শনিবার ২৩ অক্টোবর ২০২১
Space Advertisement
Space For advertisement


কুমিল্লা অঞ্চলে সংবাদ চর্চার ১৪১ বছর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.09.2021

আবু সুফিয়ান রাসেল।।
কুমিল্লা তথা ত্রিপুরা অঞ্চলে সংবাদপত্রের ১৪১ বছর চলছে। ১৮৮০ সালে কুমিল্লা সদর থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ত্রিপুরা বার্তাবহ’ বৃহত্তর কুমিল্লাসহ ত্রিপুরার প্রথম পত্রিকা। বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় বিশটিরও বেশি দৈনিক, প্রায় অর্ধশত সাপ্তাহিক পত্রিকার অনুমোদন রয়েছে। এছাড়াও পাক্ষিক, মাসিক, দ্বি-মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক শিশু কিশোর, সাহিত্য সাময়িকী ও সংবাদপত্রে রয়েছে।

স্থানীয় বিভিন্ন গ্রন্থে আছে, ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হয় ত্রিপুরা তথা কুমিল্লা জেলার প্রথম সাপ্তাহিক ‘ত্রিপুরা বার্তাবহ’। এ পত্রিকা সম্পর্কে তেমন তথ্য জানা যায়নি। ১৮৮৩ সালে বের হয় তৎকালীন ত্রিপুরার দ্বিতীয় সাপ্তাহিক ‘ত্রিপুরা হিতৈষী’। ত্রিপুরা হিতৈষীর সম্পাদক ছিলেন শ্রী মতি ঊর্মিলা সিংহ। তিনি তৎকালীন ত্রিপুরা তথা কুমিল্লা জেলার প্রথম মহিলা সম্পাদক। কুমিল্লার ঊর্মিলা সিংহ বাংলাদেশেরও প্রথম মহিলা সম্পাদক। ‘ত্রিপুরা হিতৈষী’র আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ১৮৮৩ সালে বের হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে এটি ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছিল। এ পত্রিকার দীর্ঘ ৬৫ বছর আয়ুষ্কাল শুধু কুমিল্লার সংবাদপত্রশিল্প নয়, দেশের সংবাদপত্রশিল্পেও একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

কুমিল্লার বিভিন্ন পত্রিকা বিক্রয় কেন্দ্রে ঘুরে দেখা যায়, জাতীয় দৈনিকের পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা বিক্রি হচ্ছে। অফসেট কাগজে ট্যাবলয়েড আকারে প্রকাশিত ৮ পাতার পত্রিকা। কুমিল্লার জেলা, উপজেলা থেকে প্রকাশিত প্রায় প্রতিটি পত্রিকার দাম পাঁচ টাকা। দৈনিক হিসাবে অনুমোদিত পত্রিকার তালিকায় রয়েছে আমাদের কুমিল্লা, রূপসী বাংলা, কুমিল্লার কাগজ, শিরোনাম, ডাক প্রতিদিন, কুমিল্লা প্রতিদিন, আজকের কুমিল্লা, বাংলাদেশ সংবাদ, কুমিল্লা বার্তা, পূর্বাশা, কুমিল্লা মুক্তকণ্ঠ, শ্রমিক, প্রান্তর, কুমিল্লার ডাক, ময়নামতি, বাংলার আলোড়ন, কুমিল্লা কণ্ঠ, কুমিল্লার আলো, গণমুক্তি, ভোরের কলাম ইত্যাদি।

কুমিল্লা জেলার ১৭টি উপজেলায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা। বর্তমানে কুমিল্লা জেলা থেকে অনুমোদিত সাপ্তাহিকগুলোর মধ্যে রয়েছে আমোদ, নিরীক্ষণ, অভিবাদন, নতুনপত্র, মুক্তকাগজ, আমাদের দেবিদ্বার,দেশ গোয়েন্দা,সময়ের পথ, একুশে বাংলা, বর্ণপাঠ, নাঙ্গলকোট, সমাধান সমাচার, বঙ্গবার্তা, রঙধনু, ফলক, পাঠকবার্তা, ক্রাইম রিপোর্টার, অপরাধসংবাদ, সীমান্ত সংবাদ, কালিকলম, মেগোতি, বরুড়াকণ্ঠ, টেলিফোন, মুক্তির লড়াই, সময়ের দর্পণ, কুমিল্লার দর্পণ, কালপুরুষ, বাংলা বার্তা, লাকসাম, কুমিল্লা, জয় কণ্ঠ, হোমনার আলো, লাকসাম বার্তা, আলোর দিশারী, লাকসাম, জয়কণ্ঠ, চৌদ্দগ্রাম সংবাদ, চৌদ্দগ্রাম বার্তা, চৌদ্দগ্রামের আলো, কুমিল্লার কথা, ভোরের সূর্যোদয়, মনোহরগঞ্জ বার্তা, বিবর্তন, গোমতি, জনতার বার্তা, সমতটের কাগজ, মুক্ত বাংলাদেশ ইত্যাদি।
মাসিক ম্যাগাজিনের মধ্যে রয়েছে কিশোরচিত্র, বসুমতি, সিঁড়ি, প্রতিভা, তিন নদী, যুবকণ্ঠ, শালবন,ময়নামতি, দিগন্ত, সমযাত্রা,নবযুগ, কোরক, পূবালী, বাংলাদেশ, জয়ভেরী, মহাজীবন, মনন ইত্যাদি। দ্বি-মাসিক সাহিত্য ম্যাগাজিন আদুনিস, ক্যাম্পাস বার্তা, জানালা। ত্রৈমাসিক পত্রিকার মধ্যে রয়েছে বর্ণিতা, ভিক্টোরিয়া বাতায়ন ইত্যাদি। ষান্মাসিক রৌদ্রজল। তবে বেশিরভাগ পত্রিকাই অনিয়মিত, বন্ধ।

কুমিল্লার সংবাদপত্রের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ ও ‘দৈনিক রূপসী বাংলা।’ ১৯৫৫ সালের ৫ মে মোহাম্মদ ফজলে রাব্বীর সম্পাদনায় প্রকাশ পেয়ে সুদীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে ‘আমোদ’ তার নিয়মিত প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো থেকে মনোনীত এশিয়ার পাঁচটি সফল আঞ্চলিক পত্রিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘আমোদ’। এ পত্রিকা নিয়ে একাধিক গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

একইভাবে অধ্যাপক আবদুল ওহাব সম্পাদিত বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার প্রথম দৈনিক হিসেবে ‘রূপসী বাংলা’ ইতিহাসে তার স্থান নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশ পেয়ে ১৯৭৯ সালের ১০ ডিসেম্বর এটি দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। সে থেকে সুদীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এটি তার নিরন্তর পথচলা অব্যাহত রেখেছে। আমোদ ও রূপসী বাংলা কুমিল্লার সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকেও সমৃদ্ধ করেছে। এখানে কাজ করে অনেকে জাতীয় গণমাধ্যমেও ভূমিকা রেখেছেন।
কুমিল্লা শহরে গত ৪৮ বছর যাবৎ পত্রিকাবিলি করছেন আবদুল খালেক মিয়া। একান্ত আলাপে আবদুল খালেক বলেন, কুমিল্লা ইউসুফ হাই স্কুলে পড়ার পাশাপাশি হকারির চাকরি করি। কুমিল্লার প্রথম পত্রিকার এজেন্ট মতিউর রহমান ভূঁইয়া। তিনি ১৯৫৪ সালে শহরের মনোহরপুর এলাকায় স্টেশনারি দোকানের পাশাপাশি পত্রিকা বিক্রি করতেন। আমি অফিস আদালতে পত্রিকা বিলি করতাম। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা বিমান বন্দর চালু ছিলো, সে সময়ে হেলিকাপ্টারে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় পত্রিকা আসতো। বিমান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাসে পত্রিকা কুমিল্লায় আসে। ১৯৬০ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ভূঁইয়া স্টোর পরিচালনা করেন তার ভাই শামছুর রহমান ভূঁইয়া। বর্তমানে তার ছেলে মাসুদ ভূঁইয়া দায়িত্বে আছেন। ভূঁইয়া স্টোর থেকে পত্রিকা নিয়ে বিক্রি করতেন স্বর্গীয় নিরঞ্জন চন্দ্র চাল। তিনি কান্দিরপাড় লাকসাম রোডে জ্যোৎস্না স্টোর্স স্টেশনারি ও পত্রিকা বিক্রি করতেন। তার তিন ছেলে রতন, তপন ও তাপস এখন সে ব্যবসার হাল ধরেছে।

ত্রিপুরা হিতৈষীর সম্পাদক শ্রীমতি ঊর্মিলা সিংহের নাতি প্রদীপ সিংহ রায় মুকুট বলেন, ‘দাদি ছিলেন দেশের প্রথম নারী সম্পাদক। তার সম্পর্কে আমাদেরও তেমন জানার সুযোগ হয়নি। ত্রিপুরা হিতৈষী কোন কপি বা তার লেখাও আমাদের কাছে নাই। যা ছিলো সংগ্রামের সময় হারিয়ে গেছে। এখন শুধু তার একটা ছবি আছে, তাও অস্পষ্ট। তার শিক্ষা সম্পর্কেও সঠিক ধারণা নেই। তিনি সেকালে ময়মনসিংহ শহরে পড়েছেন। সে সময়ে ময়মনসিংহ জেলায় চার-পাঁচটি পত্রিকা প্রকাশ হতো। উর্মিলা সিংহ খুব সম্ভবত ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন।

কুমিল্লার প্রবীণ সাংবাদিক খায়রুল আহসান মানিক মনে করেন, মফস্বল শহরে সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখা খুবই কঠিন। এ চ্যালেঞ্জ অতীতেও ছিলো, এখনও আছে। কুমিল্লা একটি উর্ভর ভূমি। কুমিল্লা থেকে অনেক ভালো সংবাদকর্মী তৈরি হয়েছে। যারা শুধু কুমিল্লা নয়, দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ঢাকার মিডিয়া হাউজে কুমিল্লার কর্মীদের উপস্থিতিও কম নয়। কুমিল্লার নবীন সংবাদকর্মী যারা আছে, তারা আরও ভালো করবে আগমী দিনে।