মঙ্গল্বার ১৫ জুন ২০২১
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » ফিরে আসতে হবে পরিবেশ সম্মত জীবনের ধারায়-অতিথি কলাম


ফিরে আসতে হবে পরিবেশ সম্মত জীবনের ধারায়-অতিথি কলাম


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.06.2021

– আলী আকবর মাসুম
বিশ্বব্যাপী যখন পরিবেশ ও প্রকৃতির নানা সংকটে ভাবনা- দুঃভাবনা তৈরি হয়েছে তখন বাংলাদেশের পরিস্থিতিকেও এদিক থেকে দেখার কিছুটা সুযোগ থাকে। আবার পৃথক এক একটি দেশ হিসেবে কোন দেশ কিভাবে কতটা পরিবেশ -প্রকৃতি বিনষ্ট -বিপর্যয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে তারও একটি ভিন্ন ভিন্ন চিত্র রয়েছে। সেদিক থেকে আমাদের দেশের অবস্থা কতটা ভালো কী মন্দ এমন প্রেক্ষিতে তাতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের ভাবনা ও ভুমিকা নিয়ে আজও সচেতন মহলে অনেক বেশি অসন্তোষ আছে। নাগরিকদেরও এনিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পরিচয় খুব বেশি নয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রেণি বা গোষ্টিবদ্ধ ভাবে কিছু মানুষ প্রকৃতি – পরিবেশের প্রতিনিয়ত ক্ষতি করছেন। তবে বর্তমান সরকার দেশের পরিবেশ উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নদ-নদী, পুকুর-জলাশয় রক্ষায় আইন প্রণয়ন সহ নদী রক্ষা কমিশনকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চেষ্টা করছে। দেশ-বিদেশের ভালো বা মন্দের যে কোনো খবরাখবরে মাঝে নিজেদের সর্ম্পকীয় বিশেষ কোনো বিষয়ে নিজের দেশের অবস্থা নিয়ে আমার মতো সাধারণ মানুষের ভাবনা বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সামাজিক জীবনেও অনেক মানুষ মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় কোনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে প্রধান্য দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেন। এদিক থেকে দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ গত সমস্যা এবং তার সুফলের গুরুত্ব অনেকের কাছে কোনো অংশেই কম নয়। তাই আজ আবার এসব নিয়ে কিছু বলার সুযোগ নিচ্ছি বিশেষ একটি দিবস বা উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রকৃতি ও পরিবেশর সুরক্ষার প্রয়োজনীয় কথাগুলো নির্দিষ্ট ভাবে তুলে ধরার এদিনটিও গত দুইবছর ধরে আর আগের মতো নেই। মনে হয় যেন করোনা সবকিছুকে টেনে ধরেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে করোনাকে ভাইরাসজনিত মহামারি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পরিবেশের বিপন্নতা বা তারসঙ্গে প্রকৃতির প্রতিশোধের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তাও একভাবে ভাবনার বিষয়। তবে আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের অবিরাম ক্ষতির কারণে মানুষের সুস্থ দেহ-মনে বেঁচে থাকা যে অনেকটা অসম্ভব হয়ে গেছে তাও আর অস্বীকার করার উপায় নেই। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এদেশের মানুষ নিজের দেশের সৃষ্ট ক্ষতি ছাড়াও বিশ্ব্রে উন্নত সব দেশের দ্বারা পরোক্ষ ভাবে পরিবেশের ক্ষতি বা সুরক্ষার দিক থেকে অন্যায্যতার শিকার হচ্ছে। বৈশ্বিক ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন এদেশের মানুষও। বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা যেটুকু বেড়েছে তারচেয়েও ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে যাচ্ছে বলে বন্যা, খরা বাড়ছে, সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলে ঘুর্ণিঝড়ের তান্ডব বেড়ে গেছে। এতে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের কমপক্ষে দশটি জেলার মানুষ ক্রমান্বয়ে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে বলা হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বে কার্বন নি:সরনের পরিমান না কমলে তাপদাহ বৃদ্ধি ছাড়াও তলিয়ে যেতে পারে কোনো কোনো দেশের কোটি কোটি মানুষের বসবাস। এবার বিশ্ব মূল্যায়নে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কথা যদি বলি তাহলে দেখা যায়- পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের অবস্থান ধারাবাহিক ভাবে অবনতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি’ (ইপিআই) এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০ ধাপ পিছিয়ে ১৭৯ তম স্থানে পৌঁছেছে। তারা ২০১৯ সালে বিশ্বের ১৮০টি দেশের সরকারের পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনের বাইরেও বাস্তবে এবং সংবাদ মাধ্যমে আমরা দেশের পরিবেশগত প্রধান সমস্যা ও ক্ষতির দিকগুলো যেভাবে দেখতে পাই তা রীতিমতো আতংকিত করে তোলে। এসব সমস্যার অন্যতম হচ্ছে, রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণে গত কয়েকবছরে পৃথিবীর তৃতীয় দূষিত নগরী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অতিরিক্ত ইটভাটা ও চলাচল অযোগ্য যানবাহন দূষণ বাড়াচ্ছে সর্বত্র। এছাড়া পানি, মাটি, শব্দ দূষণের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে নেই, বাড়ছে সুপেয় ও ব্যবহার উপযোগী পানির সংকট। পলিথিন- প্লাস্টিক দূষণ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে, কমেছে কৃষিজমি, বনভূমি ও বৃক্ষের পরিমান এবং বনজ, জলজ, উদ্ভিদ প্রাণ-প্রাণীর আবাসস্থলও। শুধু রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ণ করতে গিয়ে টেকনাফ ও উখিয়ায় বন ধ্বংস হয়েছে ৬ হাজার একরেরও অধিক। দেশে বনের ভেতর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা প্রায় দুই লক্ষ বলে জানাগেলেও তা উদ্ধারে নেই কোনো পদক্ষেপ। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সুরক্ষার চেয়ে তার আশপাশে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও অন্যান্য শিল্প-কারখানা স্থাপন গুরুত্ব পাচ্ছে। উন্নয়নের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি-সমুষ্টির দ্বারা আবাসিক, বাণিজ্যিক ও দাপ্তরিক অসংখ্য বহুতল অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও তাতে কোন নিয়ম-নীতি বা পরিকল্পিত পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। দেশের সবগুলো নদ-নদী এবং প্রাকৃতিক পাহাড়ের তত্ত্বাবধান ও সুরক্ষায়ও নেই কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা। একসময় দেশে ছোট বড় শতাধিক নদ-নদী ছিল বলা হলেও এখন তার সংখ্যা ৫০ এর বেশি হবে না। তারপরও দুষ্কৃতকারীদের নদী-পাহাড় কাটা এবং দখল-দূষণে এখন এসবের আর স্বাভাবিক অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষায় সরকার, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তথ্য-প্রমাণে সহায়তা প্রদান এবং নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে গত দুইদশক ধরে নানাভাবে প্রয়াস অব্যহত রেখেছে।

দেশের একটি প্রাচীন জেলা কুমিল্লাকে উদাহরণ হিসেবে দেখলে তাতেও প্রকৃতি ও পরিবেশের অবনতিশীল সার্বিক অবস্থার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মেঘনা, গোমতী, তিতাস এই তিন নামে কুমিল্লার মানুষের গৌরববোধ থাকলেও তারমধ্যে গোমতী নদী নগরবাসীর একেবারে বুক জুরে আছে। এই গোমতীর বালুমহাল ইজারা ও রমরমা ব্যবসার সঙ্গে নদীর দুইপাড় এবং বাঁধের অংশের মাটি কেটে কেটে যেন পুরো নদীকে গিলে খেতে চাচ্ছে নদীখেকো দুবৃত্তরা। গোমতী থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ পুরান গোমতীর প্রায় ছয় কিলোমিটার পাশ্ববর্তী বাসা-বাড়ির মানুষের দখল-দূষণে এক বিবর্ণ রূপ নিয়েছে। ২০১১ সালে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হয় কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন। বলা যায় পূর্ববর্তী পৌরসভার জনবল নিয়েই এখনো চলছে তার সেবা কার্যক্রম। কিন্তু এই এক দশকে যা ক্ষতি হবার তার অনেকটাই হয়ে গেছে। নগরীর আয়তন বিবেচনায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক চাহিদা এবং প্রয়োজনের প্রযোজ্যতা নিরূপণ ছাড়াই ১৫ তলা পর্যন্ত অসংখ্য বহুতল ভবনে হারিয়ে গেছে পরিকল্পিত নগরকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ। ১৫০ কিলোমিটার ড্রেনের আবর্জনার সঙ্গে প্রতিদিনকার বর্জ্য অপসারণেও হিমশিম খাচ্ছেন পরিচ্ছন্ন কর্মীরা। ফুটপাত ও সড়কের অংশও দখলে চলে গেছে অনেক দোকানীদের, ইজিবাইকসহ অনিবন্ধিত ও অবৈধ যানবাহনের বাড়তি চাপে সকল সড়কে যানজট ও ভোগান্তি বাড়ছে। অর্থাৎ এরকম কিছু সমস্যার ক্ষেত্রে সমাধানের পুরো সুযোগ না নেওয়ায় পরিবেশ বিরুদ্ধ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনের অনেক সমস্যা বাড়িয়েছে কুমিল্লার মতো দেশের অন্যান্য নগর-শহর গুলোতেও। এসবের মধ্যদিয়ে মানুষের রোগ-ব্যাধি, দুর্ভোগ-দুর্ঘটনা যেমন বাড়ছে তারসঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং আইনের অমান্যতার পরিমাণ-পরিধিও বাড়ছে সর্বত্র। পরিবেশ দূষণের দায়ে প্রচলিত আইনসহ আছে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে আছে ৩টি পরিবেশ আদালত। এবছর সবশেষ এক তথ্যে দেখা যায়, পরিবেশ আদালতে এপর্যন্ত মামলা রয়েছে ৭০০২টি, তারমধ্যে মাত্র ৩৮৮টি পরিবেশ বিষয়ক মামলা। এতে পরিবেশ অধিদপ্তর বা প্রশাসনের দূষণের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণে অনিহাই প্রকাশ পায়। তারপরও আমাদের সবার আশাবাদ ও ভরসার প্রতিটি উৎসের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। সকল মানুষকেও ফিরে আসতে হবে পরিবেশ সম্মত সুস্থ জীবন এবং বসবাস উপযোগী জীবনের সঠিক ধারায়।
আলী আকবর মাসুম, সাধারণ সম্পাদক, বাপা, কুমিল্লা শাখা।