সোমবার ৮ gvP© ২০২১
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » একুশে পদক নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আলী তাহের মজুমদার


একুশে পদক নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আলী তাহের মজুমদার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
23.01.2021

শাহাজাদা এমরান।।
‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে মাঝে মাঝে মনে হয় ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র নির্বাচন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৭০’র নির্বাচন এবং ৭১’র মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে চেতনা ও আদর্শকে সামনে রেখে অংশ নিয়েছিলাম এই ৬০ বছরে কি তা বাস্তবায়িত হয়েছে। একুশের পদক চালু হওয়ার পর যাদেরকে এ পদকের জন্য নির্বাচিত করা হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই কি সত্যিকার অর্থে এ পদক পাবার অংশীদার? ঢাকার বাইরে মফস্বল শহর কিংবা গ্রাম গঞ্জে আজো ৫২’র যেই গুটি কয়েক সৈনিক বেঁচে আছে রাষ্ট্র কি তাদের যথাযথ না হোক নূন্যতম সম্মান করতে পেরেছে কিংবা সম্মান জানানোর প্রয়োজন বোধ করছে? ফেব্রুয়ারি মাস এলেই কুমিল্লা শহর কিংবা আশেপাশের কয়েকটি এলাকায় আমার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এরপর ১১টি মাস কেউ কি নূন্যতম কোন খোঁজ খবর আমার নিয়েছে’ একথা গুলো এক নিশ্বাসে বলে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলেন ভাষা সৈনিক ৯৩ বছরের বয়ষ্ক আলী তাহের মজুমদার। চোখের পাতা ছল ছল করা উঠা এই বীর সেনানী ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২ শুক্রবার জুমাবাদ সদর দক্ষিণের চাঁদপুরের নিজগ্রামে শুনিয়েছেন ৪৬ থেকে ৭১ পর্যন্ত তার বীরত্বের কথা। জানিয়েছেন পাওয়া না পাওয়ার বেদনা, বুঝিয়ে দিয়েছেন, ৫২’র চেতনা দিয়ে বীর বাঙ্গালীর দামাল ছেলেরা ৭১’এ দেশ স্বাধীন করলেও পরবর্তীতে সেই চেতনা কেন দেশ সেবায় নিয়োজিত করতে পারল না বা পারছে না।
ভাষা সৈনিক আলী তাহের মজুমদার ১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কুৃমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৃত মো: চারু মজুমদার এবং পিতা সাবানী বিবি। ৫ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তার অবস্থান তৃতীয়। স্থানীয় চাঁদপুর সরকারী প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কুমিল্লা বঙ্গবিদ্যালয় ও জিলা স্কুলে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। তারপর জড়িয়ে পড়েন নানা আন্দোলন সংগ্রামে। ছাত্র অবস্থায় ১৯৩৫ সালে কংগ্রেস রাজনীতিতে জড়িয়ে ১৯৪২ সনে ভারতদ্বার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২য় মহাযুদ্ধের সময় ৮ম সঞ্চার গ.ঞ আর্মিতে যোগ দিয়ে ১৯৪৫ সনে এলাকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরুধী কমিটি করে। কুমিল্লাতে দাঙ্গা প্রশমনে সহায়তা করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দী শরৎ বসুর পরিকল্পিত বাংলা ভাষা ভাষীা এলাকা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের সমর্থক ছিলেন। ১৯৪৮ সালে কুমিল্লা বিমান বন্দর এলাকার জমি অধিগ্রণের সময় ক্ষতিপূরণ আদায়ের গঠিত বাস্তহারা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন আলী তাহের মজুমদার। এসময় জ.ঝ.চ দলের সদস্যে হন এবং কুমিল্লা অমূল্য স্মৃতি পাঠাগার পরিচালনার দায়িত্বের পাশাপাশি কুমিল্লা বিজ্ঞান শিল্পী সংঘের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ৫০ এর দশক পূর্ব পাকিস্তান লীগ জেলা কমিটির অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৫২ সনে ভাষা আন্দোলনে বৃহত্তর কুমিল্লার যে কয়েকজন কৃতি সন্তান সামনে থেকে সক্রিয় কর্মী হিসেবে আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আলী তাহের মজুমদার তাদের অন্যতম। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ ছাত্রদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এ খবর কুমিল্লায় পৌঁছলে উত্তাল হয়ে উঠে কুমিল্লার রাজপথও। সন্ধ্যার দিকে রাজগঞ্জ থেকে মিছিল করে আসার পথে কোতয়ালী পুলিশ পিছন থেকে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সারা রাত আটকিয়ে রেখে সকালে তাকে ছেড়ে দেয়। ১৯৫৩ সনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুমিল্লায় এসে জ.ঝ.চ কর্মীদের সাথে আলোচনা করে আওয়ামীলীগে যোগদানের আহবান করলে তিনি জ.ঝ.চ থেকে আওয়ামীলীগে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পরে ৩ বৎসর কারা ভোগ করে ১৯৫৬ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়েই কুমিল্লা সদর থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১ বৎসর পর কুমিল্লা পদ্ধতির জনক ড. আখতার হামিদ খানের আহবানে সমবায় আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি নিরলস ভূমিকা পালন করেন এবং প্রথম যে ৫টি কৃষি সমবায় সমিতি করা হয় তার একটি হয় নিজ গ্রামে চাঁদপুর যাত্রাপুর কৃষক সমবায় সমিতি নামে। তিনিই প্রথম ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৬৫ সনে হালিমা সুতাকলে শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সনে ৬ দফার পক্ষে কুমিল্লায় ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সনের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ২নং সেক্টরের কে ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন। ১৯৭২ সনে কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৪ সনে কুমিল্লা কৃষকলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ভাষা সৈনিক আলী তাহের মজুমদার বলেন, ইতিহাস ক্রমাগত বিক্রিত হচ্ছে। কেউ সত্যি কথা বলে না। সত্য বলতে কি, ৫২’র ভাষা আন্দোলন করার জন্য কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না। দেশে তখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যারাই ছিল তারা কেউ ই এ ব্যাপারে প্রথম কোন ভূমিকাই রাখে নি। শুধু মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই প্রথম জিন্নার ভাষণের প্রতিবাদ করে বলেছে, রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই। তৎকালীন সময়ে প্রথম প্রথম দেশের সাধারণ মানুষ মনে করত এটা ছাত্রদের আন্দোলন। কিন্তু আস্তে আস্তে দেশের ছাত্রসমাজ আন্দোলনকে একটা যৌক্তিক পর্যায় নিয়ে যান এবং এটাকে সাংগঠনিক কাঠামোতে দাঁড় করান। ৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে কুমিল্লার ঘটনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আলী তাহের মজুমদার স্মৃতি হাতড়ে বলেন, কুমিল্লায় আমাদের কোন অফিস ছিল না। শহরের নজরুল এভিনিউয়ে বর্তমানে যেটা ডা. মোসলেহ উদ্দিনের বাসা সেখানে আর.এস.পি’র অফিস ছিল। আমরা কখনো এ অফিস থেকে আবার কখনো অমূল্য স্মৃতি পাঠাগার থেকে সাংগঠনিক কাজ গুলো চালাতাম। ভাষা আন্দোলন চালাতে গিয়ে এক সময় তীব্র টাকার অভাব বোধ করলাম। চুঙ্গা নিয়ে নেমে পড়লাম রাজপথে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা আমাদের বিশ্বাস করত। এক আনা, দুই আনা যার যার সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করত। কুমিল্লায় মূলত মোহাম্মদ উল্লাহ, জিয়াউল হক, আক্কাছ মাষ্টার ও আমি আন্দোলন দেখভাল করতাম। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুযারি জিয়াকে ঢাকা পাঠালাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কাছে, খবরা খবর আনার জন্য। ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর পর্যন্ত কোন খবর না পেয়ে খুব কষ্টে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সাথে ফোনে যোগাযোগ করলাম। তিনি প্রথম কোন কথা না বলে চুপ করে রইলেন। পরে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ঢাকার রাজপথ পুলিশের গুলিতে লাল, তোরা যা করার কর। মুহূর্তেই আমরা কুমিল্লা শহরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নেমে পড়লাম। মিছিল করে রাজগঞ্জ থেকে আসার পথে পুলিশ আমাকে পিছন থেকে আটক করে থানায় নিয়ে সারারাত আটকে রাখল পরের দিন সকালে ছেড়েছে। দুঃখ করে তিনি বলেন, মাতৃ ভাষা রক্ষা আন্দোলন করতে গিয়ে যৌবনের মোক্ষম সময়টা শেষ করেছি।
সংসার স্ত্রী-সন্তানকে সময় দিতে পারিনি। নির্মম নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেছি। সন্তান হিসেবে বড় হয়ে বাবা মার প্রতি যে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল তা করতে পারিনি। কিন্তু আজ যখন দেখি রাষ্ট্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে একুশ পদক ঘোষণা ও প্রদান করে তখন ভাবি এ পদক প্রাপ্তরা কোথায় ছিল সেদিন। আমি তাদের ছোট করার জন্য বলছি না। মনের দুঃখে আজ আপনাকে বললাম। রাষ্ট্রের উচিত হবে, ৫২’র ভাষা আন্দোলন করেছে এমন যারা এখনো বেঁচে আছে দেশের আনাচে কানাচে তাদের খুঁজে বের করে কোন আর্থিক সাহায্য না দিয়ে হলেও তাদের একুশে পদকে ভূষিত করা হোক। তাহলে মারা গেলেও তাদের আত্মাটা এই ভেবে শান্তি পাবে যে, রাষ্ট্র আমাদের সম্মান জানিয়েছে। এর বেশী কি বা আমাদের চাওয়ার আছে।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অতীন্দ্র মোহন রায় ও কুমিল্লা টাউনহলের বর্তমান সহ সভাপতি হাবিবুল্লাহ চৌধুরীর পিতা এড. হেদায়েত উল্লাহ চৌধুরীকে নিজের রাজনৈতিক দীক্ষা গুরু আখ্যায়িত তিনি বলেন, তাদের কাছে শিখেছি দেশপ্রেম কাকে বলে। একুশের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে, ৫৪’র নির্বাচন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৭০’র নির্বাচন এবং ৭১’র মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে বিজয় অর্জন করেছি। বলতে কষ্ট হয় তারপরেও বলছি সেই চেতনাকে ধারণ ও লালন করে এখন কেন দেশকে আমরা এগিয়ে নিতে পারি না। দেশ মাতৃকার প্রতি দরদ না থাকলে চেতনা সৃষ্টি হবে কিভাবে। ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছরে দাঁড়িয়ে আজ সজোরে কান্না করে বলতে ইচ্ছে হয়, রাষ্ট্র, ৬০ বছর গত হল, তোমার উচ্চ আদালতে কেন এখনো বাংলায় রায় হয় না। দেশের সর্বত্র, কেন এখনো বাংলা ব্যবহার হয় না। দেশের ইংরেজি স্কুলগুলোর নাম এমন ভাবে রাখা হচ্ছে বলতেও খারাপ লাগে। আমি ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে না। কিন্তু যে ভাষার জন্য রক্ত ঝরালাম আমার ভাইদের হারালাম, সুখ শান্তি বিসর্জন দিলাম সে ভাষার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা হবে না কেন?
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিক আলী তাহের মজুমদার বলেন, আমার বর্তমানে আর কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। ৯৩তে পা দিয়েছি। জীবন শেষ। সরকার, কুমিল্লার প্রশাসন, সুধী সমাজসহ গোটা কুমিল্লাবাসীর প্রতি আমার অনুরোধ, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি একটি পাঠাগার হিসেবে গড়ে তুলুন। বিশেষ করে এখানে ভাষা আন্দোলনের যাবতীয় তথ্য, বই পুস্তক, তৎকালীন সময়ের পত্রপত্রিকা থাকবে। এই পাঠাগার এমন একটি পাঠাগার হবে যাতে বিশ্বের নানা প্রান্তের লোকজন গবেষণা করতে এখানে আসে।
৭১’র বীর সেনানী আলী ইমাম মজুমদার আরো বলেন, মানবিক কারণে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা উচিত। এ বিচার সম্পন্ন করা না হলে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মা ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম হারানো গ্লানি কিভাবে আমরা মুছবো। তিনি বলেন, এ দেশের রাজনীতিবিদরা যতদিন একুশের মূল চেতনাকে বাঙ্গালী হিসেবে ধারণ ও লালন না করবে ততদিন এ দেশ ও জাতি এগুতো পারবে না। তিনি সবাইকে একুশের চেতনা ও ৭১’র মূল্যবোধ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে বলেন, যে সংস্কৃতি আমার ধর্ম-বর্ণও কৃষ্টিতে নেই যে সংস্কৃতি আমার মূল চেতনার সাথে সম্পৃক্ত না, সে সংস্কৃতি দিয়ে একুশের চেতনা বাস্তবায়িত হবে না দেশও এগিয়ে যাবে না বলে তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন।