শুক্রবার ২৭ নভেম্বর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় » চোখের সামনে পেট্রোল দিয়ে বাড়ি ঘর জালিয়ে দেয়-গঙ্গা বালা, শরণার্থীদের খোঁজে-৬০


চোখের সামনে পেট্রোল দিয়ে বাড়ি ঘর জালিয়ে দেয়-গঙ্গা বালা, শরণার্থীদের খোঁজে-৬০


আমাদের কুমিল্লা .কম :
22.11.2020

শাহাজাদা এমরান,লালমনিরহাট থেকে ফিরে।।
চোখের সামনে আশেপাশের বাড়ি ঘর পেট্রোল দিয়ে জ¦ালিয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বশির শেখের বাড়িতে আগুন দিয়ে যখন কিপদ সরকারের বাড়িতে আগুন দিতে যায় তখন কিপদ সরকারের বৃদ্ধ মা এক পাকিস্তান আর্মিকে পা জড়িয়ে ধরে বলে, বাবারে আমি গরিব মানুষ। আমার ঘর জ¦ালিয়ে দিলে কোথায় গিয়ে উঠব। এমন সময় পাশে থাকা এক বিহারি চেঁচিয়ে বলল,তোদের এখানে থাকার দরকার নেই। ইন্দিরাগান্ধির কাছে যা,ভারত যা। আরেকজন রাজাকার এসে বৃদ্ধ কিপদ সরকারের মাকে সেনাবাহিনীর পা থেকে জোর করে সরিয়ে নেয়। এরপর আগুন দেয় গাদবেলার বাড়িতে। একদিন এক সাথে এই তিনটি বাড়ি জ¦ালিয়ে দেওয়ার ঘটনা দূর থেকে নিজের চোখে দেখেছি। ছোটকালেই বাবাকে হারিয়েছি। পাঞ্জাবিরা যাওয়ার পর দ্রুত বাড়ি এসে মাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। মা ও কাঁদলেন।পরে বললাম, মা চল আর এক মুহূর্তে এই দেশে থাকা যাবে না। এটা আমার দেশ না মা,এই মাটি,এই ঘর এই বাতাস সব ওই কুলাঙ্গারদের। ভগবানের কাছে বিচার দিলাম। ভগবান একদিন বিচার করবে। এইভাবেই সেদিন আমরা দুই মা ঝি জোড়ে ইচ্ছেমতো কেঁদেছিলাম। যে কান্না বাবা মারা যাওয়ার পরেও কাঁদিনি। কথাগুলো বলেই চোখ মুছতে লাগলেন গঙ্গা বালা।
১৯৫৭ সালে রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার কাউনিয়া ইউনিয়নের গাজির হাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গঙ্গা বালা। পিতা ওমে চরণ বর্মণ ও মাতা বানেশ^রী। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে তার অবস্থান চতুর্থ। যুদ্ধের আগেই বাবা মারা যান। অভাবের সাথে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠেন তিনি।
বাড়ি ঘর ছেড়ে কেন ভারত গেলেন জানতে চাইলে গঙ্গাবালা বলেন, সম্ভবত সময়টি এপ্রিল মাসের বা মে মাসের প্রথম হবে। একদিন বিকালে হঠাৎ করেই গ্রামে সেনা বাহিনী আক্রমণ চালায়। আমাদের গ্রামের উল্টো দিকের তিনটি বাড়ি সম্পূর্ণ জ¦ালিয়ে দেয়। অভিযোগ ছিল এই তিন বাড়ি থেকে কয়েকজন যুবক মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। নিজের চোখে দৃশ্যটি দেখে এই দেশে থাকা আর নিরাপদবোধ করলাম না। শুধু মাত্র জীবন বাঁচাতেই পরদিন সকালে মাসহ আমরা সব ভাইবোন ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। আমরা রংপুরের গাজিরহাট থেকে কাউনিয়া হয়ে মধুপুর এক আত্মীয়ের বাড়িতে প্রথমে যাই। কারণ,দূরের রাস্তা। কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকতে হবে। তাই একদিনে যাওয়া যাবে না। পরদিন পাটকেপাড়া পিসির বাড়িতে গিয়ে কয়েক দিন থাকি। পরে তিস্তা নদী সংলগ্ন নাকেন্দা গ্রামের আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে আরো কয়েক দিন থাকি। তারপর তিস্তা নদী পার হয়ে নাগেশ^রী ভুরুঙ্গামারী দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। আমাদের ভাগ্য ভাল এবং লোকও ছিল তাই ভারতে যাওয়ার সাথে সাথেই আমরা শিয়ালদাহ আবুতারা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় পাই। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত এই শিবিরেই ছিলাম।
আবুতারা শরণার্থী শিবিরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমরা তো কখনো আতপ চালের ভাত খাইনি। সেখানে যাওয়ার পর রিলিফ হিসেবে আমাদের আতপ চাল দেওয়া হতো। আবার চালের ভিতর কেরী পোকা ছিল তার ওপর আবার চাল তিতা তিতা লাগতো। আমরা যেদিন এই ক্যাম্পে আসি সেই দিনই ৮/১০ জন লোক মারা যায়। বিশাল বড় ক্যাম্প। কয়েকটি গ্রামের সমান হবে। আমার ভাই বোনেরাও কয়েক দিনের মধ্যে আমাশয় ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এই ক্যাম্পে আসার পর থেকেই প্রতিদিন রাতেই ক্যাম্পের বিভিন্ন ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ আসত। কান্নার আওয়াজ এলেই বুঝতাম ওই ঘরের লোক মারা গেছে। আসলে কথায় আছে,অতি শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর। মৃত্যু দেখতে দেখতে চর্তুদিকে কান্না শুনতে শুনতে সবারই এটা সয়ে গিয়েছিল। কেউ মারা গেলেও অন্যরা খুব একটা রুম থেকে বের হয়ে আসত না।
বাড়ি থেকে আসার সময় আমাদের দুটি গরু পাশের বাড়ির এক মুসলমান পরিবারের কাছে দিয়ে আসছিলাম। আর ধান চাল যা ছিল মা তা খুব যত্ন করে ঘরে রেখে মাটি দিয়ে মুখটি লেপে দিয়েছিল। কিন্তু আমরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার দিনই নাকি রাজাকাররা আমাদের ঘরে হামলা করে ঘরের সকল জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিল এবং খবর পেয়ে ওই মুসলিম পরিবারকে ভয় ভীতি দেখিয়ে আমাদের গরু দুটিও নিয়ে গিয়েছিল। আমরা আসার সময় যে স্বর্ণ গয়না নিয়ে আসছিলাম, তা বিক্রি করে আমরা শরণার্থী শিবিরে চাল কিনে খেয়েছিলাম। শিবিরের দেওয়া আতপ চাল আমরা বাহিরে বিক্রি করে অন্য কিছু কিনে আনতাম।
সত্যি কথা বলতে কি, শরণার্থী ক্যাম্পে যে কি ধরনের কষ্ট হতো তা বলে বুঝানো যাবে না। বিশেষ করে উপযুক্ত মেয়েদের। অনেকেরই একাধিক কাপড় ছিল না ।কাপড় পাল্টানোরও সমস্যা ছিল। একটি পরিবারে মনে করেন ছয় জন লোক আছে। এর মধ্যে বাবা মা ছাড়া দুই ভাই দুই বোন। দেখা গেল কোন পরিবারে দুই বোন বিয়ের উপযুক্ত। দুই ভাইও বড় হয়ে গেছে। এই ছয় সদস্য পরিবারের জন্য কিন্তু শরণার্থী শিবিরে আপনাকে রুম একটাই দিয়েছে থাকার জন্য। দুই সদস্য পরিবারের জন্যও রুম একটি। রাতে থাকাসহ কত কষ্ট হতো তা বলার বাইরে। আমাদের শিবিরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার লোক ছিলাম। সেই তুলানায় বাথরুম ,গোসলের ব্যবস্থা ছিল অনেক কম। দেখা গেল একজন মহিলা বাথরুমে গেল আর বাহির থেকে ১০/১৫ জন পুরুষ ডাকতেছে বাথরুমে কে আসেন না ,আসেন না ইত্যাদি।
কবে দেশে ফিরলেন জানতে চাইলে গঙ্গাবালা বলেন, ১৮ ডিসেম্বর আমরা শরণার্থী ক্যাম্প থেকে বিদায় নিয়ে খুব সকালে রওয়ানা দেই যাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছতে পারি। গিয়ে দেখি বাড়ি ঘর বলতে কিছুই নেই। পাশের বাড়ির এক মুসলিম পরিবার আামাদের সাথে সম্পর্ক বেশ ভাল। তারা আমাদের ঘরের ভিটের উপর ডাটাসহ কয়েক রকম সবজি চাষ করে রেখেছে। ওই রাতে আমরা তাদের ঘরে ছিলাম। পরদিন সকালে তারাসহ আমরা সবাই মিলে কোন মতে থাকার উপযোগী করে আমাদের ঘরটি দাঁড় করাই।
গঙ্গাবালা কথা শেষ করার আগে এই প্রতিবেদকের হাত ধরে বলেন, বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধের কথাগুলো ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ আপনি এসে পুরানো কথা মনে করে দিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক অনেক কষ্ট করেছি। আমরা তো ইচ্ছে করে ওপারে যাইনি। সুতরাং সরকার যেন শরণার্থী হিসেবে আমার স্বীকৃতি দেয়। তাহলে মরে গিয়ে শান্তি পাবরে বাবা।