শুক্রবার ২২ জানুয়ারী ২০২১
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংকট-অনিয়মে চলছে স্বাস্থ্যসেবা


দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংকট-অনিয়মে চলছে স্বাস্থ্যসেবা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.12.2020

Exif_JPEG_420

রুবেল মজুমদার ।।
৪লাখ ২৭ হাজার জনসংখ্যার একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র ৫০শয্যার দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে । উপজেলায় বসবাসরত বাসিন্দারা চিকিৎসা সেবা নিতে ছুটে আসেন হাসপতালটিতে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে অনেকে নানারকম ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন।
চিকিৎসাসেবার নামে সরকারি হাসপাতালটিতে চিকিৎসকদের ফাঁকিবাজি, রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত না করে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টিভদের সাথে সময় দেয়া, বয়স্ক ও গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে মাসোয়ারা নিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য করা, ভর্তি রোগীদের নোংরা খাবার পরিবেশন, রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না করা, নার্সদের ডিউটিতে অবহেলা, চিকিৎসকরা নিয়ম মাফিক ডিউটি না করাসহ নানা অনিয়ম রয়েছে হাসপাতালটিতে।
চিকিৎসকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও চিকিৎসাসেবার নামে পুরো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জুড়ে রয়েছে অনিয়ম। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এই এলাকার নিরীহ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা। স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কমর্রত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনায় ব্যাহত হচ্ছে উপজেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা। কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট বিদ্যমান থাকাবস্থায় সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম গিলে খাচ্ছে পুরো ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে।
হাসপাতালটির মহিলা রোগী দেখার কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, তিনজনের ডিউটি থাকার কথা থাকলেও ডা.শামসুর নাহার নামে একজন চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। একজন চিকিৎসক হাওয়ায় কক্ষে বাইরে মহিলা রোগীর দীর্ঘ লাইন। এর মধ্যে রয়েছে ষাটোর্ধ্ব একাধিক মহিলা, রয়েছে গর্ভবতী নারীরাও। একে তো ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা, তার চেয়ে বেশি ভোগান্তি সৃষ্টি করছে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক এবং ফার্মেসি প্রতিনিধিরা। তারা রোগীর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে টানাটানি করতে দেখা যায়।
চিকিৎসা নিতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে ভিতরে ও বাইরে দিনভর বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড় লেগেই থাকে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা রোগীদের হাত থেকে চিকিৎসাপত্র ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের কোম্পানির ওষুধের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দেখা যায়, জানা যায় এই হাসপাতালের কিছু অসাধু চিকিৎসক মাসোহারা নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের নাম চিকিৎসাপত্রে দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন বলে অনেকেই অভিযোগ করেন।
এছাড়া এক্স-রে ইসিজি পরীক্ষাগার কক্ষে গিয়ে দেখা যায় তালা ঝুলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক থেকে ডাক্তাররা ৪০শতাংশ কমিশন নিয়ে রোগীদের বাইরের হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পাঠান। ডাক্তারের এক সহকারী স্থানীয় কিছু তরুণ রোগী দেখার সাথে সাথে রোগীদের বিভিন্ন ক্লিনিকের কার্ড ধরিয়ে দেন। সরকারি পরীক্ষাগুলো বন্ধ বলে বুঝিয়ে প্রতিনিধিদের মধ্যমে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে পাঠিয়ে কমিশন আদায় করেন।
চিকিৎসা সেবা নিতে আসা দেবিদ্বার উপজেলার মহেশপুর থেকে আসা আমেনা বেগম জানান, সকাল ৮ টায় টিকিট কেটে বসে আছেন হাসপাতালের প্রধান ফাটকে। ডাক্তারের অপেক্ষায় সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো ডাক্তারে দেখা মেলেনি। কিন্তু সেই ডাক্তারের কক্ষে কয়েকজন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি বিভিন্ন উপহার সামগ্রী নিয়ে বসে আছেন। কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ডাক্তার সাহেব বাসায় আছেন, পরে আসবেন। কিন্তু ডাক্তারের সহকারী বলেন, স্যার তো মিটিংয়ে আছেন। কয়েকজন তরুণ চিকিৎসক চিকিৎসা দিলেও অধিকাংশ ডাক্তার তাদের কক্ষে নেই।
দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর এলাকা থেকে আসা রোজিনা নামের আরেক রোগী বলেন, চারদিন হলো হাসপাতালে ভর্তি হলাম। হাসপাতালে খাবার মন খুবই নোংরা, মাঝেমাঝে রাতে বাসি খাবারও দেয়া হয়। রোগীরা এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে মিলে না কোনো সুরাহা। সঠিক সময়ে নার্স ও চিকিৎসদের উপস্থিতি পাওয়া যায় না। অপরদিকে ওষুধও নিয়মিত পাওয়া যায় না এই হাসপাতালে। দুই একটা ওষুধ ছাড়া বাকি সব ওষুধই বাইরের দোকানগুলো থেকে কিনে আনতে হয়। রাতের বেলা নার্সদের সেবা চাইলে আলদা বোনাস দিতে হয়। হাসপাতাটিতে ২২জন নার্স থাকলেও ডিউটি অনুসারে সেদিন উপস্থিত খাতায় দেখানো হয় ৪ জনকে। কিন্তু পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় একজন নার্স ঘুরে ঘুরে সেবা দিচ্ছেন। বাকিদের বিষয় জানতে চাইলে মুখ খুলতে চান না তিনি। বলেন, বড় স্যারের সাথে কথা বলেন।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. আহাম্মাদ কবীর বলেন, আমি উপজেলা প্রশাসনের মিটিংয়ে থাকায় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলাম না। তবে রিপ্রেজেনটেটিভ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক এবং ফার্মেসি প্রতিনিধিদের অন্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে ভিড় বেশি। কয়েকদিন আগেই আমরা ৩জন দালালকে আটক করে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছে। আমাদের এখানে কোনো নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় রোগীদের ভিড়ে দালাল চক্রটিকে চিহ্নিত করা খুবই কষ্টকর। ডাক্তার উপস্থিতি না থাকায় বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন ,বিষয়টি অভিযোগের ভিত্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক ডাক্তারদের নোটিশ করা হচ্ছে।এক্স-রে ইসিজি পরীক্ষাগার চালু রয়েছে, হয়তো সেদিন ওনারা ছুটিতে ছিলেন।
কুমিল্লার সির্ভিল সার্জন ডাক্তার নিয়াতুজ্জামান বলেন, বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া উপজেলা কমপ্লেক্সগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার মান ত্বরান্বিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।