শুক্রবার ৫ gvP© ২০২১
  • প্রচ্ছদ » লিড নিউজ ১ » যেভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন মেয়রসহ আ’লীগের সকল প্রার্থী


যেভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন মেয়রসহ আ’লীগের সকল প্রার্থী


আমাদের কুমিল্লা .কম :
21.01.2021

লাকসাম পৌরসভা

 

স্টাফ রিপোর্টার।।
কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের পূর্ণ প্যানেল বিজয়ী হয়েছে। মেয়র, ৯টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত তিনটি ওয়ার্ডে নারী কাউন্সিলর পদে একাধিক প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। পৌরসভার দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে তারা বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করলেও তাদের বিরুদ্ধে উঠেছে বিভিন্ন অভিযোগ।
আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছাড়া অন্যান্য দলের কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ না করতে একজনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নমিনেশন ফরম ক্রয়ের পর থেকেই হুমকি-ধমকি ও হামলা চালিয়ে মারধর করে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এক মন্ত্রীর শ্যালকের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ১৬ জানুয়ারি লাকসাম পৌরসভার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দেন মাত্র দুজন। তারা হচ্ছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত বর্তমান মেয়র অধ্যাপক মো. আবুল খায়ের ও বিএনপি সমর্থিত মো. বেলাল রহমান মজুমদার। গত ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিন ত্রুটিজনিত কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বেলাল রহমান মজুমদারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি আপিল না করায় গত ১০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক মো. আবুল খায়ের মেয়র পদে পুনরায় বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পৌরসভার সাধারণ কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিনে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ১নং ওয়ার্ডে মোহাম্মদ উল্লাহ, ২নং ওয়ার্ডে খলিলুর রহমান, ৩নং ওয়ার্ডে অ্যাডভোকেট মাসুদ হাছান, ৪নং ওয়ার্ডে মো. আবদুল আজিজ, ৫নং ওয়ার্ডে মনসুর আহমদ মুন্সি, ৬নং ওয়ার্ডে আবু সায়েদ বাচ্চু, ৭নং ওয়ার্ডে মো. শাহজাহান মজুমদার, ৮নং ওয়ার্ডে মো. দেলোয়ার হোসেন, ৯নং ওয়ার্ডে গোলাম রাব্বানী এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডে নাসিমা আক্তার ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডে নাসিমা সুলতানা ও ৭, ৮, ৯নং ওয়ার্ডে মুশফিকা আলম মিতা বিজয়ী হন। নির্বাচনে তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। একাধিক প্রার্থী না থাকার কারণে অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে এলাকার মানুষের মুখে মুখে প্রচার-প্রচারণা চলছে যে, এক মন্ত্রীর শ্যালকের কারণেই অনেকে ভয় পেয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এজন্য নির্বাচনের আগেই দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যাদেরকে দলীয় সমর্থন দেয়া হয় তাদের অনেকের কোনো রাজনৈতিক ব্যাক গ্রাউন্ড নাই। মহব্বত (মন্ত্রীর শ্যালক) চাইছেন যারা দলের সমর্থিত প্রার্থী তাদেরকে অবশ্যই পাস করাতে হবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী কোনোভাবেই যাতে বিজয়ী না হতে পারে, সে জন্য কৌশল নিতে হবে। আর সেই বিশেষ কৌশল হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছ ফরম নিয়ে যেতে হবে। যে সিদ্ধান্ত সে কাজ। অনেকের কাছ থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওইসব মনোনয়ন ফরম মন্ত্রীর শ্যালকের লোকজনকে দিয়ে নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
লাকসাম পৌরসভা নির্বাচনের বিএনপি প্রার্থী বেলাল রহমান মজুমদার বলেন, ‘মনোনয়ন যাচাই-বাছাই দিন আমার প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীকে সাথে নিয়ে উপজেলা গিয়েছিলাম। সমর্থনকারী আমার পেছনে ছিল। প্রস্তাবকারীকে সাথে নিয়ে অফিসের ভেতরে যাই। আমি আগেই জানতে পেরেছিলাম আমার সমর্থনকারীরা গেলে তাদের ওপর আক্রমণ (হামলা) করবে। ইউএনও স্যারের সাথে কথা বলে পুলিশ প্রটেকশনে তাকে ভেতরে ঢুকাতে চেয়ে ছিলাম। গেটের ভেতরে তার উপরে হামলা করে তার অবস্থা খারাপ করে ফেলে। ইউএনও স্যারকে বললাম, সে আমার সমর্থনকারী তাকে একটু সেফ করেন। তখন উনি ওসি স্যারকে খুঁজে, উমুকে খুঁজে, এই আর কী। তবে ওইদিন বিকেলে ইউএনও প্রেস বিফ্রিংয়ে বলেছেন, আমার প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারী না থাকার কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়ে গেছে।
বিএনপি প্রার্থী বেলাল রহমান মজুমদারের সমর্থনকারী মাহবুবুর রহমান মানিক বলেন, ‘খায়ের (আওয়ামী লীগের প্রার্থী) গ্রুপের সমর্থনকারী লোকজন আমাকে মারধর করে। আমি উপজেলার গেটে ছিলাম। আমি তো প্রার্থীর পেছনেই ছিলাম। সমর্থনকারী না হওয়ার জন্য অনেক হুমকি আগে পেয়েছিলাম। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন নাম্বারের হুমকি তো দিয়েছে।’ বেলাল রহমান মজুমদারের প্রস্তাবকারী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সমর্থনকারী উপজেলা যুবদলের সভাপতি ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী (বর্তমান পৌর মেয়র) আবুল খায়ের বলেন, ‘কাউকেই বসানো হয়নি, সবাই স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করেছে। বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নাই।’ বিএনপির প্রার্থীর সমর্থনকারীকে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানান।
৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী কাশেম ভূঁইয়া। তিনিও পরে বাধ্য হয়েছিলেন মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে। আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার নমিনেশন পেপার নিয়ে তারা বানচাল করেছে। ৩১ ডিসেম্বর লাকসাম উপজেলা গেটে আমার কাগজগুলো নিয়ে যান। আমি আগে বুঝতে পারছিলাম, বেশ কয়েক কপি করে রেখে দিয়েছিলাম। অরিজিনাল কপিটা আমার বড় ভাইয়ের কাছে রেখে দিয়েছিলাম। আমার সাথে আরেকজন ছিল। তার কাছেও এক কপি দিয়ে রেখেছিলাম। সেই কপিটা মনসুর আহমেদের লোক আনোয়ার হোসেন নিয়ে গিয়েছিল। তারপর উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে জমা দিয়েছিলাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘‘এরপর থেকে আমাকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রথমে আমাকে দেখা করতে বলেন লাকসাম উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত আলী। তিনি মন্ত্রী সাহেবের শ্যালক। তিনি আমার কথা শুনে নির্বাচন করার জন্য বলেন। তার একদিন পর থেকে আমার কাছে আওয়ামী লীগের লোক আসা শুরু হলো। গোবিন্দপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামীম, কান্দিপাড় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক, টুটুল দেখা করেন। এরপর দেখা করেন উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি গোলাপ হোসেন, ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবুল হোসেন, একই ওয়ার্ডের যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল হোসেন। তারা আমাকে নির্বাচন থেকে অব্যাহত নেয়ার জন্য বলেন। তাদের সাথে মহব্বত আলীর অফিস পিয়ন আবু তাহের এসেছিলেন। সে আমার বড় ক্ষতি করেছে। আমি নেতাদের সঙ্গে ড্রইং রুমে কথা বললেও সে ঘরের ভেতরে ঢুকে আমার স্ত্রীকে বলে, ‘ভাবি এখানে বিরাট অসুবিধা হয়ে যাবে। মহব্বত আলী অফিসের সামনে অত্যন্ত দুই-আড়াই শ মোটরসাইকেলে সন্ত্রাসী বাহিনী প্রস্তুত করেছে আপনার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে’। এরপর আমার সাত ভাইকে বিভিন্ন হুমকি দেয়া হয়। এরপর পরিবারের কথা চিন্তা করে আমি নমিনেশন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছি।’’
আবুল কাশেমের বড় ভাই মো. আবু তাহের বলেন, আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের শ্যালক হলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত আলী। তিনি আমাকে খবর দিয়ে ডেকে নিয়েছেন। মহব্বত আলী বলেন, আপনার ভাইকে বলেন নমিনেশন প্রত্যাহার করে নিতে। আমাদের মন্ত্রী মহোদয় একজনকে দিয়েছে এখানে দুজনকে দেয়া যাবে না। তিনি আমার ছয় ভাইকে বিদায় করে দিয়ে আমাকে থাকতে বললেন। সবাইকে বিদায় করে দেয়ার পরে বলেন, অ্যাক্সিডেন্ট হলে আমি দায়ী না।
তবে বর্তমান কাউন্সিলর মনসুর আহমদ মুন্সি বলেন, ‘এমন কিছু ঘটেনি। তার লোকজন কোনো কাগজ নেননি।’ ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬ জন প্রার্থী ছিল। তারা সকলেই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল আলীম দিদারও ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। অধিকাংশ প্রার্থীর ফরম আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী প্রার্থী আবু ছায়েদ বাচ্চু বলেন, ‘কয়েকজন আমাকে ভালোবেসে বসে গেছে। আর দুই-একজন ছিল। সাবেক কাউন্সিলর ফরম নিয়েছিলেন। কিন্তু জমা দেয়নি।’
‘ফরম নিয়ে গেছেন’-এমন প্রশ্নের জবাবে বাচ্চু আরো বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় (স্থানীয় সরকারমন্ত্রী) দল থেকে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। সে যেহেতু দল করে মন্ত্রী মহোদয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এই হিসেবে উনি আর দাঁড়ায়নি (নির্বাচনে অংশ নেননি)। বিএনপির প্রার্থীও আমাকে সমর্থন জানিয়ে বসে গেছে।’
বাবুল মিয়া ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমার কাগজপত্র শাহজাহান মজুমদার নিয়ে গিয়েছে। ৯ তারিখ আমি ফরম জমা দেয়ার জন্য যাচ্ছিলাম। শেরাটনের পেছনে কাছে আসলে আওয়ামী লীগের ৪০-৫০ জন লোকজন শাহজাহান মজুমদারের নেতৃত্বে হামলা করে। আমার সাথে থাকা আমান নামে একজনকে মারধরও করে। দৌড়ে একটা মোবাইলের দোকানে গিয়ে অবস্থান নেই। শাহজাহান মজুমদারই আমার কাছ থেকে জোর করে ডকুমেন্টগুলো নিয়ে যায়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী বর্তমান কাউন্সিলর শাহজাহান মজুমদার বলেন, ‘প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। পরে তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কোনো জায়গাতেই ভেজাল হয় নাই।’
লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউনুস ভূঁইয়া বলেন, ‘অন্য কোনো প্রার্থী তো নমিনেশন পেপার দাখিল করেনি। শুধু একজনই করেছে। সেটাও বাছাই পর্বে বাদ পড়েছে। কিন্তু তিনি আপিল করেননি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে বাধা দেইনি। আমরা চেয়েছি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হোক। নির্বাচনে কেউ না আসলে আমরা তো ধরে এনে বলতে পারি না যে, আপনি নির্বাচন করেন।’ বিএনপির প্রার্থীর সমর্থনকারীকে উপজেলা
গেটে মারধরের বিষয়ে লাকসাম উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এ. কে. এম সাইফুল আলম বলেন, ‘এই ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। বিএনপির প্রার্থী বললেও লিখিত অভিযোগ করেনি।’ গাড়ি পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রিটার্নিং অফিসার কী কখনো গাড়ি পাঠাবে প্রার্থীকে আনার জন্য? আমি কেন গাড়ি পাঠাবো? প্রশ্নই উঠে না।
ওসি সাহেবকে বলছি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য, ওসি সাহেব নিজে গেছেন, প্রার্থী যিনি আছে তাকে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে পুলিশ উনাকে পুরো সাপোর্ট দেবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে কোনো প্রার্থীকে আনা যায়?’
এ বিষয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মন্ত্রীর শ্যালক মহব্বত আলীকে একাধিক বার ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
সূত্র : দৈনিক মানবকন্ঠ