বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১
Space Advertisement
Space For advertisement


মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ (রহ:) এর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী


আমাদের কুমিল্লা .কম :
11.08.2018

মোহাম্মদ হাসান ভূইয়া ।।

গত ৯ আগষ্ট কুমিল্লার কৃতি সন্তান হাফেজ মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ (রহ:) এর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল । হযরত হাফেজ মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ ( রহ:) ১৯৬৫ সনে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার তেমুরিয়া গ্রামের এক সম্ভান্ত ও ইসলামী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী আবুল হাশেম ও মাতার নাম তাহেরা খাতুন। স্বাধীনতার পরে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে কুমিল্লা শহরের ঝাউতলায় স্হায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। এক পর্যায়ে তাঁর পিতা হাজী আবুল হাসেম সাহেব তাকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করার পর কুরআনের হাফেজ বানানোর জন্য ইরাদা করেন। শৈশব থেকেই হাফেজ মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ (রহ:) ছিলেন খোদাভীরু অফাদারে মুহাম্মদেরর গোলাম। তাকে হাফেজে কুরআন বানানোর জন্য কুমিল্লার নূর মসজিদ মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। এখান থেকেই তাঁর জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বদলে যায়। সেখানে নূরানী মকতব শেষ করে হিফ্জ শুরু করেন। তারপর বিশ্ব জাহানের উস্তাদ শাইখুল হুফফাজ হযরত হাফেজ মহসিন সাহেব হুজুর (রহ:) কাছ থেকে হিজজুল কুরআন শেষ করেন এবং হুজুরের প্রিয় পাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

উচ্চ শিক্ষার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ইসলামি বিদ্যাপিঠ জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে ইলমে দ্বীন অর্জনের জন্য গমন করেন। সেখানে তিনি কষ্ট ও মুজহাদার সাথে পড়ালেখায় মগ্ন থাকেন। এক পর্যায়ে নানুপুর মাদরাসার থাকাকালীন সময়ে মহাপরিচালক মুর্শিদে বরহক্ব শায়েক জমান হযরত সুলতান আহমাদ নানুপুরি (রহ:) এর ঘনিষ্ঠ সোহবতে ধন্য হন।এমনকি পরর্বতী পীর সাহেব কুতুবে আলম শাইখুল মাশায়েখ আল্লামা শাহ জমীর উদ্দিন নানুপুরি (রহ:) এর নয়নের মণি হয়ে যান। অবশ্যই পরে তিনি হযরতের সু-প্রসিদ্ধ খলিফার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।তারপর উস্তাদদের পরামর্শে ঢাকা পীরজঙ্গি মাদরাসায় ও বারিধারা মাদরাসায় দীর্ঘসময় পড়ালেখা করেন। সেখানে ও ইলমে ও আমলে কৃতিত্বর স্বাক্ষর রাখেন। অতপর তার তা’লীমি মুরুব্বি মোসলেহুতুল্লাব হযরত মাওলানা ইসহাক ফরিদী (রহ:)এর পরামর্শে পাকিস্তানের জামিয়া হানাফিয়াতে উচ্চ শিক্ষার অর্জনেরর জন্য ভর্তি হয়ে সফল হন। সেখানে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন আল্লামা ইউসুফ লুধীয়ানবী শহীদ (রহ:) সংস্পর্শে ধন্য হন।ফলে পাকিস্তান বোর্ড থেকে কৃতিত্বেরর সাথে দাওরা হাদিস এর সনদ লাভ করেন।

কর্ম জীবনে সূচনা হয় কুমিল্লা রাণীরবাজার মাদরাসার কিতাব বিভাগের শিক্ষকতার মাধ্যমে। এত: পর তিনি পাকিস্তান গিয়ে আল্লামা ইউসুফ লুধীয়ানবী শহিদ ( রহ:) এর থেকে ইকরার সিলেবাস নিয়ে এসে ঢাকা চৌধুরী পারায় ইকরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ” ইকরা ” নামক সকল ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সফল রূপকার।
তিনি বহু মাদরাসার, মসজিদ ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের খাদেম ছিলেন । বিশেষ করে তিনি ছিলেন ঢাকা চট্রগ্রাম মহাসড়কের মাঝে কুমিল্লা আলেখারচর বিশ্বরোডে দৃষ্টি নন্দিত জামিয়া মাদানিয়া রওজাতুল উলূম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম ও ইকরা রওজাতুল আতফাল স্কুল ও মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন।

হাফেজ মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ (রহ:) প্রায় অর্ধশত বার পবিত্র হজ্জ্ব ও ওমরাহ করার সৌভাগ অর্জন করেন। এমনকি ইন্তিকালের কয়েকদিন আগেও তাঁর আম্মা এবং তাঁর পরিবারে সকলকে নিয়ে শেষবারের মত ওমরাহ হজ্জ্ব পালন করে আসেন। তাছাড়াও তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমন করার সুযোগ ও সৌভাগ্য অর্জন করেন।

হাফেজ মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ (রহ:) এর মেহমানদারীর প্রসিদ্ধতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। বিশ্ব বরেণ্য বড় বড় উলামায়ে কেরামের সাথে তার এতই মুহাব্বত ছিল যে, তারা বিনা দাওয়াতে তার মেহমান হয়ে যেতেন। অতচ যাদেরকে শত বৎসর দাওয়াত দিয়েও পাওয়া যায় না। তন্মোধ্যে দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক মুহতামিম হযরত মাওলানা মারগুবুর রহমান (রহ:) ছিলেন অন্যতম। তাছারাও শাইখুল হাদিস আল্লামা আবদুল হক আজমি (রহ:), মুফতি হাবীবুর রহমান খয়রাবাদী (রহ:), হযরত মাওলানা ইব্রাহীম আফিরুকী ও হযরত মাওলানা বেলাল বাওয়া সাহেব সহ বিশ্বের আরও অনেক গন্য-মান্য উলামায়ে কেরাম। তাছারাও বাংলাদেশের মধ্যে যাদের সাথে তাঁর সু- সম্পর্ক ছিল হযরত মাও. সুলতান আহম্মদ নানুপুর (রহ:) , হযরত মাও. জমীর উদ্দিন নানুপুরি (রহ:) , শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ:), মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ:) এবং আল্লামা আহমেদ শফী (দা:বা:) সহ বাংলাদেশের র্শীর্ষস্হনীয় সকল ওলামায় কেরাম।

তিনি ছিলেন অত্যান্ত সামাজ প্রিয় ও সামাজিক লোক। তিনি দ্বীনি সামাজিক অনেক প্রতিষ্ঠানে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। তন্মোধ্যে কুমিল্লা জেলা কওমী মাদরাসা সংগঠন, হাজী আবুল হাসেম ফাউন্ডেশন। জমিরিয়া দাওয়াত সেন্টার, হুফফাজুল কুরআন বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় জেলার সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেন।

উম্মতে মুহাম্মদের ফিদা এই মর্দে মুজাহিদ হাফেজ মাওলানা উবায়েদ উল্লাহ (রহ:) তাঁর মা,স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গত ০৯-০৮-২০১৬ইং মোতাবেক ৫ ই জ্বিলকদ,১৪৩৭ হিজরী রোজ মঙ্গলবার এশার নামাজের পর হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৫১বৎসর বয়সে কর্মময় জীবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কালেমা পরছিলেন। তাঁর মা তাকে জমজমের পানি খাওয়াচ্ছিলেন। ঠিক ঐ মুহুর্তে আল্লাহ বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আখিরাতের সফর শুরু করেন। তাঁর জানাজায় প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে হাজার হাজার শোকাহত মানুষ ও দেশের শীর্ষস্হানীয় উলামায়ে কেরাম, রাজনীতিবিদ সহ আরো ও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কুমিল্লা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় ইমামতি করেন তাঁর বড় ছেলে হাফেজ তালহা বিন ওবায়েদুল্লাহ। অতঃপর তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মাদানিয়া রওজাতুল উলূম মাদরাসার মাকবারায়ে ওবাইদিয়াতে তাকে দাফন করা হয়।