সোমবার ৮ gvP© ২০২১


মনোমোহন দত্তের কোরআন সাধনা-অতিথি কলাম-২


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.01.2021

জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল।।
যেসব সমাজ সংস্কারক কীর্তিমান মহাপুরুষের সাধনায় আলোকিত হয়েছে মানব সমাজ, তাদেরই একজন মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। বিখ্যাত মলয়া সঙ্গীতের রচয়িতা অধ্যাত্মিক সাধক কবি মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। বাংলা ১২৮৪ সালের ১০ মাঘ তৎকালীন ত্রিপুরার জেলার নবীনগরের সাতমোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সঙ্গীত সাধক মনমোহন দত্ত। বাবা পদ্মনাথ দত্ত এবং মা হরমোহনী। হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া মনোমোহন রপ্ত করেন কোরআন, বাইবেল। ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায়ও ছিল তার অভাবনীয় দক্ষতা। বহু গান, কবিতা প্রবন্ধ, রচনা করেছেন তিনি।
অল্প বয়স থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন ‘মানব সেবাই পরম ধর্ম’, মানব হৃদয়েই তিনি খোঁজে পেয়েছেন ঈশ্বরকে। মনোমোহনের নাতি বিল্বভুষণ দত্ত বলেন, ‘মনোমোনের জীবন দর্শনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বিভেদ ও কুপ্রথা বিরোধী চিন্তার পরিচয় মেলে তার রচনায়। তিনি তার জীবনদ্দশায় কোনো মূর্তির পুজা করেননি। করেছেন এক ঈশ্বর দয়াময়ের সাধনা।
মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পাস করা ক্ষণজন্মা এ মহাপুরুষ ছিলেন একাধারে মহাঋষি, মরমী সাধক, কবি, প্রবন্ধকার, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক।’ তিনি লিখেছেন- সর্বধর্ম সঙ্গীত, শ্যামাসঙ্গীত, দেহতত্ব, ইসলামী, বাউল, সূফিবাদ ও লোকসঙ্গীত। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয় তার রচিত ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ। এমন উঁচু মাপের সঙ্গীত রচনা করে গেছেন তিনি, যেগুলো তাত্ত্বিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সমকালীন আর্থ সামাজিক, ধর্মীয় তথা জীবন ও সমাজে ক্রিয়াশীল নানা সঙ্কট নিরসনের উদ্দেশ্যে ক্রমাগত মানুষের চিত্তে প্রশান্তি যোগায়। তাঁর রচিত মলয়া গানগুলোতে সুর দিয়েছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ’র বড় ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ।
এ প্রসঙ্গে কবি ও গবেষক আসাদ চৌধুরী বলেন, ‘মনোমোহন দত্ত রচিত গান রবীন্দ্রনাথকে শুনিয়ে ছিলেন ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ। গানগুলো পছন্দ করেছিলেন কি না তা জানা যায়নি। তবে, একথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ আবার যেতে বলেছিলেন ফকির আফতাব উদ্দিন সাহেবকে। ভালো না লাগলে হয়তো আর যেতে বলতেন না। এদিকে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে মলয়া সঙ্গীত ও তাঁর আসল সুরগুলো।’
একবার ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এর শিক্ষক, গবেষক প্রয়াত ড. মাহবুব পিয়াল বলেছিলেন, ‘‘প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে মনোমোহনের অনেক গান, বিকৃত হচ্ছে তাঁর রচিত গানের আসল সুর। ‘যতোসব কানার হাট-বাজার’ মনোমোহনের এ গানটি চালিয়ে দেয়া হচ্ছে লালনের গান বলে। যার গান তারই মালিকানা থাকা উচিত।’’ গবেষক অধ্যাপক শ্যামা প্রসাদ ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘‘আমরা নির্দধায় বলতে পারি মলয়ার গান মানুষেরে হৃদয়ে যে অনাস্বাদিত পুলক সৃষ্টি করেছে তার কোনো বিকল্প নেই। এই আত্মতত্ত্বজ্ঞ সাধক বহু আঙ্গিকে সংগীত রচনার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের চিরন্তন আবেগের বাণীরূপ দান করেছেন। এখনও তাঁর গান শুনে শ্রোতা ক্ষুধায় অন্ন, তৃষ্ণায় জল, অন্ধে ষষ্টির এবং পথভ্রান্ত আলোক রশ্মির সন্ধান পায়।’ ‘তাঁর শ্যামা সংগীতের অনিন্দ্য সুন্দর ভাবগাম্ভীর্য ভক্তের মর্ম্মস্পর্শী প্রাণের কথা স্বভাব সুলভ সুন্দর বাণী ভক্তীতে শাশ্বত রূপ লাভ করেছে। মনোমোহনের শ্যামা সংগীতের মুর্চ্ছনা সবাইকে দিব্যভাবে উদ্বুদ্ধ করে।’’
তাঁর গান ও তাঁর সুরকে বাঁচিয়ে রাখার দাবি মনোমোহন ভক্ত রনদা প্রসাদ সাহার মতো অনেকেরই। মনোমোহন লিখেছেন, ‘মন মাঝে যেন কার ডাক শোনা যায়।’ আর পরবর্তীকালে এই ভাবধারায় সিক্ত হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখছেন, ‘খোদার প্রেমে শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে।’ ‘মানব সেবাই পরম ধর্ম।’ ‘স্রষ্টাকে রাজি করতে হলে তার সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে।’ ‘যে হৃদয়ে সৃষ্টির প্রতি প্রেম নেই, সে হৃদয়ে ধর্ম নেই, সে হৃদয়ে স্রষ্টা নেই। সে হৃদয় কপটতায় ভরপুর।’ মনোমোহন সেবাকেই পরম ধর্ম মানতেন। মনমোহন ঈশ্বরের সন্ধান করেছেন সারাজীবন। ধর্মের গোঁড়ামি ছিল না তাঁর মাঝে। ঈশ্বরকে পেতে তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। গ্রামে গ্রামে ছুটে গেছেন ধর্মালোচনায়।
সর্বোপরি তিনি যেন নিজের অন্তরেই ঈশ্বরের ডাক শোনতে পেয়েছিলেন। আর তাইতো তিনি করুণ সুরে গেয়েছেন, ‘মন মাঝে যেন কার ডাক শোনা যায়।’ বাংলা ১৩১৬ সালের ২০শে আশ্বিন মাত্র ৩১ বছর ৭ মাস বয়সে পরলোকগমন করেন এই মহাপুরুষ। যদিও তিনি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার মরদেহ হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী আগুনে না পুড়িয়ে ইসলামী নিয়মানুযায়ী কবরস্থ করা হয়। তার ইচ্ছানুসারে তার সাধনাস্থল বেল তলায়তাকে সমাধিস্ত করা হয়।
রচনাবলী: সুন্দর ও গভীর ভাবব্যঞ্জক প্রায় ১০০০ কবিতাপূর্ণ ‘তপোবন’, ‘উপবন’, ‘নির্মমাল্য’ তিনটি কাব্যগ্রন্থ। আত্মতত্ত সাধনের জন্য লিখেছেন ‘প্রেম ও প্রীতি’, ‘পথিক’, ‘সত্যশতক’, ‘ময়না’, ‘যোগপ্রণালী’, ‘উপাসনা তত্ত্ব এবং ঋণী’। তিনি লিখেন ‘সর্বধর্ম তত্ত্বসার’ নামে অতিজটিল তত্ত্বসম্পর্কীয় ২০০টি বিষয়ের সহজ বোধগম্য প্রকাশ পুস্তক।
মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯) এবং লবচন্দ্র পাল ( ১৮৮২-১৯৬৬) সর্বকনিষ্ঠ। সর্বজন কথিত মনোমোহনের ‘ম’, লবচন্দ্রের ‘ল’ এবং আফতাবউদ্দিনের ‘য়া’ নিয়ে ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ। এর অর্থ শান্তির হাওয়াও হতে পারে। ১৯১৬ সালে ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মনোমোহনের রচিত ‘মলয়া’ কাব্যগ্রন্থে গানের সংখ্যা মোট ৪২৬টি তার মধ্যে ‘মলয়া’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম খণ্ডে ২৮৭টি ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৩৯টি মরমী গান লিপিবদ্ধ রয়েছে।
মাত্র ৩১ বছর ৭ মাস জীবনে এই ক্ষণজন্মা মনীষী ঋত্বিক কবি যে সৃষ্টিকর্ম ও মরমী সূফিবাদ সাধনার চিহ্ন রেখে গেছেন তা চিরকালের অমূল্য সম্পদ এবং আত্মার পাথেয় হয়ে মানব জাতিকে পথ দেখাবে।
লেখক: জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, পরিচালক, ঐতিহ্য কুমিল্লা।
২২ জানুয়ারী ২০২১