শুক্রবার ২২ জানুয়ারী ২০২১
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » সারা রাত অসুস্থ পুলিশদের পাশে থেকে সেবা দিয়েছেন ডা.মুবিন


সারা রাত অসুস্থ পুলিশদের পাশে থেকে সেবা দিয়েছেন ডা.মুবিন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
11.12.2020

শাহাজাদা এমরান ।।
রাত তখন সাড়ে ৮ টা বাজে। কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে আসা হলো ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।কিছুটা পেটের ব্যথা ও ডায়রিয়া হচ্ছে দেখে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.আবু হাসানাত মো.মহিউদ্দিন মুবিন পরম যত্নসহকারে তাদের নিজেই দেখলেন। নির্বাচন উপলক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হতে পারে এ হিসেবে এ সংক্রান্ত যাবতীয় মেডিসিন ও সরঞ্জামাদিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক প্রস্তুত রাখা হচ্ছিল। কিন্তু হাসপাতালের প্রস্তুতির সাথে বাস্তব ঘটনা ঘটল ঠিক উল্টো। রাত সাড়ে ৮ টার পর থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে পুলিশ আনসার ও তাদের গাড়ির ড্রাইভাররা দলে দলে ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে আসতে লাগল সরকারি এ হাসপাতালে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের এভাবে অসুস্থ হয়ে দলে দলে হাসপাতালে চলে আসায় প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরে নিজকে সামলে নিয়ে নেমে পরেন তাদের সুস্থ করার সংগ্রামে। মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল হাসপাতালের রিজার্ভে থাকা এই রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ। পরে ওষুধ সংগ্রহের আরেক যুদ্ধে নেমে পড়েন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.আবু হাসানাত মো.মহিউদ্দিন মুবিন। বুধবার সমস্ত রাত অসুস্থ পুলিশ সদস্যদের বিরামহীন চিকিৎসা দিয়েও দিব্যি কাজ করে চলছেন বৃহস্পতিবারও । কোন ক্লান্তিই তাকে দমাতে পারেনি।
জানা যায়,১০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের উপ-নির্বাচন উপলক্ষে আগের দিন বুধবার দুপুর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে আসতে থাকে আইনশৃঙ্খলা নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। তাদের খাবারের জন্য উপজেলা সদরের ইত্যাদি নামক এক দোকান থেকে বিরিয়ানি অর্ডার দেওয়া হয়। ইত্যাদির পরিবেশিত বিরিয়ানি পাঠিয়ে দেওয়া হয় সব কেন্দ্রে। এই বিরিয়ানি খাওয়ার পর থেকেই রাত ৮টা থেকে অসুস্থ হওয়া শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। রাত সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয় হাসপাতালে আসা, চলে রাত ৩টা পর্যন্ত। এই সময়ে প্রায় দুই শর ওপর সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে অধিকাংশই পুলিশের সদস্য।
রাত ১১টার মধ্যে হাসপাতালে রিজার্ভে থাকা সকল ওষুধ শেষ হয়ে যায়।পরে পাশর্^বর্তী বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স , জেলা সদর হাসপাতাল ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শরণাপন্ন হন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
রাত একটার পর জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে যান জেলা সিভিল সার্জন ডা.নিয়াতুজ্জামান। চলে আসেন বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাও। চলে বিরতিহীন চিকিৎসাসেবা।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু হাসানাত মো.মহিউদ্দিন মুবিন বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান গতকাল সারা রাত চিকিৎসা যুদ্ধ করে কোন রকম বিশ্রাম না নিয়ে এখনো দিব্যি কাজ করে যাওয়ার নেপথ্যের কাহিনী।
তিনি জানান,আমরা সাধারণত প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম মারামারি ঘটনা সামাল দেওয়ার জন্য। কিন্তু ঘটল ঠিক বিপরীত। রাত সাড়ে ৮টায় যখন প্রথম কয়েকজন পুলিশ সদস্য এলো তখন ভাবছি এটা হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার অংশ। এমন তো হতেই পারে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর থেকেই শুরু হলো পুলিশ আনসার সদস্যদের অসুস্থ অবস্থায় নিয়ে আসার ঢল। আমার ত্রিশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরেও রোগী আমি সামাল দিতে পারছি না। আমার স্টোর কিপার থাকে গ্রামে। নিজে গাড়ি চালিয়ে তাকে রাত ১১ টায় গ্রাম থেকে এনে স্টোর খুলে যত ওষুধ ছিল সব দেই। ওষুধ শেষ কিন্তু রোগী আসা বন্ধ হচ্ছে না। হাসপাতালের সকল নার্সদের মুহূর্তের মধ্যে খবর দিয়ে অসুস্থদের সেবা শুরু করে দেই। পাশর্^বর্তী উপজেলা বুড়িচং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সহযোগিতা নিই। সিভিল সার্জন মহোদয়কে জানিয়ে বলি, স্যার,ওষুধ লাগবে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের পরিচালক মহোদয়কে বলি,স্যার, ওষুধ লাগবে। অনেক রাত হওয়ায় উপজেলা সদর ও আশেপাশের সকল স্থানের ফার্মেসি বন্ধ। জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ি। ওষুধ ও স্যালাইন ছাড়া রোগী আমি বাঁচাবো কীভাবে ? কুমিল্লা সদর হাসপাতালের স্টোর কিপারের বাড়িও গ্রামে। তারপরেও লর সিভিল সার্জন মহোদয় অনেক কষ্ট করে যেভাবে পারছেন স্যালাইন ও ওষুধ নিয়ে রাত ১টার দিকে ব্রাহ্মণপাড়া আসেন। প্রায় দুই শ’র ওপর আনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভর্তি হন। ১২০ জন পুলিশকে প্রাথমিক চিটকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ করে পাঠিয়ে দিই। কিছু রোগী যায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আর ৬৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এখনো ভর্তি আছেন এখানে। কীভাবে অসুস্থ হয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাবারে বিষক্রিয়াজনিত কারণে তারা অসুস্থ হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।
সারা রাত রোগীর সেবা করে এখনো হাসপাতালে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ কর্মকর্তা ডা.মুবিন বলেন, আমরা তো ভাই ডাক্তার হয়েছি মানুষের সেবা করার জন্য। অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে পারি না। গতকাল রাতে আমার সাথে যারা ছিল তারা সবাই অল্প স্বল্প রেস্ট নিয়েছেন। কেউবা আবার রোস্টার অনুযায়ী আসছেন বা গেছেন। কিন্তু আমি বুধবার যে বাসা থেকে এসেছি আজ বৃহস্পতিবার এখন প্রায় দুপুর এখনও হাসপাতালে আছি। আমার মধ্যে কোন ক্লান্তি ভাব লাগছে না। কারণ,এখনো আমার হাসপাতালে ৬৫জন পুলিশ সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য স্বাভাবিক রোগী তো আছেই। এই পুলিশ সদস্যরা একজন একেক স্থান থেকে এসেছেন। সুতরাং এতগুলো রোগী রেখে আমার রেষ্ট নেওয়াটা সমীচীন মনে করিনি বলে যাইনি। আর আল্লাহর রহমতে এখন তো ইয়াং আছি। কোন সমস্যা হয়নি।
একই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কাজ করা এক স্টাফ বলেন, বুধবার থেকে শুরু এখন বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা বাজে। এখনো স্যারের কোন রেস্ট নিতে দেখিনি। স্যার যদি কোন কারণে কাল রাতে না থাকতেন তাহলে যথাযথ চিকিৎসা ও ওষুধের অভাবে অনেক পুলিশ সদস্যদেরকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যেত। মানবতার এক অন্যান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেেলন আমাদের স্যার।