রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Space Advertisement
Space For advertisement


করোনা টিকাদানের কর্মসূচির স্বচ্ছতা অপরিহার্য


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.01.2021

অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চল

দিল্লী ও ঢাকার কুটনৈতিক সূত্রে জানা যায় ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের তৈরি অক্সফোর্ডের এস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ টিকা বাংলাদেশে পৌঁছবে। অক্সফোর্ডের টিকা কোভিশিল্ড নামে বাজারজাত করছে সেরাম ইনস্টিটিউট। ১৬ জানুয়ারি’২১ থেকে এই টিকা ভারতের মানুষকে দেয়া শুরু হয়েছে। ভারত সরকার উপহার হিসেবে এ টিকা বাংলাদেশের মানুষকে দিচ্ছে। উপহারের বাইরে সেরামের কাছ থেকে টিকা কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকার, বেক্সিমকো ও সেরামের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এ চুক্তি অনুযায়ী ২৫শে জানুয়ারির মধ্যে ৫০ লাখ টিকা আসার কথা রয়েছে। ২০ জানুয়ারি’২১ বিশেষ বিমানে আসছে ২০ লাখ টিকা যা ক্রয়চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। সহযোগিতার টিকাই প্রথম দেয়া শুরু হবে। শুরুতেই ১০ লাখ লোককে টিকা দেয়া শুরু হবে বাকি ১০ লাখ দ্বিতীয় ডোজের জন্য রাখা হবে। এ জন্য টিকাদান সংক্রান্ত পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এ লক্ষে কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা। ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির টিকা দেশে পৌঁছার পর সেগুলো দেয়া শুরু হবে।
টিকাগুলো বিমানবন্দর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) গ্রহনের পর তারা তাদের নিজস্ব গোডাউনে নিয়ে যাবে অথবা তেজগাঁ অধিদপ্তরের নিজস্ব টিকা রাখার স্থানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় (২ থেকে ৮ ডিগ্রি) রাখা হবে। আর এগুলো পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির টিকা পরিবহনের ব্যবহৃত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি। অধিদপ্তর বলেন আমাদের চুক্তির ৫০ লাখ টিকা কখন আসবে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না তবে যেহেতু ২০ লাখ টিকা আগে আসবে তাই এগুলোই প্রথমে দেয়া শুরু হবে। সেরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে সরকারের করা চুক্তি অনুযায়ী তিন কোটি ডোজ টিকা বাংলাদেশ পাবে ছয় মাসের মধ্যে। বাংলাদেশে সেরাম ইন্সটিটিউটের টিকার সরবরাহকারী হিসাবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা সরবরাহ করবে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাকসিন এন্ড ইমিউনাইজেশন এবং কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনসের গড়া প্লাটফর্ম কোভ্যাক্স জুন’২১ এর মধ্যে বাংলাদেশ পাবে বলে সরকার আশা করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে মাঠ পর্যায়ে করোনা ভাইরাসের টিকা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দেশে কেরাভাইরাসের সংক্রমন নিয়ন্ত্রণ সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ। একই সঙ্গে ১৮ই জানুয়ারি’২১ সংসদ অধিবেশনে তিনি তার বক্তব্যে আরও বলেন সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে সব ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে সরকার। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায় করোনার টিকা দেয়ার জন্য এখনই পুরোপুরি প্রস্তুত নয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কারা শুরুর দিকে টিকা পাবেন, তাদের বয়স ও পেশাভিত্তিক অগ্রাধিকার ঠিক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। টিকাগ্রহীতাদের অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। সেই নিবন্ধনের জন্য অ্যাপ তৈরির কাজ এখনও শেষ হয়নি। এছাড়া টিকা কেন্দ্রের তালিকা এখনও চুড়ান্ত হয়নি। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি। এদশের কোটি কোটি শিশুদের ইপিআই এর টিকা তালিকা করে নিয়মিত স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা সহকারীরা দিয়ে যাচ্ছে যাতে ড্রপ আউট কখনোই শতকরা দশ ভাগের বেশি দেখা যায় নাই। সেরাম ইন্সটিটিউটের টিকাও ২ থেকে ৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সুরক্ষিত থাকে যা ইপিআই এর টিকাসমূহের জন্য প্রযোজ্য। সেই সূত্রেই ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, যে কোন সময় ১৫ কোটি টিকা রাখার মতো সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আছে এবং টিকা দেয়ার জন্য ৪২ হাজার লোক প্রশিক্ষণ পাবেন।
জাহিদ মালিক বলেন, সরকার ছয় সাত মাস ধরে টিকার জন্য কাজ করছে। ভারতের পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে। তিনি বলেন “আমরা দেখেছি অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমাদের জন্য সুবিধাজনক। দামের দিক থেকেও সবচেয়ে কম। এই টিকার ট্রায়ালও হয়েছে। এর কার্যকারিতা ভাল। সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই আমরা এ টিকা আনার ব্যবস্থা করেছি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলায় এই টিকা দেয়া হবে।” বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভেক্স জানুয়ারি’২১ মাসের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছিল, বাংলাদেশ ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা নিতে আগ্রহী কিনা? স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, “ফাইজার চার লাখ মানুষের জন্য আট লাখ ডোজ টিকা দিতে চেয়েছে। আমরা এ বিষয়ে ডব্লিউএইচও’র সঙ্গে কাজ করছি। তারা যেসব কাগজপত্র চেয়েছে, তা তৈরি করে আমরা পাঠিয়েছি। এখন তারা জানাবে কবে টিকা পাব।” মিট দ্যা প্রেসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার সেরামের প্রতিটি কোভিশিল্ড টিকা চার ডলারে কিনবে। আর পরিবহনসহ সংরক্ষণ বাবদ টিকা প্রতি এক ডলার করে দেয়া হবে। চুক্তিতে আছে ভারত সরকার কম দামে কিনলে বাংলাদেশও কম দামে পাবে। চার ডলারের বেশি দাম হলে বাংলাদেশ বেশি দামে নেবে না। বেসরকারি পর্যায়ে আসা টিকার মূল্য নির্ধারণ, টিকা আনা ও দেয়ার অনুমতি সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হবে। সব টিকার দাম এক হবে না। বেসরকারিভাবে টিকা দেয়ার নীতিমালাও সরকার ঠিক করে দেবে।
১৯ জানুয়ারি সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, উপজেলা হাসপাতালে দু’টি দল টিকা দেবে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬টি দল করোনার টিকা দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া বিশেষায়িত হাসপাতালে কিছু দল রাখা হবে। সারা দেশে দৈনিক ২ লাখ মানুষকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে অধিদপ্তর। এদিকে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যপক এবিএম খোরশেদ আলম সাংবাদিকদের বলেছেন ভারত থেকে আসা টিকা রাখার জন্য তিনটি বিকল্প স্থানের কথা ভাবা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ইপিআই এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ঢাকা জেলার ইপিআই এর স্টোর এবং কেন্দ্রীয় ঔষধাগার। প্রথম দফায় ১৩ লাখের বেশি মানুষকে টিকা দেয়া হবে যাদের বয়স ৮০ বছরের বেশি। সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মী ও অগ্রাধিকার পাওয়া মানুষের টিকাদানের মধ্যে দিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বা গ্রামে কোন টিকা কেন্দ্র না হলে গ্রামের মানুষকে উপজেলা সদর বা জেলা সদরে টিকা নেয়ার জন্য আসতে হবে। বয়স্ক মানুষদের এক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি আছে। উপজেলা কেন্দ্র হলে খুব কম মানুষ টিকা নিতে আসবেন। এটা একটি দুর্বল পরিকল্পনার উদাহরণ হবে। বড় শহরে টিকা দেয়া চ্যালেঞ্জিং বলে সেখানে সিটি কর্পোরেশনসহ অন্য সংস্থা সমূহকে টিকাদানে যুক্ত করতে হবে। টিকা দেয়ার পর গ্রহীতাকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণ করতে হবে। টিকা কার্যকর হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য এন্টিবডি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা তৈরি করে চূড়ান্ত কর্মসূচিতে যোগ করতে হবে।
টিকা কিনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৫৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেখানে ১২৭২ কোটি টাকা টিকা ক্রয়ে এবং বাকি ৩১৭ কোটি টাকা অন্য ১৫টি আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আনুষাঙ্গিক ব্যয়ের প্রস্তাব থেকে ১৩৫ কোটি টাকা কাটছাট করে ১৮২ কোটি টাকা নির্ধারন করে। এর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করে ৯১ কোটি টাকা বাদ দেয় অর্থাৎ সব মিলিয়ে টিকা কিনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া প্রস্তাব থেকে ২২৬ কোটি টাকা বাদ দেয়া হয়। বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ৪টি শর্ত দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে-
(১) টিকা কিনতে অর্থ ব্যয়ের জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন নেয়া। (২) যদি কোন কারণে অগ্রিম অর্থ দিতে হয়, সেক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক গ্যারান্টি নেয়া। (৩) এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের ক্রয় নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধিবিধান পালন করা। (৪) টিকা ক্রয় ও কোল্ড চেইন ইকুইপমেন্ট এন্ড সিস্টেম সেফটি বক্স কেনার জন্য ব্যয় করা অর্থের হিসাব এক মাসের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নসহ বিল ভাউচার ও ব্যয় প্রতিবেদন অর্থ বিভাগে পাঠানো। স্বাস্থ্য বিভাগের অযৌক্তিক ব্যয়ে অর্থ বিভাগ বরাদ্দ দেয়নি এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এ ধরনের কাজের বা প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরী বলে অনেক বিবেকবানরাই মনে করেন। ত্রুটিহীন অর্থ বরাদ্দ ও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমেই টিকাদান কর্মসূচি সফল হবে এবং সমগ্রদেশবাসী করোনার বিরুদ্ধে ইমিউনিটি অর্জনে সক্ষম হবে।