বৃহস্পতিবার ৬ †g ২০২১


কেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোররা?


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.01.2021

নিউজ ডেস্ক।।

বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি রাজধানীর মহাখালীতে পূর্ব শত্রুতার জেরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় ১৬ বছর বয়সী আরিফকে। এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় তারই সমবয়সী অভিযুক্ত দুই কিশোরকে। এদিকে, গত ৮ জানুয়ারি রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় ১৪ বছর বয়সী সিফাত ভূঁইয়াকে। এ ঘটনায়ও গ্রেফতার করা হয় ছয় কিশোরকে।
আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, প্রেমের বিরোধ, মাদকসহ নানা অপরাধে কিশোররা খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। তারা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। অধিকাংশ কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মদত রয়েছে। এছাড়া, হিরোইজম প্রকাশ করতেও পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২০ সালে নানা কারণে সারাদেশে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ২৬৪ কিশোর নিহত হয়েছে। যেখানে ২০১৯ সালে একই বয়সীদের নিহতের সংখ্যা ছিল ২২১ জন। এছাড়া ২০২০ সালে ৭ থেকে ১২ বয়সী নিহত হয় ১২৪ জন। আর, ২০১৯ সালে একই বয়সী নিহতের সংখ্যা ছিল ১০৩ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর-তরুণরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের বিপথগামী হওয়ার আগেই সামাজিক আন্দোলন জরুরি। কিশোরদের অভিভাবকরাও রয়েছেন বেখেয়াল। সন্তান কোথায় সময় কাটায়, কী করে, তার কোনও খোঁজ নেন না। সমাজের মুরুব্বি শ্রেণিও উদাসীন। মুঠোফোন বা প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি বিষয়কে ঘিরে কিশোরদের মধ্যে গড়ে উঠছে গ্যাং। আধিপত্য ধরে রাখতে চড়াও হচ্ছে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর। এক কথায় পান থেকে চুন খসলেই মারামারি, হাতাহাতিতে জডড়য়ে পড়ছে তারা। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় অনেকেই এসব কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে উৎসাহী করে তুলছে।
কিশোরদের যে সময়টা ঝুঁকি নেওয়ার বয়স; সেই সময়টাতে তারা তাদের এনার্জি ফিজিক্যালি-মেন্টালি নানাভাবে ব্যবহার করতে চায় উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রিস্ট) ডা. মেখলা সরকার বলেন, ‘ঠিকমতো বেড়ে ওঠার সুযোগ না পেলে ভুল পথে চলে যেতে পারে কিশোরেরা। এই সময়টায় তারা চায় নানা ধরনের হিরোইজম দেখাতে। শিশু-কিশোররা প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। কিশোরা অনলাইনে জড়িয়ে পড়ার প্রভাবে বিভিন্ন গেমসের মাধ্যমে ভায়োলেন্সের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিভিন্ন গ্যাংয়ে জড়িয়ে নানা ধরনের অপরাধ করছে।’
ডা. মেঘলা সরকার আরও বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ নেই, মেধা বিকাশের কোনও সুযোগ নেই। আগে যেমন নানা ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল, সে রকম সুযোগ-সুবিধা বর্তমানে নেই। বাবা-মায়েরাও কিন্তু বর্তমানে এসব এনকারেজ করেন না। গত এক বছরে করোনার জন্য এই শিশু কিশোররাই সবচেয়ে বেশি ভিকটিমাইজ হয়েছে।’
অভিভাবকরা বলছেন, করোনাকালীন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় বাসাতেই সময় কাটাচ্ছে শিশু-কিশোররা। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রযুক্তির কল্যাণে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ নিয়েই সময় পার করছে তারা। পড়াশোনার তেমন চাপ না থাকায় বাসায় সময় কাটাচ্ছে। যতটুকু সম্ভব নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। তবে কিছু সময়ের জন্য বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বের হয় তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘বর্তমানে কিশোরদের অপরাধের ধরণ পরিবর্তন হয়েছে। গ্যাং কালচার হচ্ছে, পরস্পরের সঙ্গে মারামারিতে জড়াচ্ছে, একজন আরেকজনকে মেরে ফেলছে। এছাড়া কিশোররা ধর্ষণের মতো ঘটনার সঙ্গেও জডড়য়ে যাচ্ছে।’
তৌহিদুল হক মনে করেন যখন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা পারিবারিকভাবে কিশোরদের বড় করার ক্ষেত্রে নির্দেশনা না থাকে, শিক্ষাব্যবস্থা যখন বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত থাকে, তখনই একটি দেশের কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ অথবা অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।
কিশোরদের অপরাধের বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘কিশোর অপরাধীসহ সব ধরনের অপরাধের ব্যাপারেই তৎপর রয়েছি। এ জাতীয় অপরাধীদের অধিকাংশই বখে যাওয়া কিশোর। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার।’