মঙ্গল্বার ১৮ †g ২০২১


ফরিদের জন্য কাঁদছে এতবারপুরের মানুষ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.03.2021

১৫ দিনে একজন আসামিও গ্রেফতার হয়নি

 

স্টাফ রিপোর্টার।।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার এতবারপুর ইউনিয়নের এতবারপুর গ্রাম। স্থানীয় রুহুল আমিনের বখাটে ছেলে হাবিব উল্লাহর বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল চালানোর প্রতিবাদ করায় পাশর্^বর্তী বাড়ির ছায়েদ আলীর ছোট ছেলে মিজানুর রহমানকে বেধড়ক মারধর করে রুহুল আমিনের আরেক ছেলে জুয়েল। চাচাকে রক্ষা করতে গিয়ে মার খায় ফরিদ মিয়ার দুই মেয়ে রুবি ও নাছরিন। কৃষি কাজ শেষ করে ফরিদ মিয়া বাড়ি এসে শুনে বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল চালানোর প্রতিবাদ করায় ভাই মিজান ও দুই মেয়ে রুহুল আমিনের ছেলে জুয়েলের হাতে বেধড়ক মার খেয়েছে। আপনজনের লাঞ্ছিত হওয়ার অপমান সহ্য করতে না পেরে ফরিদ মিয়া সাথে সাথে যায় রুহুল আমিনের কাছে, যাতে তার বখাটে সন্তানদের বিচার করে। রুহুল আমিনের কাছে বিচার চাওয়ার সাথে সাথে রুহুল আমিন,তার ছেলে আলাউদ্দিন জুয়েল,হাবিবুল্লাহ ও হাবিবুর রহমান ঝাঁপিয়ে পড়ে ফরিদ মিয়ার ওপর। তাদের এলোপাতাড়ি কিল ঘুষিতে মারা যান তিনি। পরে সদ্য স্বামী হারানো ফরিদ মিয়ার স্ত্রী বাদী হয়ে চান্দিনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কোন আসামি ধরতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার দিনের বেলায়। এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে বেশ পরিচিত ফরিদ মিয়ার নিহত হওয়ার ঘটনায় কান্না থামছে না এতবারপুরের। নিরীহ কৃষক ফরিদের জন্য কাঁদছে স্বজনসহ এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের জনগণ। গতকাল সোমবার সরেজমিনে এতবারপুরে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেছে।
কুমিল্লা থেকে সাংবাদিক এসেছে এ কথা শুনেই মুহূর্তের মধ্যেই নিহত ফরিদের উঠান লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। ফরিদ হত্যাকারীদের বিচার চাই সম্বলিত পোস্টার হাতে উঠানেই মানববন্ধন করে ফেলে গ্রামবাসী। সেই মানববন্ধনে উপস্থিত ছিল
নিহতের পরিবার, এতবারপুর ইউনিয়নের দুইজন মেম্বার,মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক,বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার লোকজন,কৃষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রামবাসী। প্রায় সবার চোখে ছিল পানি, মুখে ছিল ফরিদ হত্যাকারীদের বিচার চাই,ফাঁসি চাই নামক নানা শ্লোগান, আর হাতে ছিল পোস্টার।
নিহত ফরিদের স্ত্রী ও মামলার বাদী কুহিনুর বেগম স্বামী হত্যার কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন। দেবর মিজানকে দেখিয়ে বলেন, রুহুল আমিনের ছেলে হাবিবুল্লাহ তার সামনে বেপরোয়া গতিতে চালানোর প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করে জুয়েল। চাচাকে মারছে শুনে আমার দুই মেয়ে দৌড় দিয়ে গেলে তাদেরও মারধর করে। পরে জমি চাষ করে বাড়ি এসে যখন আমার স্বামী শুনলো মোটর সাইকেল বেপরোয়া গতিতে চালানোর প্রতিবাদ করায় ভাই ও দুই মেয়েকে রুহুল আমিনের ছেলে মেরেছে। তখন তিনি বিচার দিতে গেলেন রুহুল আমিনের কাছে। বিচার দেওয়ার সাথে সাথে রুহুল আমি ও তার চার ছেলে আলাউদ্দিন জুয়েল,হাবিব উল্লাহ ও হাবিবুর রহমান দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে কিল ঘুষি ও এলোপাতাড়িভাবে লাথি মারতে শুরু করে ফরিদ মিয়াকে। তাদের অমানবিক নির্যাতনে সাথে সাথে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় মায়ের সাথে তার তিন এতিম মেয়ে রুবি,নারগিছ ও নাছরিনও কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিহত ফরিদ মিয়ার চার মেয়ে ও এক ছেলে। এর মধ্যে বড় মেয়েটি প্রতিবন্ধী।
নারগিছ,রুবি ও নাছরিন বাবার জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখে ফুলে গেছে। কান্না করতে করতেই এই প্রতিবেদককে বলেন, স্যার একটু লেখবেন,আমাদের মতো এত অল্প বয়সে আর যেন কোন সন্তানকে এতিম হতে না হয়। আজ যদি অসুস্থ হয়ে মারা যেত, তারপরও মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। কিন্তু তারা আমার বাবাকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় মেরে ফেলেছে।
নিহত ফরিদের স্ত্রী ও তার তিন কন্যা বলেন, রুহুল আমিন ও তার সন্তানেরা মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। রুহুল আমিনের ছেলে জুয়েলের বিরুদ্ধে এর আগেও থানায় মামলা হয়েছে বলে তারা জানান।
এতবারপুর গ্রাম ও বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রুহুল আমিনের চারটি ছেলেই নানা অপরাধের সাথে জড়িত। এর মধ্যে জুয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। কিছু দিন পর পরই এলাকায় আধিপত্য দেখাতে গিয়ে মানুষকে মারধর করে। যাতে তাদের ভয়ে গ্রামবাসী তটস্থ থাকে।
এতবারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ বলেন, সামান্য তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে ফরিদ মিয়াকে তারা মেরে ফেলেছে, যা সত্যিই দু:খজনক। আমার কাছে হত্যাকাণ্ডটি কিছুটা পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। না হলে এত তুচ্ছ একটি ঘটনা নিয়ে হত্যাকাণ্ডের পর্যায় যেত না। তিনি ফরিদ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, আমি গেল সপ্তাহে একটি মিটিংয়ে সার্কেল এ এসপিকে এই মামলার কথা বলেছি।
এতবারপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি আক্তার হোসেন শাহিন বলেছেন, ফরিদ হত্যার ১৫ দিন হয়ে গেলেও এখনো আসামিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তিনি এই হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
একই ইউনিয়নের ১,২ ও ৩ ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য নাজমুন আক্তার এবং ৪,৫ ও ৬ ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রোজিনা আক্তার বলেন, নিহত ফরিদ খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি সমাজের সবার সাথে মিলে মিশে চলতেন। তাকে যারা হত্যা করেছে অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার করার দাবি জানাচ্ছি।
এতবারপুর মোকামবাড়ি রিজবিয়া সুন্নিয়া জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মিজানুর রহমান রিজভি বলেছেন,এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে ফরিদ হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিজেরা করি সংগঠনের সংগঠক মনোয়ারা বেগম বলেছেন, সামান্য একটি বিষয়ের জের ধরে ফরিদ মিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।
এতবারপুর গ্রামের আবুল হাশেম, আবদুল খালেক, কাকলি বেগম,ঝর্ণা আক্তারসহ প্রায় অর্ধশত নারী পুরুষ এই প্রতিবেদককে বলেন, ভাই, ফরিদ মিয়ার জন্য সারা গ্রাম কাঁদছে। শুধু গ্রাম নয় বাজারে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে দেখুন,সবাই ফরিদ মিয়াকে ভালবাসে,পছন্দ করে। তার কোন শত্রু নেই। সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রুহুল আমিন ও তার ছেলেরা তাকে হত্যা করেছে আমরা তার বিচার চাই।
মামলার বাদী ও নিহত ফরিদের স্ত্রী কুহিনুর বেগম বলেন, হত্যাকারীরা মামলা তুলে নিতে আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপ-পুলিশ পরিদর্শক নোমান বলেন, আসামি ধরার বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। সম্ভাব্য সব স্থানেই আমরা তাদের খুঁজছি।

চান্দিনা থানার অফিসার ইন-চার্জ শামস্উদ্দিন মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান,ফরিদ হত্যাকে আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। প্রযুক্তিও ব্যবহার করছি। তবে তারা মোবাইল পরিবর্তন করাতে একটু দেরি হচ্ছে। এই আসামিদের ধরার বিষয়ে আমাদের টিম তৎপর রয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই আমরা ফরিদ হত্যার আসামিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পারব, ইনশাআল্লাহ। তাছাড়া বাদীদের দেওয়া সকল সম্ভাব্য স্থানেও আমরা অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু পালিয়ে থাকাতে ধরতে দেরি হচ্ছে। আর আসামিদের হুমকি বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম। আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।