রবিবার ৯ †g ২০২১
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » করোনায় অনলাইন ব্যবসায় হিড়িক কুবি শিক্ষার্থীদের


করোনায় অনলাইন ব্যবসায় হিড়িক কুবি শিক্ষার্থীদের


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.04.2021

কুবি প্রতিনিধি।।

এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনিশ্চিত পড়াশোনা আর ভবিষ্যত। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সংকটে পড়েছেন সেসব শিক্ষার্থী টিউশনিসহ বিভিন্ন উপায়ে আয়-উপার্জন করে লেখাপড়া করতেন, পরিবারেও টাকা-পয়সা দিয়ে অবদান রাখতেন।

তবে সংকট কাটিয়ে উঠতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই ঝুঁকে পড়েছেন অনলাইন ব্যবসার দিকে। অল্প পুঁজিতে স্বাধীনভাবে কাজ করে সফলতার মুখও দেখেছেন অনেকে। অনলাইনে পণ্য বিক্রি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মাসে এক লাখ টাকাও আয় করছেন কেউ কেউ। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিনশ শিক্ষার্থী জড়িয়ে পড়েছেন অনলাইন ব্যবসায়। এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অনলাইন উদ্যোক্তার কথা রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

ছয় মাস ধরে অনলাইনে ব্যবসা করছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান বন্যা। ‘ট্রীট’স ফর ইউ’ (ঞৎবধঃং ঋড়ৎ ণড়ঁ) নামে নিজের ফেসবুক পেইজে চকলেট ও মিষ্টান্ন তৈরি শেখানোর কোর্স চালু করেছেন তিনি। ছয় মাস আগে শুরু করা এই অনলাইন কোর্স থেকে এখন পর্যন্ত তিনি আয় করেছেন আট লাখেরও বেশি টাকা। বন্যা বলেন, ‘লকডাউনের শুরু থেকেই বিরক্তিকর সময় কাটছিল। এ সময় অনলাইনে খাবার বানানো শেখাতে অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় দেখে নামমাত্র ফি নিয়ে কোর্স করানোর চিন্তা মাথায় আসে। এরপর ফেসবুক পেজ খুলে বিভিন্ন খাবার বানানো শেখাতে শুরু করি। এভাবেই বড় পরিসরে জীবনের প্রথম উপার্জনের স্বাদ পাই।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ আলম বলেন, করোনার কারণে বাধ্য হয়ে বাড়িতে এসে চার মাস ধরে বসবাসের সময় সংসারের অভাব-অনটন বুঝতে পারি। তখন অনলাইন ব্যবসায় নেমে পড়ি। বাসায় ছিল সরিষার দানা, সেটা দিয়ে ব্যবসা শুরু করি। বর্তমানে তিনি মূলত মণিপুরিদের কাপড় নিয়ে কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত তিনি আয় করেছেন প্রায় ছয় লাখ টাকা।

বাসায় বসে নিজের হাতে কেক তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিহা রহমান। গত আট মাসে অনলাইনে দুই লাখ ২০ হাজার টাকার কেক বিক্রি করেছেন তিনি।

অর্থনীতি বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জান্নাত জেরিন হাতের কাজ ও খাদি কাপড়ের কাজ করেন। তার আয় হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার টাকা।

ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহীনূর বেশ কিছুদিন ধরে রংতুলিতে ছবি আঁকছেন। এভাবে তার আয় হয়েছে দেড় লক্ষাধিক টাকা।

অনলাইন ব্যবসায় জড়িত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ ব্যবহার করে পণ্যের প্রচার চালান। নিজেদের ব্যবসায়িক পেজের পাশাপাশি অনলাইন ই-কমার্সভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে কাজের প্রচার চালিয়ে গ্রাহক বাড়াচ্ছেন তারা।

শুধু নিজেদের আর্থিক উন্নয়নই নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে কিংবা সমস্যায় পড়লে অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এই ছাত্রছাত্রীরা লভ্যাংশের একটি অংশ দিয়েও তাদের পাশে দাঁড়ান।

গত ১৬ এপ্রিল ক্যান্সার আক্রান্ত সহপাঠী অন্তর সাহার চিকিৎসার জন্য নিজের অনলাইন আয় থেকে ৩৩ হাজার ৯ শ টাকা দান করেছেন ইসরাত জাহান বন্যা।

তিনি বলেন, ‘আমার সহপাঠী অন্তর সাহা, দীর্ঘ ৫ বছর ধরে সে কিডনি সমস্যা নিয়ে লড়াই করে আসছে। বর্তমানে তার দুটো কিডনিই প্রায় অচল। বাঁচতে হলে দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। যার জন্যে প্রয়োজন প্রায় ৩০ লক্ষাধিক টাকা। তাই আমি আমাদের পেইজ থেকে অন্তরের জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা অন্তরের জন্যে ২টা ক্লাস নিয়েছি, প্রথম ক্লাসের লভ্যাংশের অর্ধেক পাঠিয়ে দিয়েছি এবং দ্বিতীয় ক্লাসের লভ্যাংশের পুরোটাই অন্তর সাহার চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দিবো।’

করোনার সময় ঘরে বসে পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এসব অনলাইন ব্যবসার উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখবে বলে মনে করেন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে না থেকে উদ্ভাবনীয় কাজ করে সময়কে কাজে লাগাচ্ছে। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও নিঃসন্দেহে এটি অর্থনীতির আশাজাগানিয়া।’

শিক্ষার্থীদের এসব উদ্যোগের প্রশংসা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক জিএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘২০ বছর আগের শিক্ষার্থীরা যা চিন্তা করতে পারত না, এখনকার শিক্ষার্থীরা তা করে দেখাচ্ছে। আমি তাদের স্যালুট জানাই।’

অনলাইন ব্যবসায় আগ্রহী নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকে অনলাইন ব্যবসায়ী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ক্যাম্পাসিয়ান উদ্যোক্তা সমিতি। এ সংগঠনের সহসভাপতি এবং দেশি মার্টের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনলাইন ব্যবসা খুব সহজ, আবার খুব কঠিন। কারণ একজন নিজেকে যত বেশি পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারবেন, তিনি তত বেশি সফল হবেন।’