা বন প্রহরী হারুন অর রশিদ বলেন, উদ্যানে প্রবেশ করতে টিকেটের হার নির্ধারণ করা হয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের জন্য টিকিট ৫ টাকা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ টাকা এবং বিদেশিদের জন্য ৪০০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এ উদ্যান।
এখানে ঘুরতে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, এখানে যেসব গাছ আছে, তা এখন খুব একটা দেখা যায় না। গাছগুলো আসলেই বিরল। এই উদ্যানটি বর্তমান প্রজন্মকে ভুলতে বসা অনেক প্রজাতির গাছকে পরিচিত করে তুলবে।
কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা কাজী মো.নুরুল করিম বলেন, পরিপাটি করে গড়ে তোলা হয়েছে লালমাই উদ্ভিদ উদ্যানটি। এখানে রয়েছে বসে অবসর কাটানোর সুযোগ। আর এ উদ্যান নতুন প্রজন্মকে বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ সম্পর্কে ধারণা দেবে। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে এটির আয়তন আরও বাড়ানোর জন্য আমরা অধিদপ্তরে আবেদন করেছি। ময়নামতি জাদুঘরের মতো এখানে ফরেস্ট মিউজিয়াম করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আবেদনে।