বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারী ২০২১


যেভাবে জীবন কাটছে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রাবেয়া চৌধুরীর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
10.01.2021

 

 

যেমন আছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রাবেয়া চৌধুরী
# আজ ৮৬-তে পা রাখলেন তিনি

 

শাহাজাদা এমরান।।

বেগম রাবেয়া চৌধুরী। শুধু কুমিল্লা নয়, বৃহত্তর কুমিল্লার রাজনীতির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু একজন স্বনামধন্য-আলোচিত রাজনীতিবিদই নন, তিনি সময়ের পরিক্রমায় রাজনীতির মাঠের একজন দক্ষ কোচ হিসেবে নিজকে প্রতিষ্ঠিত ক

রতে সক্ষম হয়েছেন। সততা ও নীতির প্রশ্নে আপোসহীন কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনের অগ্নিকন্যা হিসেবে খ্যাত এই বরেণ্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দক্ষতার সাথে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন চার বার। আজ ১১ জানুয়ারি মহিয়সী এই নারীর জন্মদিন। ১৯৩৫ সালের এই দিনে তিনি অবিভক্ত ভারতের কলকাতার নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার বাড়ি ও স্বামীর বাড়ি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার শুয়াগাজীতে। আজ তিনি পঁচাশি পেরিয়ে ৮৬ বছর বয়সে পা রাখছেন। ২০২০ সালের মে মাসে প্রিয় স্বামী নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে হারান। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যূব্জ কুমিল্লার প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ কেমন আছেন তা পাঠককে জানাতে গত ৯ জানুয়ারি কুমিল্লা নগরীর বাদুরতলাস্থ তার বাসভবনে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।

কেমন আছেন কুমিল্লার রাজনীতিক ই

তিহাসে অগ্নিকন্যা খ্যাত বেগম রাবেয়া চৌধুরী। স্বামী হারিয়ে নানা রোগ শোকে কীভাবে সময় কাটে এক সময় রাজ পথের এই লড়াকু সৈনিকের। বৃহত্তর কুমিল্লার লক্ষ লক্ষ পাঠকের জানার আগ্রহ এই প্রশ্নকে ঘিরেই।
বরেণ্য রাজনীতিবিদ রাবেয়া চৌধুরী আজ যে রোগে ভুগছেন তাও রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামকে কেন্দ্র করেই। ২০১৫ সালের শেষ দিকে হবে। আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী হরতাল চলাকালে তিনিসহ জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ কুমিল্লা টাউন হল গেটের ঠিক বিপরীতে চৌরঙ্গী মার্কেটের সামনে পিকেটিং করছিলেন। এমন সময় সরকারি দলের একটি মিছিল থেকে প্রথমে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পরে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দৌড়াদৌড়র এক পর্যায়ে পায়ে ব্যথা পান তিনি। এই ব্যথা আর সেরে ওঠেনি। বয়সের সাথে শরীরে বেড়েছে নানা বার্ধক্যজনিত রোগ। সাথে দিন দিন বেড়ে উঠছে পায়ের সেই ব্যথাটিও। হাঁটার জন্য এখন তার চির দিনের সঙ্গী হয়ে আছে লাঠি।
৮৬ বছর বয়সের কুমিল্লার এই বর্ষীয়ান নেত্রীর প্রতিদিনের জীবন কেমন চলছে জানতে চাইলে তিনি নিজেই জানান,এখন আর লাঠি ছাড়া হাঁট

তে পারি না। আগের মতো বেশি কথা বলতে পারি না। বেশী কথা বললে কষ্ট হয়। স্মরণ শক্তিও কিছুটা কমে গেছে। রাতে ঘুম কম হয়। তবে ফজরের আযান দিলে প্রতিদিনই সময়মতো ফজর নামাজটা পড়ে দুই এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে যাই। একেতো শারীরিক নানা সমস্যা, তার ওপর মহামারি করোনার কারণে আগের মতো দর্শনার্থীদের বা দলের নেতাকর্মীদের সাথে ওইভাবে দেখা সাক্ষাৎ করি না। তবে দলের প্রয়োজনে জেলার শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যখনি আসে তাদের সময় দিই,রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় বা সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলি। বাসায় নতুন পুরাতন যেই বইগুলো আছে সেই বইগুলো পড়েই এখন বেশিরভাগ সময় কাটে আমার। করোনার কারণে জাতীয় পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছি। তবে স্থানীয় খবরাখবর রাখার জন্য দৈনিক আমাদের কুমিল্লা এখনো নিয়মিত রাখি। আমাদের কুমিল্লা পত্রিকাটি পড়লে কুমিল্লা,ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার খবরাখবরগুলো পাওয়া যায়। তা ছাড়া টেলিভিশনও দেখি।এখন আর বাইরে বের

হই না। ঘরে বসে বই পড়ে,নামাজ পড়ে কেটে যায় বেলা- জানালেন রাবেয়া চৌধুরী।
জীবন সায়াহ্নে এসে কোন অতৃপ্তি কাজ করছে কি না জানতে চাইলে রাবেয়া চৌধুরী বলেন, মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে,আমার বাবা মন্ত্রী ছিলেন দুইবার আর আমি এমপি ছিলাম চারবার। বাবা যেমন সততার সাথে রাজনীতি করে গেছেন আমিও চেষ্টা করেছি সৎ জীবনযাপন করে রাজনীতি করতে। আমি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর আমাকে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদে প্রথম বারের মতো এমপি করেছেন। এরপর ১৯৯১,১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও আমি সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ছিলাম। আমার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপি তো নেই আওয়ামী লীগ বা কুমিল্লার অন্যকোনও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও বলতে পারবে না, রাবেয়া চৌধুরী দুর্নীতি করেছে,অনিয়ম করেছে। এমপি হিসেবে যখন যা

পেয়েছি তা দলের জন্য ব্যয় করেছি। রাজনীতিকে কখনো ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করিনি। আমি একটু ইচ্ছে করলেই আমার বাদুরতলার বাড়িটি নিজেই বহুতল ভবন করতে পারতাম । কিন্তু যেহেতু দুর্নীতি করিনি, তাই করার মতো আমার টাকাও ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে ডেভলেপারকে দিয়ে দিই।
রাজনীতি নিয়ে কোন হতাশা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হতাশা একটাই,সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলাম,রাজনীতি করলাম অথচ জীবনের শেষ সময়ে এসে দেখি আগের রাতে ভোট হয়ে যায়। জনগণ ভোট দিতে পারে না। জানি না আর কত দিন বাঁচব। তবে মরার আগে যদি দেখে যেতে পারতাম এদেশের জনগণ তার নিজের ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজে দিতে পারছে তাহলে মরেও শান্তি পেতাম।
চলমান রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন,এখন তো আমি আর বাসা থেকে বের হই না। বের হওয়ার মতো শারীরিক অবস্থাও ততটা আমার নেই। সারাদিন বাসায় থাকি। টেলিভিশন দেখি,বিভিন্ন টকশোগুলো দেখার চেষ্টা করি। বয়সতো অনেক হয়েছে। সময়ে সময়ে জেলার নেতৃবৃন্দ আসলে কথা বলি। আর রাজনীতি নিয়ে কি বলব। এটা তো আমার থেকে আপনারাই ভাল জানেন। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি রাজনীতিকেও বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার গৃহবন্দি করে রেখেছে।

পরিবারের কে কোথায় আছেন জানতে চাইলে রা

বেয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে। স্বামী নাসির উদ্দিন চৌধুরী ২০২০ সালের মে মাসে মারা যায় । সেই থেকে আমি একা হয়ে যাই। মেয়ে ও ছোট ছেলে দেশেই আছে। আর বড় ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়া সপরিবারে। সবাই আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।’
রাবেয়া চৌধুরীর পরিচয় :
রাবেয়া চৌধুরীর বাবা আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী। মা রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী কালজয়ী কবিতা চাষা (সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা) কবিতার কবি। রাবেয়া চৌধুরী বিএনপি প্রতিষ্ঠাকালীন জেলা বিএনপির সদস্য। বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামে কিংবা দলের দুর্দিনে তার ব্যাপক অবদান রয়েছে। এ জন্য বিএনপিতে এক আলোচিত নাম রাবেয়া চৌধুরী।

তৎকালীন পাক-ভারত উপমহাদেশের একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক পরিবারের সন্তান বেগম রাবেয়া চৌধুরী। বাবা ছিলেন প্রখ্যাত জমিদার পরিবারের ও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী ও মা ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা’ শীর্ষক চাষা কবিতা

র কবি রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী। বয়সের দিক থেকে বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী বেগম রাবেয়া চৌধুরী মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সেই স্নেহময়ী মাকে হারান। পিতা ও পরিবারের অন্যদের স্নেহ-মমতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বার বার জেল খাটতে হয়েছে তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা পিতা আশরাফ উদ্দীন চৌধুরীকে। রাজনীতির প্রথম দীক্ষাটি আসে রাজনৈতিক পিতার কাছ থেকেই। ‘রাজনীতি হলো জনগণকে দেওয়ার, নেওয়ার নয়’- পিতার এই আদর্শটি সারা জীবন আগলে রেখেছেন বেগম রাবেয়া চৌধুরী। ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে জাতীয় মহিলা সংস্থা কুমিল্লার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই একজন কর্মঠ এবং সাহসী নারী নেত্রী হিসেবে সবার নজর কাড়েন তিনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে ‘জাগদল’ গঠন করলে সাবেক মন্ত্রী ফাতেমা কবিরের সঙ্গে বেগম রাবেয়া চৌধুরীকেও বৃহত্তর কুমিল্লার (কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর) যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত করেন। এই যে রাজনীতিতে পা, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। লায়ন ক্লাব অব কুমিল্লার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আর্তমানবতার সেবায়ও কাজ করেন দীর্ঘদিন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দরপুরে খাল কাটা কর্মসূচি উদ্বোধন করতে এলে তার নজর কাড়েন রাবেয়া চৌধুরী। রাবেয়া চৌধুরীর কর্মযজ্ঞে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ওঠেন বিএনপির তৎকালীন স্থানীয় নেতারা। যার কারণে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর কুমিল্লায় ৭৮ সদস্যবি

শিষ্ট জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা কমিটি করা হলে সেখানে একজন এমপি হয়েও বেগম রাবেয়া চৌধুরীকে ৭৮ নম্বর সদস্য করা হয়। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দলীয় হাইকমান্ডে এ নিয়ে তিনি কোনো অভিযোগ কিংবা অনুযোগ করেননি। নীরবে-নিভৃতে কাজ করে গেছেন দলের হয়ে। ১৯৮৩ সালে তার আহ্বানেই প্রথম বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো কুমিল্লার টাউন হল মাঠে জনসভায় অংশ নেন। আর সে জনসভায় সভাপতি ছিলেন বেগম রাবেয়া চৌধুরী। পরে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। গত কমিটিতেও তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১/১১ এর সময় দেশের জাঁদরেল রাজনীতিক নেতারা যখন কারাগারে কিংবা আত্মগোপনে তখন মাঠে সরব ছিলেন রাবেয়া চৌধুরী। এ সময় তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে দলের সাংগঠনিক সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে দলকে উজ্জীবিত করে তুলেন।
শেষ কথা জানতে চাইলে কুমিল্লার প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাবেয়া চৌধুরী বলেন,আমি জীবনে কারও কোনও ক্ষতি করিনি। কুমিল্লায় আমার কোন শত্রুও নেই। আমি সবার কাছে আমার জন্য দোয়া চাই।