বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০


ভারতীয়রা আমাদের জয় বাংলা বলে গালি দিতো- শরণার্থীদের খোঁজে-৫৬


আমাদের কুমিল্লা .কম :
18.11.2020

শাহাজাদা এমরান,কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে।।
এক এক করে গ্রামের সকল আত্মীয়স্বজন যখন নিজের এবং পরিবারের জান এবং মাল রক্ষার্থে ভারতে চলে গেল, তখন অবশিষ্ট ছিল শুধু আমাদের পরিবার। আমরা যাব কি যাব না এ নিয়ে আমার এবং স্ত্রীর মধ্যে কিছুটা দ্বন্দ্ব দেখা দিল। স্ত্রী চাচ্ছিল দ্রুত চলে যেতে আর আমি চাচ্ছি দেখি না দেশের অবস্থা কিছুটা উন্নত হয় কিনা। কিন্তু না। জুন মাসের দিকে যুদ্ধ আরো তীব্র আকার ধারণ করল। তখন পর্যন্ত গ্রামে কেউ আমাদের ডির্স্টাব করেনি। স্থানীয় প্রভাবশালী মুসলমানেরা বলেছে তুমি থাকলে থাকতে পার । আশা করি তোমার কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু জুন মাসের মধ্য ভাগে ভয়ে ভারত চলে যাই। সেখানে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে যা পাইতাম খাদ্য সামগ্রী তা দিয়ে তিন বেলা চলত না। তাই ওইখানকার গৃহস্থের জমিতে কৃষি কাজ করে জীবন ধারণ করেছি। কৃষি কাজ করতে গিয়ে যদি পাশের লোকের সাথে কোন কারণে কথা বার্তায় অমিল হতো, তাহলে সাথে সাথে বলত,এই ব্যাটা জয় বাংলা।বা কোন ডাক যদি প্রথমবার না শুনতাম তখন বলত, এই জয় বাংলা এ দিকে আস। অর্থাৎ যে কোন ত্রুটির জন্যই জয় বাংলা বলে গালি দেওয়াটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। একদিন আমি রাগ করে বললাম,তোমাদের সাথে কাজ করব না। এই জয় বাংলা নিয়ে আমাদের সাথে পাকিস্তানিদের আজ যুদ্ধ হচ্ছে। তোমরা আমাকে অন্য গালি দেও। কিন্তু তাচ্ছিল্যভাবে জয় বাংলা বলতে পারবা না। বললে কাল থেকে তোমাদের সাথে আর কাজ করব না। এভাবেই সেদিন নিজের আত্মমর্যাদার চেতনা ভারতীয় কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন রমেশ চন্দ্র রায়। গত ৩ ডিসেম্বর রাতে কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ সাহেবের বাসভবনের নিচ তলায় এই প্রতিবেদকের সাথে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
রমেশ চন্দ্র রায়। পিতা রবিরাম চন্দ্র রায় এবং মাতা ছেয়াময়ী রায় । দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশের শাসনামলে কুড়িগ্রাম জেলার রাজার হাট উপজেলার শ্রীনাই ইউনিয়নের মহিধরখণ্ড ক্ষেত্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
দেশে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি ছিলেন ৩৫ বছরের টকবগে যুবক। দুই সন্তানের জনক এই রমেশ চন্দ্র রায় বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যূব্জ হলেও কথা বলতে পারেন স্পষ্ট। তিনি ব্রিটিশ,পাকিস্তান ও বর্তমানে বাংলাদেশ শাসনামলও দেখছেন। প্রতিটি শাসনামল নিয়েই রয়েছে তার আলাদা আলাদা অবজারভেশন। কোন আমল আপনার কাছে ভাল লেগেছে জানতে চাইলে দেশের এই প্রবীণ নাগরিক কুটনীতিক উত্তর দিয়ে বলেন,দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ দেখেছি,পাকিস্তান আন্দোলন দেখেছি,বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছি এমনকি ১৯৯০ সালে আমাদের এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও দেখেছি। সুৃতরাং বাবারে যায় দিন ভালই যায়।
শরণার্থী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মে মাসের মধ্যে আমাদের মহিধরখণ্ডক্ষেত্র গ্রামের সকল হিন্দু পরিবার ভারতে চলে গেছে। কিন্তু আমার কেন জানি যেতে মন সায় দিচ্ছিল না। এটা নিয়ে স্ত্রীর সাথে আমার প্রায়ই মান অভিমান চলত। সে খুব ভয় পেত। কিন্ত আমার যেতে মায়া লাগত। বাপ দাদার ভিটে মাটি ছেড়ে কিভাবে যাই। আর এটাও সত্য যে, আমাদের এলাকার হিন্দু পরিবারগুলো ভারতে যত না গেছে অত্যাচারিত হয়ে তার চেয়ে বেশি গেছে ভয়ে । আর এই ভয়ে থেকেই জুন মাসে কোন একদিন সকাল ৮টায় স্ত্রী,দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হই ভারতের উদ্দেশ্যে। আমাদের ফুলবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ধরলা নদী পাড় হয়ে বড় ভিটা যাই। বড় ভিটা থেকে ভারতের কুরশা যাই। সেখানে আমাদের এক পরিচিতের বাড়িতে গিয়ে উঠি। ৪/৫ দিন সেই বাড়িতে থাকি। এই এলাকার সব শরণার্থী শিবির পরিপূর্ণ। কোথায়ও জায়গা খালি নেই থাকার জন্য। পরে সেখানকার আবু তারা স্কুলে আমাদেরসহ প্রায় ৫০টি পরিবারকে আশ্রয় দেওয়া হয়। এই স্কুলটিকে পরবর্তীতে আশ্রয়কেন্দ্রের মর্যাদা দিয়ে আমাদের রেশমকার্ড দেওয়া হয়। এখানে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলাম। শরণার্থী শিবিরে আমাদের যে চাল ডাল দেওয়া হতো তা আমাদের তিন বেলার জন্য মোটেও যথেষ্ট ছিল না। তাই কিছুদিন যাওয়ার পর একটি গ্রামে গিয়ে দেখি কৃষকরা জমিতে কাজ করতেছে। আমি বললাম,আমি কৃষির সব কাজ পারি। তখন ওই জমির মালিক সাথে সাথে বলল, কাজে লেগে যাও। তখন কি ফসলের কাজ করছিলাম এখন মনে নেই। তবে এতটুকু মনে আছে জমির ঘাস পরিস্কার করছিলাম। সেই থেকে দেশে আসার আগ পর্যন্ত ওই গ্রামের বিভিন্ন মহাজনের জমিতে কাজ করেছি। কিন্তু খারাপ লাগত তখন যখন কিছু হলেই আমাকে জয় বাংলা বলে গালি দিত। কোন ত্রুটি হলেই বলত,আরে ব্যাটা জয় বাংলা কিছু পারে না।বা বলত, এই জয় বাংলা এদিকে আস বা ওই এই জয় বাংলা ওই দিকে যা। অর্থাৎ আমার নাম ধরে না ডেকে উত্তেজিত করার জন্য জয় বাংলা ডাকত, যা আমার আত্মসম্মানবোধে আঘাত লাগত। কারণ,আমি অল্প পড়া লেখা করলেও এটা বুঝি, জয় বাংলা আমাদের দেশের স্লোগান। সুতরাং জয় বাংলা কে অপমান করা যাবে না।
ষোলো ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে দেখি চর্তুদিকে গুলির আওয়াজ আসছে আর আতপবাজি চলছে। পাশের বড় শরণার্থী শিবির থেকে শত শত মানুষ বেরিয়ে এসে স্লোগান দিচ্ছে,বাংলাদেশ জিন্দাবাদ,জয় বাংলা। আমরা স্বাধীন ইত্যাদি।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯ ডিসেম্বরই আমরা দেশে চলে আসি। আমাদের বাড়িঘর যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম সেভাবেই আছে শুধু ভিতরের কিছু আসবাবপত্রগুলো কে বা করা নিয়ে গেছে। আর দীর্ঘদিন না থাকায় বাড়ি ঘরের অবস্থা যেমন হয় ঠিক তেমনি হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে আবার জীবন যুদ্ধে নেমে পড়ি।
তার দাবি,সরকার যেন তাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।