শুক্রবার ২২ জানুয়ারী ২০২১


খন্দকার বাড়ি লাল হয় ৩৭ জনের রক্তে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.12.2020

অযত্নে পড়ে আছে গণকবর, সুরক্ষিত করার দাবি স্বজন ও এলাকাবাসীর


আবদুর রহমান ।।
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী কৃষ্ণপুর ধনঞ্জয় গ্রামে ঘাতকদের হত্যার উৎসবের দিনটি ছিলো ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে ওই গ্রামের খন্দকার বাড়িতে হঠাৎ খবর এলো পাক হানাদার বাহিনী আসছে। হানাদাররা আসছে, এ খবর শুনেই বাড়ির সবাই ভীত আর সন্ত্রস্ত। মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক। ওই বাড়ির সাদাসিধে কৃষক সরাফত আলী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করেছিলেন। সেদিন পাক হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে আশেপাশের বাড়ি ও গ্রামের লোকজনও আশ্রয় নিয়েছিলো কৃষক সরাফত আলীর বাড়িতে।
সময় তখন দুপুর প্রায় সাড়ে ১২টা। সরাফত আলী মাঠের কৃষি কাজ রেখে দুপুরের খাবারের জন্য ৭ জন কৃষি শ্রমিক নিয়ে বাড়িতে আসেন। শ্রমিকদের নিয়ে বাড়ির পুকুরে হাত-পা ধুয়ে ঘরে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় হঠাৎ সরাফত আলীর বাড়িতে হানা দেয় পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। হানাদাররা আক্রমণ করে বসে বাড়ির চারদিক থেকে। তখন বাড়ির উঠানে-ঘরে যাকে যেখানে পায় সেখানে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে ঘাতকরা। ব্রাশ ফায়ারে এক সঙ্গে কয়েকজন শিশুসহ নিহত হয় ৩৭ জন। তাদের লাশগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে ঘরে-উঠানে। এর মধ্য দিয়ে খন্দকার বাড়ি লাল হয় ৩৭ জন শহীদের রক্তে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ওইদিন হানাদারদের হাতে সরাফত আলী, তার স্ত্রী, শাশুড়ি, ৩ মেয়ে, এক ছেলে ও এক নাতিসহ আশেপাশের বাড়ি এবং গ্রামের লোকজন মিলিয়ে মোট ৩৭ জন শহীদ হন। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান সরাফত আলীর মেজো মেয়ে মনুজা খাতুন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৩ মাস আগেই তাঁর বিয়ে হয় পাশের মাঝিগাছা গ্রামে। পারিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয় মনুজা খাতুনের মায়ের খালাতো ভাইয়ের ছেলে আবদুল হাকিমের সঙ্গে। স্বামীর বাড়িতে থাকায় বেঁচে যান তিনি। ১১ আগস্টের ওই হত্যাযজ্ঞের সময় এলাকা অনেকটা জনশূন্য হয়ে পড়ে। সেদিন বিকেলে লোকমুখে খবর শুনে বাবার বাড়িতে গিয়ে মা-বাবা ও ভাই-বোনের লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখেন মনুজা খাতুন। ব্রাশফায়ারে লাশগুলোর চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় লাশগুলো শনাক্ত করতেও কষ্ট হয় তার। চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশগুলো চেনার উপায়ও ছিলো না। চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন মনুজা।
ওইদিন নিহতদের মধ্যে যাদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন; কৃষক সরাফত আলী, তাঁর স্ত্রী হামিদা খাতুন, শাশুড়ি জহুরা খাতুন, মেয়ে হাফেজা খাতুন, হাজেরা খাতুন, সালেহা খাতুন, ছেলে জসিম উদ্দিন, নাতি সেলিম মিয়া (হাফেজা খাতুনের ছেলে), খন্দকার বাড়ির সামছুল হক খন্দকার, কৃষ্ণপুর গ্রামের কেরামত আলী, তাঁর ছেলে সৈয়দ আলী, একই গ্রামের আবদুল হাকিম, তাঁর স্ত্রী বেগম আক্তার, ওই গ্রামের চক্ষু মিয়া, আবদুল লতিফ, তাঁর মেয়ে হাসিনা আক্তার, হাসিনা আক্তারের ৮ মাসের দুধের শিশু সাজিদা খাতুন, আবদুল লতিফের অপর দুই মেয়ে ফিরোজা আক্তার, বকুল আক্তার, ছেলে আজাদ হোসেন ও মাঝিগাছা গ্রামের মনতাজ মিয়া। এছাড়া নিহত ওই ৩৭ শহীদের মধ্যে সরাফত আলীর বাড়িতে কৃষি কাজ করতে আসা বিভিন্ন এলাকা ৭ জন কৃষি শ্রমিক এবং অপর নিহতরা ওই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন।
গতকাল কৃষ্ণপুর ধনঞ্জয় গ্রামে গিয়ে কথা হয় খন্দকার বাড়ির বাসিন্দা জহিরুল হক খন্দকারের সঙ্গে। তিনি ৩৭ জনকে দাফনের সময় থাকা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বলে জানান। জহিরুল হক খন্দকার বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে এই বাড়ির উপর পাকিস্তানীদের নজর পড়ে। আমার বয়স তখন ১৫-১৬ বছর। আমরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যাই। বাড়ির ৩৭ জনকে হত্যার কথা শুনে ওইদিন বিকেলে আবার বাড়ি ফিরে আসি। এসে দেখি লাশগুলো ছঁড়িয়ে পড়ে রয়েছে। সেদিন খন্দকার বাড়ির প্রায় ১৫টি ঘর ভাঙচুর করে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলো পাকিস্তানীরা। পরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে আমরা দুইটি গর্ত করি। এক গর্তে নারী এবং অপর গর্তে পুরুষদের আলাদা করে মাটি চাপা দেই। এই ৩৭ জন শহীদের ভাগ্যে শেষ গোসল কিংবা জানাজা কিছুই জোটেনি।
ওই এলাকার বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হতে চললেও ওই ৩৭ জন শহীদের গণকবরটি এখনো সংরক্ষণ হয়নি। শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাসান মাহমুদের সহযোগিতায় ২০০১ সালের ১৬ জুন একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করে দিয়েছিলেন আমড়াতলী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত মো.আবদুল করিম। প্রতি বছর ডিসেম্বর এলেই এই গণকবরের খোঁজ নেয় অনেকে। পরে আবার ভুলে যায়।
গতকাল কথা হয় সেদিন মারা যাওয়া কৃষক সরাফত আলীর নাতনী (মনুজা খাতুনের বড় মেয়ে) হাসিনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার মা পরিবারের সকলকে হারিয়ে একাকি জীবনযাপন করে গেছেন। সেদিন স্বামীর বাড়িতে থাকায় আমার মা প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজও ওই শহীদদের গণকবরের সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি। গণকবরের জায়গা অনেকে দখল করে ঘর তুলেছেন। সবচেষে কষ্টের বিষয় হলো এখনও ওই শহীদদের ভাগ্যে জোটেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।
এসব প্রসঙ্গে জানতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো.সফিউল আলম বাবুল বলেন, আমরা যাচাই-বাছাই করে ওই গণকবরটি সংরক্ষণের প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলাম। তবে জেলার ১১০টি গণকবর সংরক্ষণের বরাদ্দ এলেও ওইটির বরাদ্দ আসেনি। আশা করছি পরবর্তীতে ওই গণকবরটি সংরক্ষণ করা হবে।