শুক্রবার ১৭ †m‡Þ¤^i ২০২১


হুমায়ূন কবীর মজুমদার স্মরণে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
17.06.2021

মামুন সিদ্দিকী

হুমায়ূন ভাইকে খুব মনে পড়ে। তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর যেন এখনও ধ্বনিত হয় আকাশে-বাতাসে, জনসমুদ্রে, মিছিলে। জীবনভর তিনি ভেবেছিলেন মানুষের মুক্তি ও সংগ্রামের কথা। চেয়েছিলেন মুক্তবুদ্ধি ও বুদ্ধির জাগরণ, উন্নত ও আধুনিক সমাজ। আজীবন তিনি সে স্বপ্ন দেখে গেছেন।
গেলো শতকের ষাটের দশক ছিল বাঙালির আত্মজাগরণের কাল। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিকশিত হচ্ছে, বদরুদ্দীন উমরের ভাষায় বাঙালি মুসলমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আঞ্জাম করেছে, সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাব পড়ছে পূর্ববাংলার তরুণ সমাজেÑতখনি রাজনীতি ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ কুমিল্লায় যে এসব আন্দোলন ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছিল হুমায়ূন কবির মজুমদার তাদেরই একজন।
হুমায়ূন কবির মজুমদার তখন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী। জেলা পর্যায়ে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয়। মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সূত্রে তিনি সান্নিধ্য পেয়েছিলেন সেলিনা বানু, কমরেড ফয়েজউল্লাহ, অধ্যাপক মোজাফফ্র আহমদ প্রমুখ বিখ্যাত রাজনীতিকদের। সবচেয়ে বেশি সান্নিধ্য পেয়েছিলেন সেলিনা বানুর, কারণ তিনি তখন কর্মসূত্রে ছিলেন কুমিল্লায়।
১৯৬৯ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদে ছাত্রলীগকে পরাজিত করে ছাত্র ইউনিয়ন জয়লাভ করে। সেখানে অন্যান্যের মধ্যে হুমায়ূন কবীর মজুমদারের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। উনসত্তরের গণআন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য তিনি জেলও খেটেছিলেন। এভাবেই তিনি জড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে ‘ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী’র সদস্য হিসেবে তিনি আসামের তেজপুরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সহপ্রশিক্ষণার্থী আবদুস সামাদ সিকদারের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও আমি’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় প্রশিক্ষণের জন্য বুট জুতা ও ইউনিফর্ম পরিধান করতে গিয়ে বাধ সাধলো। সবাই যার যার মতো প্রস্তুত কিন্তু হুমায়ূন কবীর মজুমদার ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। কেন? পোশাক ও জুতা কোনটাই তাঁর সাইজের নয়। হ্যাঁ, হুমায়ূন মজুমদার আর পাঁচজন বাঙালির চেয়ে ছিলেন দীর্ঘকায়। বিস্তৃত বক্ষপট ও অমিত সাহস। পরে অবশ্য অর্ডার দিয়ে জুতা-পোশাক বানিয়ে সমস্যার সমাধান হয়েছিল।
হুমায়ূন ভাই। কোথা থেকে পেয়েছিলেন তিনি সমাজবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ? কে তাঁকে দিয়েছিল সাম্যবাদের মন্ত্র? সে ইতিহাস খুব দূরের নয়। ত্রিশের দশকে কংগ্রেসের রাজনীতির ধারায় ছিল দুটি স্রোত। একটি গণতান্ত্রিক, আরেকটি কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের মুক্তির ধারা। কুমিল্লায় সেই ধারার উদ্যোগ দেখা দিয়েছিল ‘ত্রিপুরা কৃষক সমিতি’তে। আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে এটি ১৯৩৬ সালের নির্বাচনে অনেকগুলো আসন লাভ করে। এভাবে এ অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠে। এ ধারার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন আশরাফউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, কামিনী কুমার দত্ত, অছিমউদ্দিন আহমেদ, কৃষ্ণসুন্দর ভৌমিক, মুহম্মদ এয়াকুব, মুখলেছুর রহমান প্রমুখ।
১৯৩০-এর দশকে বাংলায় দেখা দিয়েছিল বিপ্লবাদের জোয়ার। ১৯৩১ সালে চট্টগ্রামে যুব বিদ্রোহ, ১৯৩১ সালে শান্তি-সুনীতি কর্তৃক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্স হত্যা এবং একই চেতনা ধারায় ১৯৩২ সালে হাসনাবাদে সংঘটিত হয়েছিল কৃষক বিদ্রোহ, যা পুরো ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাড়া জাগিয়েছিল। এই ধারাটি পরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কুমিল্লা কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। কমরেড এয়াকুব ১৯৪৬ এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেন। ১৯৪৬ সালে তাঁর নির্বাচনী প্রচারে সর্বভারতীয় নেতা মনসুর হাবিব, এস কে ডাঙ্গে, পিসি যোশী প্রমুখ বরুড়ার গালিমপুরে এসেছিলেন। এ-সবই রাজনৈতিক ঐতিহ্য। এ সমাজতান্ত্রিক শক্তি ১৯৪৬ সালের নোয়াখালীর দাঙ্গা ডাকাতিয়া নদীর এপাড় কুমিল্লায় ছড়িয়ে পড়তে দেয় নি, বরং অনেক নিপীড়িতকে এপাড়ে নিজ কাঁধে করে নিয়ে এসে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এ ঘটনা বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরিত হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠনে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনে এ শক্তির উত্তরাধিকার পুরো মাত্রায় ক্রিয়াশীল ছিল। শেষদিকে সোভিয়েতপন্থী ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফ্র আহমদ সেই ধারায় নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হয়ে ওঠেছিলেন ষাটের দশকের সেই স্বপ্নবাজ তরুণদের স্বপ্নপুরুষ। তাঁর মাঝেই তরুণ সমাজ খুঁজে পেয়েছিলো মুক্তির সোপান। হুমায়ূন কবীর মজুমদারের মানসজগৎ গড়ে ওঠে অভিন্ন ধারাবাহিকতায়।
দেশভাগের পর যে রাজনৈতিক সংকট ও অচলায়তন সৃষ্টি হয়েছিল তারই পটভূমিতে গড়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। তাতে নেতৃস্থানীয় ছিলেন ফয়েজউল্লাহ ও মোহাম্মদ উল্লাহ। কুমিল্লায় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির এ ছিল গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হুমায়ূন ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি সদর দক্ষিণ উপজেলায় দক্ষিণ রামপুর গ্রামে। শহর থেকে তা বেশি দূরে নয়। সেখানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল। তিনি বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলেছেন, বাপ-চাচাদের মুখে সেই সংগ্রামী আন্দোলনের কথা শুনেছেন। সেইসব কথা ও বাণীই তাঁকে সমাজবাদী রাজনীতির দিকে ধাবিত করেছিল, যা তিনি বহন করেছেন আজীবন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর জীবনের বড় ঘটনা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ পুনর্গঠন না করতে পেরে হতাশ হয়ে পড়েন। তাঁর সমকালীন রাজনৈতিক বন্ধুদেরও ছিল একই অবস্থা। তাই বলে তিনি আদর্শ বিচ্যুত হননি। কিন্তু ষাটের দশকের স্বপ্নবান তরুণদের মতো স্বপ্নের বাংলাদেশ সৃজনে ব্যর্থমন কাতরাতে থাকে। জ্ঞানভিত্তিক বুনিয়াদি রাজনীতির জন্য তিনি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে পঙ্কজ ভট্টাচর্যের নেতৃত্বে গঠিত ঐক্য ন্যাপের কুমিল্লা জেলা সভাপতির পদ গ্রহণ করেছিলেন একই তৃষ্ণা থেকে।
রাজনীতি ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, আর ছিল বই পড়ার অদম্য নেশা। জ্ঞানতৃষ্ণায়, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের বই পড়ায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। নতুন কোনো বই বের হলে তা সংগ্রহে দেরি তার সইতো না। গেলো শতকের নব্বইয়ের দশকের মধ্যপাদে কুমিল্লায় স্থানীয় ইতিহাস চর্চায় ব্রতী হই। ২০০৪ সালে বের হয় ‘কুমিল্লায় ভাষা আন্দোলন’। এই গ্রন্থটি তাঁকে আমার কাছে ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ইতোমধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্রে এ অঞ্চলের কৃষক আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সমাজবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস হয়ে ওঠে আমার অনুসন্ধানের বিষয়। কমরেড মুহম্মদ এয়াকুবের জীবনী রচনাকে মনে করি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ, খলিলুর রহমান ফরিদ সমেত বরুড়ার নানা গ্রামে গমন প্রভৃতি কাজে তিনি উৎসাহ যুগিয়েছেন। নানা তথ্য, বক্তব্য ও বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপে মজতাম, তর্ক করতামÑবিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্টতা লাভ করতাম। এভাবে কখনও যে তাঁর পরম স্নেহের পাত্রে পরিণত হয়েছিলাম জানি না।
মুহম্মদ এয়াকুব ও তৎকালীন কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসভিত্তিক একটি বই বের হোক এ তিনি কায়মনোবাক্যে আশা করতেন। এ উপলক্ষ্যে মুহম্মদ এয়াকুবের পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। মূলত তাঁরই উদ্যোগ ও নেতৃত্বে বামধারার কেন্দ্রীয় রাজনীতিকদের অনেকে এই বিরাট অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে মুহম্মদ এয়াকুবের জীবন ও রাজনীতির মৌলিক দিকটি তুলে ধরেছিলাম। যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তিনি বহন করতেন তার ইতিবৃত্ত রচনায় হুমায়ূন কবীর মজুমদার ছিলেন পরমভাবে তৃষ্ণ। দুঃখ আমার, সেই গ্রন্থ আজও রচনা সম্ভব হয়নি।
হুমায়ূন ভাইয়ের আগে আমার সদ্য গড়ে ওঠে ফয়েজ উল্লাহ ও মোহাম্মদ উল্লাহর সঙ্গে। তাঁদের নিবিড় সান্নিধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারা এবং কুমিল্লা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস জানতে পারি। পরবর্তীসময়ে জাকির হোসেন, খলিলুর রহমান ফরিদ, কাজী মমতাজ উদ্দিনের সঙ্গে নিবিড় আলাপচারিতা এ জীবনের পরম সম্পদ।
হুমায়ূন ভাইয়ের স্নেহের কথা ভুলবো না। তাঁর সাথে সম্পর্কটি ছিল অম্লমধুর। ঠাট্টা-মশকরা ঢের চলতো। যতদিন কুমিল্লায় ছিলাম, ২০০৫ সাল পর্যন্ত, নিয়মিত সাক্ষাৎ হতো দৈনিক শিরোনাম কার্যালয় বা অন্যত্র। ভুই ভুই করে সিগারেটের ধোয়া উড়িয়ে আড্ডায়-গল্পে-কথনে মেতে থাকতেন। সে আড্ডায় লেখক-সাংবাদিক মোতাহার হোসেন মাহবুব ছিলেন অনিবার্যভাবে উপস্থিত। কর্মসূত্রে ঢাকায় চলে আসার পরও এ আড্ডার কমতি হয়নি। তিনি তখন তালপুকুর পাড়ের নিজস্ব ফ্ল্যাটে। সেখানেও গল্প জমে উঠতো। কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলে অনেক মজুমদার পরিবার ও বংশ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তাদেরকে ডাকা হয় ‘মন্দার’ নামে। হুমায়ুন ভাইয়ের বন্ধুস্থানীয়রা তাঁকে এ নামেই ডাকতেন। ইচড়ে পাকামি করে মাঝে মাঝে আমরাও অনুরূপ সম্বোধন করতাম। তিনি মিষ্টি করে হাসতেন।
হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে স্মৃতির অন্ত নেই। একবার ঢাকায় এসে আমার পূর্বতন কর্মস্থল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে দীর্ঘ আড্ডায় মেতে ওঠেছিলেন। কী করে এবং কোন পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন প্রভৃতি স্মৃতিচারণ করে পরমানন্দ লাভ করেছিলেন। রাজনীতিতে মেতে বিয়েথা করেছিলেন একটু দেরিতে। এক কন্যার পিতা হিসেবে সুখেই ছিলেন। শ্বশুর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি শব্দ নিয়ে বেশ হাসাহাসি করতেন। শব্দটি ‘আফাল’Ñঅর্থ বিলে প্রচণ্ড ঢেউ। সেই হাসি আমাকে উসকে দিতো অট্টহাসিতে। সেই হাসিতে হুমায়ূন ভাইয়ের জীবনমুখী সত্তার অপূর্ব প্রকাশ ঘটতো। তারপরও ভেতর ভেতর ছিলেন বিবাগী। তাঁর দিকে তাকালে ত্যাগী কমিউনিস্টদের মুখ ভেসে ওঠতো। তিনি তাদের কথাই বেশি বলতেনÑকী করে কত ত্যাগ ও কষ্টে তারা সমাজবাদী আদর্শের ভিত্তি রচনার প্রয়াস নিয়েছিলেন পূর্ববাংলায়। তাঁর পাঠ থেকে ওঠে আসতো সেইসব ত্যাগী মানুষের জীবনকাহিনী। তখন সেই ধারা থেকে তাঁকে পৃথক করা যেত না।
রাজনীতির সঙ্গে সংশ্রব তাঁর কমে আসছিল। ক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সংস্কৃতির সঙ্গে। নজরুল পরিষদের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন, শেষে বৃত হলেন বিনয় সাহিত্য সংসদের সভাপতি রূপে। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাঁর দিনকাল। প্রতিদিন বিকেল-সন্ধ্যায় কুমিল্লা ক্লাবে আসতেন। কুমিল্লায় গেলে সেখানে অনিবার্যভাবে চা-পান-গল্প হতো। একদিন শুনলাম তিনি অসুস্থ। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। বেশ কয়েকবার দেখতে গেলাম। অসুস্থতা ক্রমেই বাড়তে লাগলো। কুমিল্লায় গিয়ে শুনলাম এবার ভীষণ অসুস্থ। মাহবুব ভাই সমেত দেখতে গেলাম। হুমায়ূন ভাই শয্যাশায়ী। আমাদের চিনতে পারলেন। তাঁর এ হেন অবস্থা দেখে আবেগ ও অশ্রু ধরে রাখা ছিল কঠিন। সেদিন তাঁর কাছ থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নেই বিদায় নিয়েছিলাম। ভাবিনি এই তাঁর সঙ্গে অন্তিম দেখা।
হুমায়ূন ভাইকে মনে পড়ে। তাঁর ভালোবাসা পেয়েছি। বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে ছিল তাঁর বিপুল উৎসাহ। তাঁদের রাজনৈতিক গুরু ফয়েজউল্লাহর স্মৃতিমূলক নির্বাচিত প্রবন্ধমালা নিয়ে একটি বই সম্পাদনা করেছিলাম ‘কুমিল্লার সমাজ ও সংস্কৃতি’ নামে। এখানেও তাঁর প্রেরণা পেয়েছিলাম। যদিও এই বই অনেককে পাঠিয়ে আবার খবরও নিতে হয়েছিল বইটি তাঁদের হস্তগত হয়েছে কি-না। ‘তাহারা’ বইটি গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করেছিলেন। এই আঘাত হুমায়ূন ভাইয়েরও ছিল। চলমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারা ও প্রকৃতি তিনি মানতে পারতেন না। উষ্মা প্রকাশ করতেন। তাতে কী? স্রোত তো আর কারো মর্জি মাফিক চলে না।
হুমায়ূন ভাই উপরিস্তরের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। নিজ এলাকায় শিক্ষা ও উন্নয়নের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন নিবিড়ভাবে। ঐতিহ্য সংরক্ষণে ছিলেন প্রবলভাবে অনুরাগী, ইতিহাস সংরক্ষণে উৎসাহী। অমন পাঠপ্রিয় মানুষ তাঁর বন্ধু ঠাকুর জিয়াউদ্দিন আহমদ ছাড়া কয়জন আছেন কুমিল্লায়? জিয়া ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর বন্ধুর বহু খবর পেতাম।
হুমায়ূন ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। মহাকালের স্রোতে সব কিছুই স্লান হয়ে যায়, ধুয়ে-মুছে নিয়ে যেতে চায় সব কিন্তু মানুষের স্বপ্ন ও সাধকে বোধ হয় কিছুতেই স্লান করতে পারে না। যেমন পারেনি কমরেড মুহম্মদ এয়াকুবের স্বপ্ন ও আদর্শকে মুছে দিতে। হুমায়ূন ভাইয়ের স্বপ্নকেও কালের সর্বগ্রাসী স্রোত ভাসিয়ে নিতে পারবে না। তিনি স্বপ্ন দেখতেন মানবমুক্তির, সুষম সমাজের, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। মানুষের অবারিত বিকাশে তাঁর ছিল গভীর বিশ্বাস। যতদিন সত্য ও সুন্দরের অর্চনা হবে, মানুষ খুঁজে নিতে চাইবে তার আত্মমর্যাদার স্থানÑমানুষের মতো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সাধÑততদিন হুমায়ূন কবীরের মতো মানুষজন অম্লান থাকবেন মানবসমাজে। ব্যক্তিস্বার্থকে ছাপিয়ে তারা হয়ে উঠবেন মানুষের মুক্তির স্বাপ্নিক।
হুমায়ূন কবীর মজুমদারের কথা মনে পড়ে। হুমায়ূন ভাইয়ের কথা মনে পড়বে। মন্দারকে ভুলবো কী করে?

মামুন সিদ্দিকী : গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। পিএইচডি গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়