মঙ্গল্বার ২৬ অক্টোবর ২০২১
Space Advertisement
Space For advertisement
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » না ফেরার দেশে চলে গেলেন শিল্পী ওস্তাদ মিলন আহমেদ


না ফেরার দেশে চলে গেলেন শিল্পী ওস্তাদ মিলন আহমেদ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
08.02.2021

গত ৭ ফেব্রুয়ারি রোববার না ফেরার দেশে চলে গেলেন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট যন্ত্র সংগীত শিল্পী ওস্তাদ মিলন আহমেদ। এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক দুই সাধারণ সম্পাদক।মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ফেসবুক থেকে নেয়া এই স্মৃতিচারণ আমাদের কুমিল্লার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ফি আমানিল্লাহ্ মিলন ভাই

বাকীন রাব্বী।।
কুমিল্লার প্রতি এত প্রেম এত ভালোবাসা খুব কম মানুষেরই দেখেছি। ইচ্ছা করলে কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকায় গেলেই তিনি অনায়াসে জাতীয় পর্যায়ের একজন যন্ত্রবিদ হতে পারতেন। তাঁর অনেক ছাত্র ছাত্রী দেশ বিদেশে দাপটের সাথে তাঁর শেখানো কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু মিলন ভাই কুমিল্লা ছেড়ে কোথাও যাবেন না।
বলছিলাম কুমিল্লার যন্ত্রবিদ ওস্তাদ মিলন আহমেদের কথা। মিলন ভাইকে চিনি ১৯৭৪-৭৫ সাল থেকে, তখন তিনি ‘দি রিদম’ নামে একটি শিল্পী গোষ্ঠী গড়েছিলেন।
জামিল ভাই, কাউয়ূম ভাই ছাড়াও আরও কয়েকজন শিল্পী ছিলেন তাঁদের দলে, যাঁদের সবার নাম এ মুহুর্তে মনে পরছে না। এর পর ৯০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে চৌধুরী মার্কেটে মিলন ভাইয়ের দোকানে নিয়মিত আড্ডার কথা আমার সদ্য প্রকাশিত বইয়েও লিখেছিলাম। সহজ সরল এ লোকটাকে কখনোই উঁচু স্বরে কথা বলতে শুনি নি। মিলন ভাই এবং ভাবী উভয়েই প্রচুর পান খেতেন। ১০/১২ বছর আগের কথা, শুনলাম মিলন ভাই অসুস্থ তাঁকে দেখতে বাসায় গেলাম। হাঁটু ব্যথার কারনে হাটতে অসুবিধা হচ্ছে, তাই কয়েক দিন বাসার বাইরে যাচ্ছেন না। কিছুক্ষন গল্প করে ভাবীকে বললাম পান দেন, আপনার হাতের পান খেয়ে যাই। ভাবী পান দিতে দেড়ি করছেন পাশের রুম থেকে টুং টাং প্লেট চামচ নাড়াচাড়ার আওয়াজ পাচ্ছি। এ রুম থেকেই ভাবীকে ডেকে বললাম- পান না থাকলে বলেন পাশের দোকান থেকে আপনার নাম বলে পান খেয়ে যাই, আপনি পয়সা দিয়ে দিয়েন। আমার এ কথা শুনে মিলন ভাই বললেন- এ বাড়িতে ভাতের চাল না থাকতে পারে, পান থাকবে না এমনটা হতে পারে না।
৫/৬ বছর আগে মিলন ভাইয়ের এক ছাত্রী নওয়াজেশ রনি এসেছিল আমার কুমিল্লা বাসায়। সে থাকে ম্যানচেস্টার। রনি কুমিল্লা থাকাকালে মিলন ভাইয়ের ছাত্রী ছিল, গিটার শিখতো। রনি বললো তাকে মিলন ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যেতে। আগে ফোন করে নিশ্চিত হলাম তিনি বাসায় আছেন। অনেক দিন পর মিলন ভাইকে দেখে রনি পা ছুয়ে সালাম করলো। মিলন ভাইও তাকে কাছে টেনে নিলেন। গুরু শিখ্যের আবেগঘন মুহূর্ত আমি আর ভাবী (মিলন ভাইয়ের স্ত্রী) উপভোগ করছিলাম। ২০১৯ সালে যখন দেশে গিয়েছিলাম তখনও মিলন ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল বাদুরতলায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলে বিদায় নিয়েছিলাম এ গুণী শিল্পীর কাছ থেকে। মিলন ভাইয়ের সাথে আর দেখা হবে না ভাবতেই আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ফি আমানিল্লাহ্ মিলন ভাই।

ওস্তাদ মিলন আহমেদ, বিনম্র শ্রদ্ধা

সৈয়দ নুরুর রহমান।।
চির বিদায় নিলেন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব,বিশিষ্ট যন্ত্র সংগীত শিল্পী ওস্তাদ মিলন আহমেদ। নিভৃতচারী এই সজ্জন মানুষটি ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ ফেব্রুয়ারী রাত সাড়ে ১১টায় ইন্তেকাল করেন। তিনি কালীপদ মেমোরিয়াল কালচারাল একাডেমির অধ্যক্ষ এবং রিদম শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। ওস্তাদ মিলন আহমেদ বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত শিল্পী। আমাদের জেলা সদরে তিনি দীর্ঘদিন গিটারের শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। গিটারে তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী রয়েছে।
কুমিল্লার মঞ্চে ওস্তাদ মিলন আহমেদ ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বি। যে কোন অনুষ্ঠানে যন্ত্রে তিনি সুরের মুচ্ছনার ঝড় তুলতেন। অমায়িক ব্যবহার, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, ধীর স্থির শান্ত স্বভাবের এই মানুষটিকে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীরা আপন করে নিয়েছিলো। ব্যাঞ্জোসহ নানা ইলেক্টনিক্স বাদ্যযন্ত্রে মিলন আহমেদের ছিলো অসামান্য পারদর্শীতা। তাঁর হাতেগড়া অনেক ছাত্র আজ দেশের যন্ত্রসঙ্গীতে জাতীয় পর্যায়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ওস্তাদ মিলন আহমেদ আপন আবাস ছেড়ে কখনো ঢাকামুখী হননি। কুমিল্লার প্রতি গভীর এক অন্ধ ভালোবাসায় তিনি জড়িয়ে ছিলেন আমৃত্যু। অর্থ, যশ খ্যাতির হাতছানি তিনি বারবার উপেক্ষা করেছেন। বিত্ত বৈভব টানেনি তাকে। শিল্পের প্রতি নিখাদ ভালোবাসায় আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন তিনি। বরাবরই নিভৃতচারি। যন্ত্র সঙ্গীতের প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা তাঁর। জন্ম থেকে যেন এক অনন্য প্রতিভায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আলো ছড়িয়েছেন চৌপাশে। আলোকিত এই মানুষের নিরব প্রস্থানে শোকে মুহ্যমান কুমিল্লা।
অগণিত মানুষের ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধায় চিরবিদায় নেন ওস্তাদ মিলন আহমেদ। ৮ ফেব্রুয়ারি বাদ যোহর ছোটরা মালেকা মমতাজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মরহুমের নামাজের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ওস্তাদ মিলন আহমেদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
জানাযার নামাজের পূর্বে ওস্তাদ মিলন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বক্তব্য রাখেন, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক হাসান ইমাম মজুমদার ফটিক, কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসানাত বাবুল, ড. আলী হোসেন চৌধুরী, জামিল আহমেদ খন্দকার, প্রকৌশলী আবুল বাশার, বশিরুল আনোয়ার, এড. শহীদুল হক স্বপন, জেলা কালচারাল অফিসার আয়াজ মাহমুদ প্রমুখ। পরে ওস্তাদ মিলন আহমেদকে ছোটরা কবরস্থানে দাফন করা হয়।

( কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জনাব বাকীন রাব্বী ও এড.সৈয়দ নুরুর রহমানের ফেসবুক ওয়াল থেকে লেখা দুটি নেয়া হয়েছে। )