রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Space Advertisement
Space For advertisement


আত্মহত্যা নয় – আত্মবিশ্বাসেই জীবন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.02.2021

মতিন সৈকত

নিজেকে হত্যা করার মধ্যে কোন বীরত্ত বা বাহাদুরি নেই। বীরত্ব আছে প্রতিকুল পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে সফলতার সোপানে প্রতিষ্ঠত করার মাধ্যমে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া তোমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য আমাকে স্পর্শ করেনা। আমি কারো খেলার সামগ্রিক নই। আমারও জীবন আছে। সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা আছে।

লক্ষ্য, উদ্দেশ্য আছে। গন্তব্যে পৌছতে আর কটা বছর মাত্র। আজকে যারা অবহেলা অপদস্ত করছো, সময়ের ব্যবধানে তারাই সংবর্ধনা সন্মাননা, পুষ্পস্তবক নিয়ে দাড়িয়ে থাকবে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য চাই কঠোর পরিশ্রম। মনোজগতের পরিবর্তন। আত্মবিশ্বাস, সংগ্রাম, সাধনা। আত্মমর্যাদার লড়াই আর আল্লাহর প্রতি অবিচল দৃঢ় ঈমান।

নিজেকে নিজে হত্যা করা। খুন করা। মেরে ফেলা। পৃথিবী থেকে চির বিদায় করে দেওয়া। নিজের হত্যাকারী নিজে হওয়া। কি সাংঘাতিক ভংয়কর ব্যাপার। নিজের পুরান পাপের বোঝার শেষ নাই। নতুন করে ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ কাঁধে লওয়া, আত্মবলি দেওয়া এর চেয়ে ভয়াবহ দূর্ভাগ্য দুঃসহ দুঃসংবাদ জগতে আর কি হতে পারে?

অন্যের উপর অভিমান করে অন্যের সুবিধার জন্য নিজেকে আত্মবলি কোন সমাধান নয়। জীবন কোন ঠুনকো কাচের গ্লাস নয়। হাত থেকে পড়ে গেলে ভেঙে খান-খান হয়ে যাবে। অথবা কোন ফুল নয়। হাতের ছোঁয়ায় ঘষাঘষিতে ছিড়ে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে। পাত্রে রাখা পানি নয় কাৎ হলেই পড়ে যাবে। ফুরিয়ে যাবে।

জগৎতে যত কিছু আছে জীবনের মত সৌন্দর্য আর একটিও নেই। নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করে জীবনের মূল্যায়ন করতে হবে।

জন্মের আগ থেকেই সন্তানের জন্য বাবা মায়ের কি ব্যাকুলতা। নবজাতক সন্তানের মুখ দেখে মায়ের তৃপ্তির হাসির সাথে পৃথিবীর কোন জিনিসের তুলনা চলেনা। সষ্টার পরে বাবা- মা-ই নির্ভরতা। মা, বাবা তাদের সমস্ত আয়-উপার্জন, সহায়-সম্পত্তি, মান-সন্মান, দান-খয়রাত সব সন্তানের কল্যাণের জন্য ব্যায় করে। মা-বাবা সন্তানের ভালোর জন্য নিজের জীবন কোরবানি দিয়ে দৃষ্টান্তস্হাপন করে। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সমস্ত শক্তি- সামর্থ্য বিনিয়োগ করে। তাদেরকে মানুষ গড়ার জন্য কি না করে? সন্তানের সুশিক্ষা, মার্জিত আচরণ, মানবিক হওয়ার জন্য মাঝে মধ্যে শাসন করে, বকাঝকা করে, চোখ রাঙায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে অভিমান করে যদি সন্তান আত্মহত্যা করে এর চাইতে পোড়া কপাল আর কার হতে পারে?

ইদানিং আত্মহত্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। দেশ সমাজ পরিবারের জন্য মারাত্মক অবক্ষয়। মানবতার বিপর্যয়। সভ্যতার বিলুপ্তি। সমাজের ক্ষয়িষ্ণুতা। রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা। ব্যাক্তির আত্মহত্যা শুধু একজনের মৃত্যু নয়। জাতির মৃত্যুর সামিল। পুরোপরিবারের লজ্জা অপমান অপদস্তের শেষ নেই। তাদেরও সামাজিক মানসিক মৃত্যু ঘটে। মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারেনা। ভিতরে যন্ত্রণা দাবানল দাউদাউ করে।

‘রিসার্স রিপোর্ট বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা বেশি আত্মহত্যা করে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দশম।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের রিপোর্ট থেকে জানা যায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৯৫টি। ২০১৬ সালে ছিল ১০ হাজার ৬০০, ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৫০০ এবং ২০১৪ সালে তা ছিল ১০ হাজার ২০০। প্রতি বছরই আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে এবং গড়ে দেশে প্রতিদিন ৩০ জন আত্মহত্যা করছে। বড়দের সাথে শিশু কিশোরাও যুক্ত হচ্ছে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের এক রিপোর্টে বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

আত্মহত্যা মারাত্মক সর্বনাশ। ভয়াবহ দুসংবাদ। তরুণ প্রজন্ম কোথায় যাচ্ছে? কেন নিজেকে জাহান্নামে বাসিন্দা করছে? এত নাজ-নেয়ামত, এত সুখের মধ্যে কেন আত্মবিনাশ? জীবন মানেই সুখ-দুঃখের সমন্বয়। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খেলা। চাওয়া- পাওয়ার মিলনমেলা। আধুনিক শিক্ষিত প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেন এত হাতশা বাসা বাঁধছে! আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে! কিসের এত ইমোশনাল? কিসের সুইসাইড? জীবন মানেইতো যুদ্ধ। জীবনতো একটাই। একবার গেলে আর ফিরে আসবেনা। সে অমূল্য জীবন। কোন কিছুর বিনিময়ে ফিরে আনা যাবেনা। সময় থাকতে জীবনকে উপলব্ধি উপভোগ করতে হবে। জীবনের অর্থ খুঁজতে হবে। স্বার্থক সুন্দর মহিমান্বিত করতে হবে। ইহকাল পরকালের মুক্তি পথ বেছে নিতে হবে।

যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। আশা নিরাশায় মন দোদুল্যমান হবেই। জীবনের বাঁকে বাঁকে যেমন বাঁধা-বিপত্তি আছে। তেমনি সফলতাও আছে। জীবন নিঃস্কটক নয়। কুসুমাস্তীর্ণ নয়। ফুল শয্যা নয়। শুয়ে বসে পায়ের উপর পা রেখে রিমোট কন্ট্রোলের নাম জীবন নয়। নির্বোধ বোকারাই মনে করে আমিই সেরা। আমার মত জগতে আর একজনও নাই। জীবনে ঘাত-প্রতিঘাত-আঘাত, সুখ-শান্তি-ভালবাসা নিত্যদিনের ব্যাপার।

জীবন বেলুন নয় নাড়াচাড়া পড়লেই ফেটে যাবে। জীবন সিলভারের হাঁড়ি-পাতিলের মত হাজারো ঘাত-প্রতিঘাতের চিহ্ন নিয়ে দিব্যি টিকে থাকার নাম।

প্রতিদিন চুলার আগুনে পুড়ে রান্না করে। কত আঘাত সহ্য করে টেপ পড়ে, দাঘ পড়ে, ভেঙে যায়। তারপর জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে চালিয়ে নেয়। আবার ভেঙে গেলে হাড়িপাতিলের দোকানে বিক্রি করে বা পাল্টে নিয়ে আসে সংসারের কাজ-কর্ম করে তার মতই মানব জীবন।

আত্মাহত্যা জীবনের পরিসমাপ্তি নয়। নিজেও মরলো পরিবারকেও মারলো। দেশ সমাজাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করলো? যে মরেছে সে আগেভাগেই কঠিন কঠোর অকল্পনীয় নারকীয় অবাস্তবিক সিদ্ধান্তনিয়ে নিয়েছে। অন্তর্দন্দের ফায়সালা করে মৃত্যু বেছে নিয়েছে। কেউ আবার তাৎক্ষণিক বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, প্রিয়জন, প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা নিজের অপমানজনক কৃতকর্মের ফলে অথবা কারো একক বা যৌথ বা সম্মিলিত বহুমুখী ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে সমাজচ্যুত হয়ে অসম্মানের ভয়ে আত্মহত্যা করে।

কেউ আবার অন্যের বিষ মজাতে গিয়েও আত্মাহত্যাকে বেছে নেয়।

জন্ম যেমন সত্য মৃত্যুও তেমন। জন্মে যেমন নিজের হাত নেই। মৃত্যুও তেমন। স্বাভাবিক মৃত্যু হচ্ছে সম্মানের, গৌরবের, মর্যাদার নিজের জন্য যেমন সবার জন্য তেমন। অন্যে অন্যের দ্বারা মারা গেলে খুন বা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলেও নূন্যতম সন্মান থাকে। ঈমান রক্ষা পায়।

আত্মহত্যাকে হারাম করা হয়েছে এবং তার পরিণতিতে বলা হয়েছে, আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পদ্ধতি অনুযায়ী তার যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন

‘তোমরা তোমাদের নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর করুণাময়।’ (সূরা আন-নিসা)

আত্মহত্যার যত কারনই থাকুক কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যাকারী চির জাহান্নামী। কোন ধর্ম, জাতি, রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ব্যাক্তি আত্মহত্যাকে সমর্থন দেয়না। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামেও তার সেই যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। আর যে ব্যক্তি ধারালো কোনো কিছু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, তার সেই যন্ত্রণাকেও জাহান্নামে অব্যাহত রাখা হবে।’ (সহিহ বুখারি) আত্মহত্যা থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে নিজের মনোজগতের পরিবর্তন চাই। প্রথম কথা হচ্ছে পৃথিবীতে নিজের মত আর কেউ ভালোবাসতে পারেনা। নিজেকে যদি নিজেই হত্যা করি তাহলে কে রক্ষা করবে? আল্লাহু খায়রুন হাফিজুন। আল্লাহু গাফুরুর রাহীম। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে হেফাজত করেন। জীবন সম্পর্কে যারা ভীতসন্ত্রস তাদের প্রতি যেনো খাছ রহমত বরকত মাগফিরাত দান করেন।

 

লেখক: কৃষি পরিবেশ সমাজ উন্নয়ন সংগঠক।