মঙ্গল্বার ১৫ জুন ২০২১


স্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড


আমাদের কুমিল্লা .কম :
26.05.2021

# কুমিল্লা শহরের চকবাজার থেকে সুয়াগাজী পর্যন্ত রাস্তাটির পূর্বের নামকরণ গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি #

 

শাহাজাদা এমরান।
স্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এক সময় যা এই উপমহাদেশে সড়ক এ আজম নামে অধিক পরিচিত ছিল। কম করে হলেও চার শতাব্দীর পুরাতন এ সড়কটি কুমিল্লা তথা বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব হারাতে বসলেও দক্ষিণ এশিয়ার ৩টি দেশে তা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে।যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে। মোঘল আমলে শুরু হওয়া এই সড়কটি স্বাধীন বাংলাদেশের এরশাদ শাসানামলের শুরুতে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের একমাত্র স্থলপথ ছিল। যা কুমিল্লা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এখনো কুমিল্লা নগরীর চকবাজার এলাকার প্রচীন কোন কোন দোকানের সাইনবোর্ডে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড লেখা রয়েছে কালের সাক্ষী হিসেবে। আশির দশকের শুরুতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ শুরু হলে একেবারেই অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে ঐতিহ্যমণ্ডিত এই সড়কটি।
যেভাবে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের নামকরণ হয় : ১৫৩৭ সালে মুঘল স¤্রাট হুমায়ূনের সেনা প্রধান হিসেবে শের শাহ বাংলা জয় করেন। এর তিন বছর পর ১৫৪০ সালে এ অঞ্চলে তিনি আফগান শুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ সালের মাত্র পাঁচ বছরের শাসনামলে শের শাহ’র তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয় ’সড়ক এ আজম’। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার শহরের ওপর দিয়ে যশোর হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ও পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত এ সড়কটি। শের শাহ’র তত্ত্বাবধানে নির্মিত মোট ২৫শ’ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে সংযুক্ত করেছে। ওই আমল থেকেই সড়কটি এতদাঞ্চলের মূল সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তী পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকার ’সড়ক এ আজম’ ই সড়কটির নামকরণ করেন গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে।
কালের বিবর্তনে সংস্কার ঃ গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি নির্মিত হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার এটি সংস্কার করা হয়। এর মধ্যে প্রথম সংস্কার করেন মৌর্য সা¤্রাজ্যের রাজারা। ১৮৩৩ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সড়কটির আরেক দফা সংস্কার করে বৃটিশ সরকার । তখন তারা এর নামকরণ করে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এর আগে অবশ্য বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন শাসকরা শাহ রাহে আজম, সড়কে আজম, বাদশাহি সড়ক ও উত্তর পথ হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন সড়কটিকে।
বাংলাদেশে সড়কটি অস্তিত্ব হারাতে বসেছে : বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান শের শাহ’র নির্মিত এ সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে যে অংশটুকু এখনও ঐতিহাসিক এই সড়কটির সাক্ষ্য বহন করে চলছে, তার অবস্থা শোচনীয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে সড়কটির অস্তিত্ব রয়েছে কেবলমাত্র যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায়। শের শাহ সড়ক নামে উপজেলার প্রবেশমুখ থেকে বিপরীত দিকের শেষ সীমানা পর্যন্ত মাত্র ৩৭ কিলোমিটার বর্তমানে আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আশির দশকের শুরুতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাইপাস হওয়ায় এতদঞ্চলে অস্তিত্ব হারায় গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামক সড়কটি।
গবেষকদের মতামত : বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক আহসানুল কবীর বলেন, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও দীর্ঘতম সড়ক পথ। দুই শতাব্দীরও অধিক সময় এটি উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে সংযুক্ত করে রাখে। এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া হয়ে পাকিস্তানের পেশাওয়ারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত পৌঁছায়। এর প্রাক্তন নামের মধ্যে ছিল উত্তরপথ, শাহ রাহে আজম, সড়কে আজম, বাদশাহি সড়ক।
গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে বিস্তৃত রুট মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় থেকে ছিল। এটি গঙ্গার মুখ থেকে সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আধুনিক সড়কের পূর্ববর্তী সংস্করণটি সম্রাট শের শাহ শুরি নির্মাণ করেন। তিনি ঘোড়ার ডাকেরও প্রচলন করেন। এতে প্রাচীন মৌর্য সড়কের সংস্কার ও বর্ধিত করা হয়। ১৮৩৩ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা এর আরো সংস্কারসাধন করে।
গভীর দু:খ প্রকাশ করে কুমিল্লার এই গবেষক বলেন, গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ঢাকা থেকে কুমিল্লা নগরীর ওপর দিয়ে চট্টগ্রামে যানবাহন চলাচল করত । এটিকে বলা হতো গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। আমাদের কুমিল্লা শহরের চকবাজার রোডটির দুই পাশের সকল দোকান পাট ও অফিসের সাইন বোর্ডে শোভা পেত গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড হিসেবে। ইতিহাসের ঐতিহ্য ধরে রাখার স্বার্থে তিনি এই নামটি আবার সংযোজনের দাবি জানান।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নাসিম আরা বেগম জানান, নির্মাণের পর থেকে কয়েক শতাব্দী ধরে আমাদের উপমহাদেশের ভেতর স্থলপথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে এ সড়কটি ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে। তিনি বলেন, ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে ওই দেশগুলোর সরকার সময়ের সাথে সড়কটির সংস্কারের ধারা অব্যাহত রেখেছিল। ফলে সড়কটি সেখানে আজো শের শাহ’র নির্মাণ কীর্তিকে অমর করে রেখেছে। আমাদের দেশে অস্তিত্ব সংকটে পড়া সেই সড়কটিকে টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের কোন বিকল্পই নেই।
কুমিল্লার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক শাহজাহান চৌধুরী গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, আমরা তখন কুমিল্লা হাই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা হয়ে পুলিশ লাইন,ফৌজদারী,মোগলটুলি (কুমিল্লা হাই স্কুলের সামনের রাস্তা),রাজগঞ্জ,চকবাজার দিয়ে সুয়াগাজী পর্যন্ত রাস্তাটিকে আমাদের সময়ে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড বলা হতো। যদিও ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের কুমিল্লার এই অংশটিসহ পুরোটাই গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। তারপরেও মানুষ কুমিল্লার এই অংশটিকেই গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড বলে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডেও এই অংশে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড লেখা থাকত। তখন কুমিল্লা শহরের ওপর দিয়ে বাস চলাচল করত। আমরা হাই স্কুলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসের আসা যাওয়ার এই শোঁ শোঁ শব্দ পেতাম।
সাংস্কৃতিক সংগঠক শাহজাহান চৌধুরীর দাবি, ইতিহাসের ঐতিহ্য রক্ষার্থে, বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের সঠিক ইতিহাস জানার স্বার্থে কুমিল্লা শহরের চকবাজার থেকে সদর দক্ষিণ উপজেলার শুয়াগাজি পর্যন্ত রাস্তাটির পূর্বের নামকরণ গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী জানান। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলকে দ্রুত উদ্যোগী ভূমিকা নিতেও তিনি আহ্বান জানান।