সোমবার ৮ gvP© ২০২১


কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি চরমে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.01.2021

# পাল্টা কমিটি গঠন ও নানা অনিয়মের অভিযোগ
# মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের সরকারি আইন কর্মকর্তা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ
# বিরোধ অব্যাহত থাকলে আসন্ন বার নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কা

শাহাজাদা এমরান।।
নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম, এক নেতা কেন্দ্রিক বার নেতৃত্বকে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা,বীরমুক্তিযোদ্ধা,মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও পরীক্ষিত আওয়ামী লীগদের বাদ দিয়ে হাইব্রিড আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের দিয়ে এডিশনাল পিপি,স্পেশাল পিপি ও এপিপি নিয়োগকে কেন্দ্র করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে চরম উপদলীয় কোন্দল বিরাজ করছে। এত দিন ধরে নিরবে চলে আসা কোন্দল গত ১৭ জানুয়ারি পাল্টা কমিটি গঠনের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ্যে চলে আসে। আসন্ন বার এসোসিয়েশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে বেড়ে উঠা এই কোন্দল নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রবীণ আইনজীবীরা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, টানা তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করেও যেখানে বারে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী প্যানেলের সাথে আমরা পেরে উঠি না সেখানে দ্বিধাবিভক্ত সংগঠন নিয়ে তো চরম ভরাডুবির মধ্যে পড়তে হবে যদি না এখনি গ্রুপিং মেটানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়।
জানা যায়, ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত কুমিল্লাসহ সারা দেশেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের পৃথক দুটি সংগঠন ছিল। একটি আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আর অপরটি হলো বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ। ২০১৭ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পৃথক দুটি সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিয়ে সবাইকে নিয়ে একটি সংগঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে ওই কমিটি ভেঙে দিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ গঠন করা হয়। বর্তমান আইনমন্ত্রী এড. আনিসুল হক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপসের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়ে আসছে এই কমিটি। যদিও এই নেতৃত্বের প্রতি দেশের আওয়ামী সমর্থিত আইনজীবীদের বিশাল একটি অংশের রয়েছে নানা ক্ষোভ।
গত কয়েক দিন ধরে কুমিল্লার আদালত অঙ্গন ঘুরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রায় অর্ধশত সিনিয়র জুনিয়র আইনজীবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লায় সরকার সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে নানা কারণে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করছে। কেন ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের মধ্যে এই কোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে তা জানতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। নানা অনিয়ম, সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগে বাণিজ্য,পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ ঘরনার আইনজীবী, বীরমুক্তিযোদ্ধা আইনজীবী ও বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান আইনজীবীদের প্রভাব খাটিয়ে সরকারি আইন কর্মকর্তা থেকে বাদ দেওয়া,একই জায়গায় হাইব্রিড আইনজীবীদের নিয়োগ, ক্ষেত্রবিশেষ বিএনপি-জামায়াত থেকে অনুপ্রবেশকারী আইনজীবীদের সুযোগ করে দেওয়াসহ জেলা বারে রাজনৈতিক বিশেষ একটি বলয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বীরমুক্তিযোদ্ধা এড.আবুৃল বাশারের সাথে কথা বললে কিছুটা অভিমানের সুরে তিনি বলেন, কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো এটা তারাই বলতে পারবে যারা আমাকে বাদ দিয়েছে। তিনি এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি হননি।
মুুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বিশিষ্ট ভাষা সৈনিক প্রয়াত এড.আহমেদ আলীর দ্বিতীয় ছেলে এড.নিশাত সালাউদ্দিন বলেন, বলতে বড় লজ্জা হয়। তারপরেও বলছি, আজ যারা নিজেদের আওয়ামী লীগ বলে দাবি করেন তারা কি আমার বাবা অ্যাড.আহমেদ আলী থেকেও বড় আওয়ামী লীগার ছিলেন কুমিল্লায়। বাবা জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ইচ্ছে করলে জীবিত অবস্থায় এই নাম বিক্রি করে অনেক কিছু করতে পারতেন কিন্তু করেননি আমাদেরও তা শিখিয়ে জাননি। অথচ সামান্য একটি এপিপি থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হলো শুধুমাত্র নিজেদের বলয় ও আধিপত্য বিস্তার করার জন্য। এভাবে আর কত কুমিল্লা বারে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের তারা অপমান করবে। এই অপমান যদি আজ বিএনপি জামায়াত করত তাহলেও মনকে বুঝ দিতে পারতাম। কিন্তু করেছে তারা যারা আওয়ামী লীগ নামধারী আইনজীবী।
সরকার সমর্থিত কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী জানান, ২০১৯ সালে একবার সিনিয়র আইন কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ৭০ জন আইনকর্মকর্তা তারা নিয়োগ নিয়ে আসেন। যাদের বাদ দেওয়া হয়েছে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে কি তাদের অপরাধ ছিল এটা তারা জানতেও পারল না। চলতি বছর আবার সেই সিন্ডিকেট একই বলয় থেকে আবার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে আসেন। তাদের বলয় কেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে ইতিমধ্যে সরকারি আইন কর্মকর্তা থেকে বাদ পড়েছেন , এড.গোলাম ফারুক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এড.আবুল বাসার(কমান্ডার),এড. আবুল কাশেম, এড.সিদ্দিকুর রহমান ও এড. আলী আজাদ।
ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা এই পাওয়া না পাওয়ার বেদনার কারণেই গেল বছর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করেও ১৭টি পদের মধ্যে সভাপতিসহ মাত্র ৫টি পদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। অপরদিকে, কিছুটা ভিতরে ভিতরে গ্রুপিং থাকলেও নির্বাচনের সময় সবাইকে এক সাথে মাঠে নামাতে পারার সক্ষমতার কারণেই জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম জেলার বারের ১৭টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ ১২টি পদে জয়লাভ করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের মধ্যে এবার সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে নানা ক্ষোভ ইতিমধ্যে বিক্ষোভে রূপ নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে গেছে।
গত ১৭ জানুয়ারি রোববার কুমিল্লা আইনজীবী সমিতি ভবনের ৭নং হল রুমে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রায় তিন শতাধিক আইনজীবী এক সভায় মিলিত হয়। এই সভায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের নেতৃত্ব দেওয়া নেতা লাকসাম উপজেলা চেয়ারম্যান এড.ইউনুস ভুইয়াসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দদের প্রতি তাদের অনাস্থা জ্ঞাপন করে বলেন, এই নেতৃত্ব জেলা বারের চার জন বীরমুক্তিযোদ্ধা আইনজীবী ও একাধিক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আইনজীবীদের সরকারি আইন কর্মকর্তা থেকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবমাননা করেছে। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বীরমুক্তিযোদ্ধা এড.আবুল বাশার। এই সভায় বিশিষ্ট আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিনকে আহ্বায়ক ও সাবেক পিপি এড.মোস্তাফিজুর রহমান লিটনকে সদস্য সচিব করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ কুমিল্লার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি গঠনের মধ্যে দিয়েই ভেঙে গেল কুমিল্লায় ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবগঠিত বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ কুমিল্লার আহ্বায়ক এড.মাসুদ সালাউদ্দিন বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে কুমিল্লা বারে আমাদের দলীয় নামধারী আইনজীবীরা যে সকল অনিয়ম আর অন্যায় করে আসছে, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পরিক্ষিত আইনজীবীদের বঞ্চিত করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করার হীন উদ্দেশ্যে এবং একজন নেতার বলয় সৃষ্টি করার জন্য যারা সরকার দলীয় আইনজীবীদের সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্য কাজ করে আসছে তাদের সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্যই বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শের সৈনিক আইনজীবীরা আজ একই প্লাট ফরমে এসে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ কুমিল্লার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে। কথা দিচ্ছি, এই কমিটি সরকারী আইন কর্মকর্তা নিয়োগ বাণিজ্য করবে না। দলের আদর্শ বিকিয়ে দিয়ে নিজের হীন স্বার্থ চারিতার্থ করবে না। আগামী ১১ মার্চ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ কুমিল্লার পক্ষ থেকে একটি পূর্ণ প্যানেল দিয়ে আমরা নির্বাচন করব ইনশাআল্লাহ।
অপরদিকে, অপর পক্ষের নেতা লাকসাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও সিনিয়র আইনজীবী ইউনুস ভুইয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ যারা করেছে তাদের কোন ভিত্তি নেই। এটি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য করা হয়েছে। সরকারী আইন কর্মকর্তার পদ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তানদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার প্রবীণ এই আইনজীবী নেতা বলেন, এটা আইনমন্ত্রী বাদ দিয়েছে আমরা না। এটা আমাদের বলার কিছুই নেই।