সোমবার ৮ gvP© ২০২১


হাজী মোঃ কাউছ মিয়ার রেকর্ড : আবারও দেশ সেরা করদাতার ১ নাম্বারে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
03.02.2021

স্টাফ রিপোর্টার।।
চাঁদপুরের কৃতী সন্তান হাজী মো. কাউছ মিয়া আবারও দেশ সেরা করদাতা হয়েছেন। তিনি হাকিমপুরী জর্দার স্বত্বাধিকারী। ২০১৯-২০ বর্ষে ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে সারা দেশে সর্বোচ্চ করদাতা হয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাকে সিআইপি মর্যাদার ট্যাক্স কার্ডসহ সম্মাননা দেবে ।

গুলশান-বনানী কিংবা মতিঝিলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বার নেই মোঃ কাউছ মিয়ার। পুরান ঢাকার আগা নওয়াব দেউড়ি রোডে হাকিমপুরী জর্দার কারখানার একটি কক্ষই তাঁর ‘চেম্বার’। মৌলভীবাজার থেকে সরু এই গলিপথ ধরে কিছুটা পথ হাঁটলেই তাঁর কারখানা। সেখানেই বসেন তিনি। গুলশান-বনানী, মতিঝিলের ডাকসাইটে ব্যবসায়ীদের পেছনে ফেলে পুরান ঢাকার ঘুপচি গলির এই ব্যবসায়ীই প্রতিবছর সর্বোচ্চ করদাতা হন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি ব্যবসায়ী শ্রেণিতে সর্বোচ্চ করদাতার একজন। এই নিয়ে তিনি টানা ১৩ বার দেশ সেরা করদাতা নির্বাচিত হলেন। প্রতিবারই শীর্ষ করদাতাদের তালিকায় তাঁর নাম ছিল সবার উপরে।

অবশ্য অন্য শ্রেণির সর্বোচ্চ করদাতারা প্রতিবছর কর হিসেবে যত টাকা দেন, তাঁরা কাউছ মিয়ার ধারেকাছে নেই বলে জানিয়েছেন এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা।
জাতীয় ট্যাক্সকার্ড নীতিমালা, ২০১০ (সংশোধিত) অনুযায়ী সম্প্রতি ২০১৯-২০ করবর্ষের জন্য সেরা করদাতা হিসেবে ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে ব্যক্তি শ্রেণিতে ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে কাউছ মিয়া ছাড়াও সেরা করদাতার সম্মাননা পেয়েছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, মো. নুরুজ্জামান খান ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কামাল।

হাজী মোঃ কাউছ মিয়া ৬১ বছর ধরে কর দিয়ে আসছেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম কর দেন তিনি। কেন কর দেওয়া শুরু করলেন, এর ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। ২০১৯ সালে এনবিআরের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আগে টাকাপয়সা এখানে-সেখানে রাখতাম। এতে নানা ঝামেলা ও ঝুঁকি থাকত। ১৯৫৮ সালে প্রথম কর দিয়ে “ফ্রি” হয়ে গেলাম। এরপর সব টাকাপয়সা ব্যাংকে রাখতে শুরু করলাম। হিসাবনিকাশ পরিষ্কার করে রাখলাম। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১ নম্বর করদাতা হয়েছিলেন কাউছ মিয়া।

কাউছ মিয়া চাঁদপুর জেলার রাজরাজেশ্বর গ্রামে (ব্রিটিশ আমলের ত্রিপুরা) ১৯৩১ সালের ২৬ আগস্ট সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের বাড়ি হাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল।তাঁর বাবার নাম হাজী আব্বাছ আলী মিয়া মাতা ফাতেমা খাতুন। পিতা- মাতা কেউ বেঁচে নেই।
কাউছ মিয়ার বাবা চাইতেন না তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে নামেন। তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। আর ব্যবসায় মন পড়ে থাকা কাউছ মিয়া ১৯৪৫ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস করে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দামামায় আর পড়াশোনা এগোয়নি। পুরানবাজার মধু বাবুর স্কুল লেখাপড়া করেন তিনি।ওই স্কুলের পাশেই তাঁর নানা জমিদার মৌলভী আব্দুস সালাম সাহেবের বাড়ি।
বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাউছ মিয়া মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ১৯৫০ সালে চাঁদপুরের পুরান বাজারে স্টেশনারি দোকান দেন।
এরপর ধীরে ধীরে সেখানে তিনি ৫/৬ টি দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন এবং ১৮টি ব্র্যান্ডের সিগারেট, বিস্কুট ও সাবানের এজেন্ট ছিলেন।
পরের ২০ বছর তিনি চাঁদপুরেই ব্যবসা করেন। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন এবং তামাকের ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে ৪০-৪৫ ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তিনি।

তবে তাঁর মূল ব্যবসা তামাক বেচাকেনা। রংপুরে তামাক কিনে সেখানেই বিক্রি করেন। একবার তিনি আমদানির ব্যবসায় নামতে লাইসেন্স নিয়েছিলেন। এ ব্যবসায় কারসাজি না করলে টিকে থাকা মুশকিল, এটা চিন্তা করে আমদানির ব্যবসা ছাড়েন। বর্তমানে নদীপথে পণ্য পরিবহনের জন্য বেশ কিছু কার্গো জাহাজ আছে কাউছ মিয়ার। এই ব্যবসা তাঁর ছেলেরা দেখাশোনা করেন।

কী চিন্তাভাবনা থেকে এত বছর সরকারকে কর দেন, দেশপ্রেম নাকি দায়িত্ববোধ। জানতে চাইলে কাউছ মিয়া বলেছিলেন, দেশপ্রেমতো আছেই,তা’ছাড়া
‘কর দিলে টাকা হোয়াইট (বৈধ) হয়। আমার যা মন চায় তা-ই করতে পারব। কেউ হামলা করবে না।এ জন্যই আমি সব সময় কর দিয়ে আসছি। তিনি বলেন,১৯৫৮ সাল থেকে নিয়মিত কর দিই। স্বাধীনতার পরও সেটি অব্যাহত রেখেছি।
হাজী মোঃ কাউছ মিয়ার বর্তমান বয়স ৯০ বছর। এই বয়সেও এখনো তিনি দশ-বারো ঘন্টা ব্যবসায়ীক কাজে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সুস্থ রাখার মালিক আল্লাহ, এটা আল্লাহর নেয়ামত।
উল্লেখ্য, চাঁদপুরের এই গর্বিত সন্তান ব্যবসায়ী হিসেবে যেমন দেশ সেরা,তেমনি মানবসেবায়ও সেরা তিনি। একজন দানবীর সমাজ সেবক হিসেবে দেশব্যাপী তার বেশ সুনাম রয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু তাকে অস্ত্রের লাইসেন্সও দিয়েছিলেন।
১৯৫৪ সাল থেকে এ যাবৎ ১৯ বার দেশে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। দেশের যে প্রান্তেই বন্যা ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস নদী ভাঙ্গন পাহাড়ধস আঘাত হেনেছে এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক করোনা দেখা দিয়েছে। প্রতিটি দুর্যোগের সময় তিনি বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ত্রান-সাহায্য দিয়েছেন।
৮৮’র ভয়াবহ বন্যার সময় টানা একমাস ৯৮’র বন্যার সময় প্রায় দুই মাস দেশের বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দি মানুষের দোরগোড়ায় রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়ে কাউছ মিয়া দেশ-বিদেশে বেশ সুনাম অর্জন করেন।
২০২০ সালে ঘাতক করোনার দুর্যোগকালীন সময়েও প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ত্রান সাহায্য দিয়ে মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এভাবেই তিনি ৬৫ বছর যাবত মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।
একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বাধিক অ্যওয়াড প্রাপ্তির রেকর্ড এখন তার।