শনিবার ১৬ জানুয়ারী ২০২১


চাই শরণার্থীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
29.11.2020

শাহাজাদা এমরান।।
আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১ সাল একটি তাৎপর্যপূর্ণ বছর। এই বছরই বাংলাদেশ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছিল এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামধারী কিছু নরপশু। এদের সাথে আরো যুক্ত ছিল বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত বিহারীরাও। মুসলিম লীগ ও জামায়াত ইসলামীসহ আবার এলাকা বেদেও কিছু রাজকার ছিল। যারা পাকিস্তানী হানাদারদের স্থানীয় ভাবে সহযোগিতা করতো। যেমন দেশের পাহাড়ী অঞ্চলে রাজাকারের ভূমিকায় ছিল পাহাড়ী সম্প্রদায় চাকমারা আবার দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলা গুলোতে অন্যান্য রাজাকারদের সাথে হাত মিলিয়েছে রিফ্যুইজিরাও। যারা দেশ বিভাগের পর ভারত ছেড়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠার পেছনে তিনটি পূর্বশর্ত প্রধান হয়ে উঠেছিল। এক. মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংগঠন ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ; দুই. ভারতের অব্যাহত ও সক্রিয় সমর্থন এবং তিন. আন্তর্জাতিক সমর্থন। এই তিনটি শর্তকেই পরিপূরণ করার জন্য ‘শরণার্থী সমস্যা’ মহা গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি খুবই কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আর এমন কোনো একক উপাদান নেই, যা এই তিনটি পূর্বশর্তকেই সমান্তরালভাবে পরিপূরণ করে। ‘শরণার্থী সমস্যা’ এই দুটি শব্দ দ্বারাই কেবল এই তিনটি পূর্বশর্তকে তাত্ত্বিকভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব। শরণার্থী ইস্যুটি তাই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের একটি মৌল নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত। এক কথায় আরো সহজ করে বললে বলতে হবে, প্রায় এক কোটি শরণার্থী পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল বলেই ভারত এবং আন্তর্জাতিক মহল তীব্র চাপ অনুভব করেছিল,এখানে যে গণহত্যা হচ্ছে,নিজ দেশে থাকা যে নিরাপদ না এটি তারা দ্রুত অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল। এতে আমাদের বিজয় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

বলতে এতটুকু দ্বিধা নেই যে, শরণার্থী সমস্যার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বহির্বিশ্বে ব্যাপক মানবিক সমর্থন পায়। এই মানবিক সমর্থনের সূত্র ধরে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সমর্থনের পথ সুগম হয়। জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর‘সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন দেশ শরণার্থী সমস্যার ব্যাপারে যেভাবে সংশ্লিষ্ট হয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনকে আন্তর্জাতিকীকরণে তা সহায়ক হয়।
সামগ্রিকভাবে শরণার্থী ইস্যুটির কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব পাকিস্তানও এক পর্যায়ে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের পক্ষে ততদিনে অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে; মুক্তিযুদ্ধজনিত বহুমুখী লড়াইয়ে তাই শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশ নামক একটি দেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে কি কারণে শরণার্থী উপাদানটি মুখ্য নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিল সংখ্যার দিক থেকে ভারতে আশ্রিত সেই পরিসংখ্যানটি প্রাসঙ্গিক ভাবে এখানে তুলে ধরছি।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে ঘুমন্ত মানুষের উপর নারকীয় তাণ্ডবের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ২৬ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে যুদ্ধ শুরু হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত সদ্য বাস্তুচ্যূত মানুষ গুলো দেশের ভিতরেই ছুটাছুটি করে আসছিল। এপ্রিলের প্রথম দিন থেকেই মূলত শুরু হয়েছিল ভারত অভিমুখী যাত্রা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে এসে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি। ত্রিপুরায় জনসংখ্যার প্রায় সমান হয়ে গিয়েছিল আশ্রিত শরণার্থীর সংখ্যা। তবে শরণার্থীদের প্রধান আশ্রয়স্থল ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৭২ সালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডকুমেন্টস অনুযায়ী ২৬ মার্চ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারত ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন বাংলাদেশী শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয়দাতা রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে । এই রাজ্যে আশ্রিতের সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৪ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ত্রিপুরা। তবে সেখানে আশ্রিত ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৯১ শরণার্থী ছিল ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান। মেঘালয়ে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৯৮৬,আসামে তিন লাখ ১২ হাজার ৭১৩ জন এবং বিহারে ৮ হাজার ৬৪১ সংখ্যক বাংলাদেশী শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপরও যখন শরণার্থী বাংলাদেশ থেকে আসতেই ছিল তখন ভারতের বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যগুলো আর শরণার্থী আশ্রয় দিতে অপারগ হয়ে পড়ে। ‘একপর্যায়ে শরণার্থীর চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তাদের দূরে সরিয়ে নেওয়া হতে থাকে। শেষের দিকে বিহারে আটটি, মধ্য প্রদেশে তিনটি ও উত্তর প্রদেশে একটি শিবির স্থাপন করা হয়। অবশ্য শরণার্থী সবাই শিবিরে ছিল না এবং সবাই নিবন্ধিতও হয়নি।’ তবে এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক যে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডকুমেন্টস অনুযায়ী শরণার্থীর সংখ্যা ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে এই সংখ্যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখের কাছাকাছি হতে পারে বলে একাধিক তথ্য ঘেটে জানা গেছে। কারণ,অবস্থা সম্পন্ন অনেক শরণার্থী প্রেস্টিজ ইস্যুর কারণে শিবিরে না থেকে তাদের স্বজনদের বাসায় ছিলেন। অনেকে আবার সীমান্তবর্তী জায়গার খালি মাঠে ঘর উঠিয়ে থেকেছেন আবার অনেকে একেবারে বাস্তুহারা হয়ে বিভিন্ন স্টেশন ও রাস্তা ঘাটে থেকেছেন। এরা অনেকেই নিবন্ধিত না। তবে এটাও ঠিক এ সংখ্যা খুব বেশীও হবে না।

‘শরণার্থী শিবিরগুলো যেন সীমান্তজুড়ে একেকটি বাংলাদেশ হয়ে গিয়েছিল।’ মূলত নিজের শরণার্থী জীবনের স্মৃতিচারণমূলক বইটিতে লেখক ও শরণার্থী সুখেন্দু সেন, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের অনেক শিবিরের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বন্যার আগাম আভাস পেয়ে গাছ বেয়ে ওঠা পিঁপড়ের সারির মতো, দুর্গম পথ, নদী-খাল, বন-বাদাড়-জঙ্গল অতিক্রম করে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভবিষ্যতের আশঙ্কা সঙ্গী করে ক্রমাগত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের তেরশ’ মাইল সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থীরা ভারতে ঢুকছে। প্রথমে স্কুল, কলেজ, রেলস্টেশন, পরিত্যক্ত বাড়ি-আঙিনা, সরকারি স্থাপনা, হাটবাজারের চালা, খালি গুদামঘরের আশ্রয় নেয়। ক্রমে বাঁশ আর উপরে ত্রিপল টেনে সারি সারি খুপরি করে থেকেছে তারা।
নদীর তীরবর্তী শরণার্থী শিবির গুলো দেখলে মনে হবে এক একটি শরণার্থী শিবির যেন সামুদ্রিক দ্বীপ।’ বালুতেই শয্যা তাদের। এই সুখও কি কপালে সয়? আগুন লাগে ক্যাম্পে, একবার নয় দুই দুইবার। মায়ের যক্ষের ধন স্বর্ণালঙ্কার আগুনের ভোগে চলে যায়। স্বাধীনতার পর নিঃস্ব- রিক্ত সুখেন্দু সেনরা যখন স্বদেশে ফিরে এল, তখন মেরুদণ্ড ভাঙা প্রাণী। এরপর থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যহীন দৌড়ের মধ্যেই আছে তারা।’ এই লক্ষ্যহীন দৌড় কি শুধু সুখেন্দু সেনদের। না,এই প্রতিবেদক দেশের অধিকাংশ সীমান্তবর্তী জেলা গুলো ঘুরে প্রত্যক্ষ করেছে, এই লক্ষ্যহীন দৌড় এখনও চলছে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী পরিবারের। তবে দু:খজনক হলেও সত্য যে, সময়ের স্রোতে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন ওপারের ডাকে সাড়া দিতে দিতে সংখ্যার দিক থেকে গৌণ হতে শুরু করেছে, ঠিক তেমনি শরণার্থীরাও। তবে দেশে এখনো যত সহজে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে পাওয়া যায় তারচেয়েও অনেক কঠিন থেকে কঠিনতর কাজ হচ্ছে শরণার্থীদের খুঁজে বের করা। এ হিসেবে দেশে খুব বেশী যে শরণার্থী জীবিত আছে হলফ করে তা বলা যাবে না।
অর্ধশতের উপর শরণার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,আসলে ‘শরণার্থী জীবনের সবটাই দুঃখের। তবে শিবিরে থাকা অবস্থায় সময়ে সময়ে তারা যখন মাইকে দেশের গান শুনত, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনত, তখন এগুলো সঞ্জীবনী সুধার মতো তাদের হৃদয়ে কাজ করতো। মনের অজান্তে এই ভেবে শক্তি ফিরে পেত যে, প্রিয় মা মাটির বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। আবার ফিরে যেতে পারবে নিজেদের বাড়ি ঘরে। কুড়িগ্রামের একাত্তরে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র পরিমল বলেন, ‘ত্রাণের লাইনে দাঁড়ানো থেকে শিবিরের সবকিছুই ছিল গভীর বেদনার। বৃষ্টিতে ভিজেছি, রোদে পুড়েছি। শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রিতদের রোগশোক ছিল নিত্যসঙ্গী।

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিদেশি বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রিটিশ মানবাধিকারকর্মী জুলিয়ান হেনরি ফ্রান্সিস। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অক্সফার্মের পক্ষে ৫০টির বেশি শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয়ক ছিলেন জুলিয়ান ফ্রান্সিস । ১৯৬৮ সালে ভারতের বিহারে যুক্তরাজ্যের অক্সফার্মের একটি প্রকল্পে যোগ দেন তিনি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশ শরণার্থী শিবিরে তিনি কাজ শুরু করেন। ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলোতে তখন অক্সফার্ম বাংলাদেশি শরণার্থী শিবিরগুলোতে সহায়তা দেয়। জুলিয়ান হেনরি ফ্রান্সিস এর অনুসন্ধ্যানে উঠে আসে শরণার্থীদের চরম দু:খ দুর্দশার বেদনার চিত্র।
দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’তে ষাটজনের একজন হিসেবে জুলিয়ান ফ্রান্সিস লিখেছিলেন, ‘অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে পরিবারগুলো ভিজে জবুথবু, তাদের মাঝে কাপড় শুকানোর দড়ি ছাড়া দুটি পরিবারকে আলাদা করার মতো কোনো দেয়াল নেই। খড়ের তৈরি ছাউনি বৃষ্টির কাছে অসহায়, মাটির বিছানা ভিজে একাকার। প্রতিনিয়ত কুটিরগুলো থেকে শত শত শরণার্থী সরকারি রেশনের জন্য লাইন ধরছে, পানি ও পয়ঃনিস্কাশনের জন্য তাদের সারিও চোখে পড়ার মতো। আমাশয়ে আক্রান্তরা খুব কমই নিজেদের ধরে রাখতে পারছে। শিশুরাও তাদের বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্যের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ ১৯৭১ সালের ২১ অক্টোবর ‘দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’ যখন প্রকাশিত হয়, তখন পর্যন্ত ভারতে আশ্রিত শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ, যা পরে ১৫ ডিসেম্বরে গিয়ে ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন হয়েছিল। ‘দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’তে জুলিয়ান আরও লিখেছিলেন, ‘এই হচ্ছে ৯০ লাখ শরণার্থীর জীবনচিত্র। যাদের কোনো কাজ ছিল না, ছিল না পয়সাকড়িও। তবে তারা জানত, কেন তারা এসেছে। তারা এ-ও জানত, এ জায়গাটাই তাদের জন্য নিরাপদ। জীবন বাঁচানোর জন্য এখানে আসা ছাড়া যে গত্যন্তর নেই।’
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল আমাদের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে রাজনৈতিক শরণার্থীদের দ্বারা। এই সরকার কৌশলগত কারণে ভারতে তাদের সচিবালয় স্থাপন করলেও তারা আসলে তার নিজের জনগণের সাথেই অবস্থান করত। কারণ, তখন আমাদের প্রায় ১৫ শতাংশ অধিবাসী তখন ভারতে এই সরকারের সাথে অবস্থান করছে শরণার্থী হয়ে।
মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের গুরুত্ব যে কত অপরিসীম ছিল তা বুঝাতে আর বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভব না করেও বলছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রধানত দুইটি কারণে পরিচিতি পায়। এর একটি হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন, গণহত্যা এবং দ্বিতীয়টি হলো শরণার্থী সমস্যা। বাঙালিরা বিহারিদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এই জাতীয় অনেক রিপোর্ট পাকিস্তান আলোচনায় আনার কারণে শুরুতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হলেও তা স্থায়ী করতে পারেনি শরণার্থী সমস্যার কারণে। বস্তুত এই সমস্যাকে আড়াল করতে হলে পুরো এক কোটি লোককে স্থায়ীভাবে গায়েব করে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি আসলে অসম্ভব ব্যাপার। এতে প্রধানত শরণার্থী সমস্যার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাহিরের দুনিয়ায় ব্যাপক মানবিক সমর্থন পায়। এই মানবিক সমর্থনের সূত্র ধরে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সমর্থনের পথ সুগম হয়। জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর‘সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন দেশ শরণার্থী সমস্যার ব্যাপারে যেভাবে সংশ্লিষ্ট হয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তাতে আন্তর্জাতিকীকরণে সহায়ক হয়।
২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ভারতের স্বীকৃত ১৪১টি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১২ লক্ষ লোক মারা যায়। এ নিয়ে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও শরণার্থী নিয়ে কাজ করা আন্তর্জতিক পরিমণ্ডলে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে রয়েছে ভিন্নমতও। তবে অধিকাংশ লেখাই একটি তথ্য অভিন্ন পাওয়া গেছে আর তাহল ৬ লাখ থেকে ১২ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। আবার যারা ভারতে আসার পথে রাস্তা ঘাটে হানাদার বাহিনীর গুলিতে,রাজাকারদের অত্যাচারে কিংবা নানা সমস্যায় মারা গেছে তারা কিন্তু আবার এই পরিসংখ্যানের বাইরে। বস্তুত এরাও কিন্তু শরণার্থীর পর্যায়ভুক্ত।
সুতরাং আমাদের ভাষা আন্দোলন যদি স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত হয় তাহলে আমি বলব,আমাদের ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জ্বত, দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসের ফলে ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ এ যে বিজয় এসেছে সেই বিজয়ের অগ্রদূত হচেছ শরণার্থীরা। অর্থাৎ শরণার্থী বিষয়টি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করছে। শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ শরণার্থীই ভারত গিয়েছে এক কাপড়ে, ন্যূনতম কিছু নেওয়ার সুযোগটুকুও তারা পায়নি। আবার দেশ স্বাধীনের পর শতকরা প্রায় ৯৮ ভাগ শরণার্থীই দেশে এসে দেখেছে তাদের বাড়ি ঘর সহায় সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বাড়ি ঘর জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে। জমির ফসল কেটে নিয়ে একেবারে নি:শেষ করে দিয়ে গেছে শরণার্থীদের। এই যে তারা বেকায়দায় পড়েছে সেখান থেকে অধিকাংশই এখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বছরে পা রেখেও এখনো সব কিছু হারিয়ে নিজেদের অসহায়ের মত খুঁজে ফেরে শরণার্থীরা।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে পালিত হবে এবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। সরকার প্রধান হিসেবে আছেন বাঙালী জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই আমার বিনীত আবেদন, সরকার যেন স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা শরণার্থীদের রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। তাদেরকে যেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেই শরণার্থীদের জন্য আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছিল আমরা কি পারি না মহান মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছরে দাঁড়িয়ে শরণার্থীদের স্বীকৃতি দিয়ে দায় মুক্ত হতে।
(এই লেখার বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনলাইন থেকে সংগৃহীত )।
লেখক : সাংবাদিক,সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক।